মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিকার অনুসন্ধান-ড. মো. নাছিম আখতার

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাগুলোর অন্যতম। বহু মানুষ হতাহত হচ্ছে এবং ক্ষতি হচ্ছে বিপুল সম্পদের।

জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সালকে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে তার ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। বিআরটিএর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিগত ১০ বছরে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের জীবন হারিয়েছে এবং প্রায় ২৫ হাজার লোক আহত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব মতে, ২০১৫ সালে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা দুই হাজার ৩৯৪, যাতে নিহত হয়েছে দুই হাজার ৩৭৬ জন এবং আহত হয়েছে এক হাজার ৯৫৮ জন। আর ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুর্ঘটনার সংখ্যা এক হাজার ৪৮৯। তাতে নিহত হয়েছে এক হাজার ৪২২ জন এবং আহত হয়েছে এক হাজার ২৮৯ জন।পেশায় শিক্ষক হলেও আজ লিখতে বসেছি একজন সচেতন চালকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় মহাসড়কে আমার প্রাইভেট কার আমি নিজেই চালাই, এতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কারণ একজন পেশাদার চালকের চেয়ে আমি অনেক বেশি সতর্ক। তা ছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তির কারণে মহাসড়কের বিপদ আগাম অনুভব করার ক্ষমতা একটু হলেও বেশি। চালকের আসনে বসে দুর্ঘটনার কিছু কারণ আমি লক্ষ করেছি।

দুর্ঘটনার ৯১ শতাংশই ঘটে অতিরিক্ত গতির কারণে। বেশির ভাগ চালকই গাড়ি দ্রুত চালানোকে গাড়ি চালানোর মুন্সিয়ানা হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রকৃতপক্ষে অভিজ্ঞ চালকের লক্ষ্য হতে হবে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে যাত্রী পরিবহন করা। চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ইচ্ছা করলে স্বয়ংক্রিয় (Automatic) নজরদারির মাধ্যমে চালককে জরিমানা বা চালকের লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে।

পেছন থেকে ওভারটেক করার সময় সামনের গাড়ির সম্মতির অপেক্ষা না করে হর্ন বাজিয়ে ওভারটেকের চেষ্টা করাও মহাসড়কের নৈমিত্তিক ঘটনা। ওভারটেকিংয়ে যদি সামনের গাড়ির চালকের সম্মতি থাকে, তবে ওই চালক গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে সামান্য বাঁয়ে সরে যান। এ দেখেই বুঝতে হবে যে ওভারটেকিংয়ে চালকের সম্মতি আছে। এ সময় ওভারটেক করলে নিরাপদে ওভারটেক করা যায়। তা না হলে মহাসড়কে প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেকিং ঘটে, যা দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। এ ক্ষেত্রে যাত্রী ও চালক—উভয়েরই মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।

একটি ট্রাককে একটি বাস ওভারটেক করছে আবার ওই বাসকে একটি মাইক্রোবাস ওভারটেক করছে, যাকে আমি ট্রিপল ওভারটেক বলছি। এ ধরনের ওভারটেকে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির জন্য পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। এর অনিবার্য পরিণতি হলো মুখোমুখি সংঘর্ষ। যে মহাসড়কগুলোতে ডিভাইডার নেই, সেগুলোতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এ ধরনের সড়কে ওভারটেকিং দেখলে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণে আনা এই ভেবে যে ট্রিপল ওভারটেক হলেও হতে পারে।

এখানে একটি গাণিতিক হিসাব কষি। গাড়ি যদি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার স্পিডে চলে, তাহলে প্রতি সেকেন্ডে ২৭ দশমিক ৭৮ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। ক্লান্তির কারণে কোনো চালক যদি এক সেকেন্ডের জন্য ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর অজান্তেই গাড়ি ২৭ দশমিক ৭৮ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করবে, যা হাইওয়েতে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ক্ষেত্রে চালকের শারীরিক ক্লান্তির বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

সময় নিয়ন্ত্রিত বাস ও ভাড়ায় চালিত (Rent-a-Car)  গাড়ির চালকদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ কাজ করে। সময় নিয়ন্ত্রিত বাসগুলো সময়মতো পৌঁছতে না পারলে জরিমানা গুনতে হয়; অন্যদিকে ভাড়ায় চালিত গাড়িগুলো দ্রুত ফিরে আসতে পারলেই আরেকটি ভাড়া ধরতে পারে। তাই চালকদের মধ্যে সর্বদাই এক ধরনের অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়। আমার প্রস্তাবনা, কমিশনের ভিত্তিতে চালক নিয়োগের বিকল্প কোনো উপায় খুঁজে বের করা এবং সময় নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে চালকের ওপর কোনো মানসিক চাপ সৃষ্টি না করা।

আইনত আমাদের দেশ অ্যালকোহলমুক্ত হলেও অবৈধ পন্থায় অ্যালকোহল ও নেশাজাতীয় দ্রব্য যুবসমাজের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। যুবসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চালিয়ে থাকে। তাদের কেউ কেউ দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথা চিন্তা না করেই নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে গাড়ি চালাতেও পারে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দরকার হাইওয়ে পুলিশের হাতে আধুনিক ডোপিং টেস্ট সরঞ্জাম। এসব ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের মতো তত্ক্ষণাৎ জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিল করার মতো আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং চাই তার সঠিক বাস্তবায়ন।

গাড়ি জোরে না চালালে অনেক যাত্রী চালককে ভর্ত্সনা করে। অনেক সময় আমি বলতে শুনেছি, ‘ওই মিয়া গরুর গাড়ি চালাচ্ছ নাকি!’ ইত্যাদি। এ ধরনের মনোভাব পরিহার করতে হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের উন্নয়নের মাহেন্দ্রক্ষণে সব যানবাহনকে স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় আনলে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে, রক্ষা পাবে নাগরিকজীবন ও সম্পদ। স্বজনহারা কোনো ব্যক্তির আহাজারিতে প্রকম্পিত হবে না বাংলার আকাশ-বাতাস। নিরাপদে পথ চলাই হোক আমাদের ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার।

লেখক : ডিন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

drnasim@duet.ac.bd

Add Comment

Click here to post a comment