slider জাতীয়

৩৬তম বিসিএস নন ক্যাডার থেকে বলছি!

মাহমুদুর রহমান: ভাগ্যবিধাতা সুপ্রসন্ন হলেই হতে পারতেন বিসিএস ক্যাডার, কিন্তু সামান্য নম্বরের ব্যবধানে কিংবা কোটা না থাকার বদৌলতে হতে হয়েছে নন ক্যাডার। মেধার বিচারে ক্যাডার ও নন ক্যাডারদের মাঝে তফাৎ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রাক বাছাই, লিখিত ও ভাইভা তিনটি ধাপ পেরিয়ে আসা যে কেউই সিভিল সার্ভিসের জন্য যোগ্য তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। সেই নন ক্যাডারদের যখন একটা কাঙ্খিত চাকরির জন্য অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষায় থাকতে হয় বুঝতেই পারেন ভাগ্যাহতদের বেদনা কতটা তীব্রতর হতে পারে, এর মাঝে যদি আবার থাকে চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কা তাহলে সেই মর্মবেদনা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর।

এর মাঝে যাদের বয়সের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার কারণে ৩৬তম বিসিএস ছিল শেষ সুযোগ, তাদের যাতনা আর আশঙ্কার কথা আলাদা ভাবেই ভাবার প্রয়োজন আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানে যথেষ্ট সংখ্যক শুন্যপদ খালি থাকলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অবেহলার দরুণ পিএসসিতে পর্যাপ্ত রিকুইজিশন না পৌঁছানো এই সমস্ত ভাগ্যবিতাড়িত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চরম দুঃখজনক ব্যাপার। এক্ষেত্রে আরেকটা বাঁধা কোটার কারণে শূন্য পদ সংরক্ষণ।

দীর্ঘ আড়াই বছর যাবত চলমান প্রক্রিয়া শেষে গত নভেম্বর মাসের ২০ তারিখে শুরু হয়েছে ৩৬তম বিসিএস মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে ক্যাডার পদে নিয়োগ না পাওয়া ৩৩০৮ জন প্রার্থীর নন ক্যাডার পদে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ।

দেশের সবচাইতে সম্মানজনক এবং দায়িত্বপূর্ণ পেশায় নিজেকে নিবেদিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে এবং ২ লক্ষেরও অধিক প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করে আজ এই জায়গায় এসে থমকে গেছে কয়েক হাজার মেধাবী সম্ভাবনাময় তরুণের ভবিষ্যৎ। কেননা ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ না পাওয়া উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে আবেদনকৃতদের সকলের নন ক্যাডার পদে চাকুরির সুযোগ নিশ্চিত নয়। অথচ ক্যাডার পদে নিয়োগ না পাওয়া উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে প্রথম শ্রেণীর নন ক্যাডার পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত শুধু যে অর্থ এবং সময় সাশ্রয়ী তাই নয়, একই সঙ্গে পিএসসির বিজ্ঞ পরীক্ষক মন্ডলীর সুচারু দৃষ্টি দ্বারা যাচাইয়ের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়ায় বিভিন্ন অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য কর্মকর্তার আসীন হওয়াও নিশ্চিত করে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে সরকারের মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরগুলোতে ৯ম ও ১০ম গ্রেডের প্রায় ৭০,০০০ পদ শূন্য। সম্প্রতি মহান সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে মাননীয় জনপ্রশাসন মন্ত্রী সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শূন্য পদের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখেরও বেশি বলে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে শুধু ৯ম গ্রেডেই ৪৮হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া ১০ম থেকে ১২তম গ্রেডে শূন্য পদ এক লাখের বেশি। ৪৮ হাজার সংখ্যক প্রথম শ্রেণীর পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রিকুইজিশন না দেওয়ায় এই পদগুলো যেমন শূন্য থেকে যাচ্ছে তেমনি উত্তীর্ণ হওয়া মেধাবী তরুণরাও বঞ্চিত হচ্ছেন নিয়োগ পাওয়া হতে। ফলে দেশও বঞ্চিত হচ্ছে সৃষ্টিশীল টগবগে তরুণদের সেবা গ্রহণ থেকে। ধাপে ধাপে একেকটি পরীক্ষায় নিজেদেরকে প্রমাণ করে এই পর্যন্ত আসতে তাদেরকে ব্যয় করতে হয়েছে জীবনের মহা মূল্যবান কয়েকটি বছর, মেধা, শ্রম এবং অধ্যবসায়। একই সঙ্গে নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে গিয়ে এদের বড় অংশটাই নিজেদেরকে বিরত রেখেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ থেকে।

একথা অনস্বীকার্য যে বর্তমান সরকারের শাসনামলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন ক্যাডার নিয়োগের ক্ষেত্রে যে সন্দেহাতীত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে সেই গ্রহণযোগ্যতাই মেধাবী ছাত্রদেরকে সরকারি চাকুরিকে পেশা হিসেবে গ্রহণে আগ্রহী করে তুলেছে। অপরদিকে ২০১৪ সালে সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর নন ক্যাডার পদের পাশাপাশি দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা পদেও নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই যে তরুণ,দেশের সবচাইতে সম্মানজনক চাকুরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বমোট ১৫০০ মার্কের (প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়সহ) তিনটি পরীক্ষায় ধারাবাহিকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের মেধা এবং যোগ্যতা প্রমাণ করেন, পর্যাপ্ত প্রথম শ্রেনীর শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে নিয়োগ বিসিএস উত্তীর্ণ এই ননক্যাডারদের জন্য দুঃখজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ।

এক্ষেত্রে একটা কথা না বললেই নয় ৩৫তম বিসিএস এর নন ক্যাডারদের সবাইকে কোটা শিথিলের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে ৩৬তম বিসিএসেও কোটা শিথিল সহ শতভাগ নিয়োগ হবে এই ভাগ্যবিলম্বিত ননক্যাডারদের এমন আশা পুরোপুরি যৌক্তিক। যেহেতু পূর্ববর্তী একটা বিসিএসে পিএসসি এমন উদ্যোগ নিয়েছে, সেহেতু এবারও যেন পিএসসির সেই মহান উদ্যোগ ধারাবাহিকতা বজায় থাকে সেটাই সবার প্রত্যাশা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং কমিশনের নিকট তাই ৩৬তম বিসিএস-এ উত্তীর্ণ নন ক্যাডার প্রার্থীদের পক্ষ থেকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি যেন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রথম শ্রেণীর শূন্যপদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীদের সকলকে মেধাক্রম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর পদসমূহে নিয়োগের সুপারিশ করার মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ দান করেন।

লেখক: ৩৬ তম বিসিএস নন ক্যাডারদের পক্ষে