অন্যরকম খবর চট্টগ্রাম জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ

বইয়ের ফেরীওয়ালার গীতিকবি আবদুল হালিম

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পথ থেকে প্রান্তরে হাটে বাজারে হেঁটে হেঁটে ৬২ বছর ধরে বই বিক্রি করছেন গীতিকবি আবদুল হালিম। বয়েসের ভাড়ে নুয়ে পড়লেও থেমে নেই তার পথচলা।

বইয়ের ফেরীওয়ালার গীতিকবি আবদুল হালিম

চোখের জ্যোতি কিছুটা কমে এলেও এখনও লাঠি ছাড়িা হেটে চলেন মাইলের পর মাইল। ৮২ বছরের এ অদম্য মানুষটি এখনও গ্রাম থেকে শহরের হাটে বাজারে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করছেন স্বরচিত গীতি কবিতা ছাড়াও ধর্মীয় এবং শিশুতোষ বই। নিজ কন্ঠে সুরের ছন্দ তুলে বই বিক্রি করেই এখনো চলছে জীবন জীবিকা। খুঁজে পান মানসিক প্রশান্তি।

পটুয়াখালীর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামের মৃত্যু আবদুর রহমান গাজীর ছেলে কবি আবদুল হালিম। ক্লাশ ফাইভ পাশ করার পরে মক্তব্যের শিক্ষক গীতিকবি আবদুল মান্নানের অনুপ্রেরনায় শুরু করেন তার লেখা বই বিক্রি। তখন থেকেই শিক্ষা গুরুকে অনুসরন করে নিজেই লেখা শুরু করেন গীতি কবিতা, গান, আঞ্চলিক ভাষার ছড়া। মক্তব্য শিক্ষক গীতিকবি আবদুল মান্নানের উৎসাহে তার সাথে একত্রে গান, কবিতা ও ছড়া মিলিয়ে প্রকাশিত হয় প্রথম বই। গ্রামগঞ্জ থেকে শহরের হাটে বাজারে পায়ে হেঁটে বিক্রি করেন নিজেই।

পাঠকের আগ্রহেই এরপর শুরু করেন এককভাবে লেখা প্রকাশের কাজ। সমসাময়িক আলোচিত ঘটনা ছাড়াও পাঠকের চাহিদার বিবেচনায় লিখতে শুরু করেন একের পর এক গীতিকবিতা। স্বাধীনতার ইতিহাস, সাত খুনির ফাঁসি, এরশাদ শিকদের ফাঁসি, শহার ভানুর স্বামী উদ্ধার, আবদুল আলী গারুলি ও নিবারুনের করুন কাহিনীসহ এমন সব ঘটনার প্রায় শতাধিক বই তিনি রচনা করেছেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনী, ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডসসহ এবং তার তনয়া শেখ হাসিনাকে নিয়েও লিখেছেন বেশ কয়েকটি গীতি কবিতার বই।

আবদুল হালিম জানান, পত্রিকা কিনে পড়তাম। পাঠকের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে সে সমব ঘটনার উপড় লিতাম। অনেক সময় টাকা থাকতনা। ধার দেণা করতাম। না পেলে ছাপাখানার মালিককে ধরে সে সব ছাপাতাম। এই বই বিক্রি করেই টানাপোড়নেই ৬২ বছর ধরে চালিয়েছেন পরিবারের ভরন-পোষন। সন্তানদের লেখাপড়া। বড় ছেলে মতিউর রহমান মাওলানা পাশ করে স্থানীয় একটি নুরানী মাদ্রাসায় চাকুরি করছেন। মেয়ে কাজল রেখা পরিবার পরিকল্পনায় চাকুরী করছে। ছোট ছেলে আনিসুর রহমান পটুয়াখালী সরকারী কলেজে (বিএ) লেখাপড়া করছেন।

তিনি জানান, এত সব কিছু সম্ভব হতো না যদি তার জীবনসঙ্গী তাকে সহায়তা না করতো। উৎসাহ না যোগাতো।

অনেকটা আক্ষেপ করেই তিনি বলেন, এখন আর আগের মত তার গীতি কবিতার বই বিক্রি হয় না। টেলিভিশন আর মোবাইলে গ্রামের মানুষও সব খবর জেনে যায়। তাই বাধ্য হয়ে এখন দেশের নামকরা সাহিত্যিক ও কবিদের লেখা বইও বিক্রি করছেন। শিশুদের আদর্শ লিপি ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় বই বিক্রি করছেন।

কবি আবদুল হালিমের ছোট ছেলে আনিসুর রহমান বলেন, গভীর রাত অবধি বই লেখেন বাবা। সুরে সুরে মোহিত করেন আমাদের। বইগুলো গ্রামে গ্রামে ঘুরে পরিশ্রম করে বিক্রি করেন। আমার বাবাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি।

বই ক্রেতা আজিজ আহমেদ বলেন, সেই ছোট বেলা থেকেই আবদুল হালিমকে কলাপাড়াসহ বিভিন্ন হাটে বই বিক্রি করতে দেখছি। সমসাময়িক ঘটনার উপড় তার লেখা অনেক কবিতার বই কিনে পড়েছি। জীবনের শেষ ইচ্ছের কথা জানাতে গিয়ে আবদুল হালিমের চোখে বেয়ে নেমে আসে জল।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতির পিতাকে নিয়ে একটি গীতি কবিতা লিখেছিলাম। ওই গানটি যদি শেখ হাসিনাকে শোনাতে পারতাম তাহলে মনে হয় মরে গিয়েও শান্তি পেতাম।

আউলিয়াপুর ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন ভুট্যু বলেন, কবি আবদুল হালিম একজন গুনী ব্যক্তি। ছোট বেলা থেকেই দেখছি তিনি গীতি কবিতা ছাড়াও বাচ্চাদের জন্য ছড়া, কবিতা, গান ও গল্পের বই লিখেছেন। হাটে বাজারে ঘুরে ঘুরে এসব বই বিক্রি করছেন। ছোট বেলায় অবসর সময়ে তার কাছে ছুটে যেতাম। তার গলায় ছন্দ সুরে শুনতাম কবিতা।

জুমবাংলানিউজ/একেএ