বিনোদন

স্বপ্নগাথা নারী নির্মাতাদের গল্প

নির্মানে পিছিয়ে নেই নারীরা। সংখ্যায় কম হলেও কাজের মান দিয়ে নিজ যোগ্যতায় নাম করে নিচ্ছেন নারী নির্মাতারা। চ্যালেঞ্জিং এ পেশায় সমানতালে লড়ছেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, নির্মাণে নারীর উপস্থিতি বহু বছরের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাকেও পাল্টে দিয়েছে।

হলিউড মূল্লুকের নারী নির্মাতাদের খবর:

গ্রহের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র বাজার খোদ হলিউডে নারী নির্মাতাদের অংশগ্রহণ যথেষ্ট কম বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের এই অভিমত পুরোপুরি মেনে নিয়েও একটি আশাব্যাঞ্জক চিত্র কিন্তু তুলে ধরা যায়। হলিউডের বাঘা বাঘা পুরুষ নির্মাতাদের পাশাপাশি বেশ কিছু নারী নির্মাতার নাম স্বমহিমায় উচ্চারিত হওয়ার দাবি রাখে নিঃসন্দেহে। এবং এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ‘দ্য পিয়ানো’ পরিচালক জেন চ্যাম্পিয়ন, ‘লষ্ট ইন ট্রান্সসেলেশন’ পরিচালক সোফিয়া কপোলা কিংবা বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো সিনেমা ‘টোয়াইলাইট’, ‘থার্টিন’ পরিচালক ক্যাথরিন হার্ডউইক ছাড়াও এই তালিকায় আলাদাভাবে নিজের জায়গা করে নিতে পারেন ‘দ্য হার্ট লকার’ পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো। ইতিহাসে প্রথম নারী পরিচালক হিসেবে তিনি ২০১০ সালে অস্কার পুরস্কার অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, দ্য হার্ট লকার অস্কারে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে তার সাবেক স্বামী বিখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরুনের অবতার সিনেমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। বিশ্বের সেরা ১০০ ক্ষমতাধর ব্যক্তির তালিকায় সে বছর তার নামও প্রকাশিত হয়।

বলিউডও কম নয়

বিশ্বব্যাপী ভারতীয় চলচ্চিত্রের রয়েছে বিশাল বাজার। বিখ্যাত সব পুরুষ নির্মাতাদের আলো ঝলমলে সৃষ্টির অনবদ্য অঙ্গনে কতগুলো নারী নির্মাতার নাম কিন্তু এখানেও স্বকীর্তিতে উজ্জ্বল।

বেগম ফাতিমা সুলতানার হাত ধরে শুরু হয়েছিল ভারতীয় নারীদের চলচ্চিত্র নির্মাণ। বুলবুল এ পরিস্তান, চন্দ্রাবতী প্রমুখ নির্বাক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা করে ভারতীয় নারীদের পথ দেখান তিনি। এরপর অনেক নারী নির্মাতা এসেছেন, হারিয়েও গেছেন অনেকে। কিন্তু পরিশ্রম, প্রতিশ্রুতি আর মানসম্মত কাজের মাধ্যমে নিজেদের যথার্থ জায়গা করে নিয়েছেন কল্পনা লাজমি, অঞ্জলি মেনন, মীরা নায়ার,দীপা মেহতা,কিরন রাও, গৌরি সিন্ধে,রীমা কাগতি,আনুশাহ রিজভী কিংবা জয়া আখতারের মতো নির্মাতারা। তবে, অনেক দিন ধরেই বলিউডের নারী নির্মাতা হিসেবে ফারাহ খানের নামটিই সম্ভবত সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। নৃত্য পরিকল্পনা দিয়ে সিনে-যাত্রা শুরু করলেও সফল নৃত্য পরিকল্পনার পাশাপাশি তিনি ক্রমশই হয়ে উঠেছেন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা। ম্যায় হুঁ না দিয়ে যাত্রা শুরু। এরপর একে একে উপহার দিয়েছেন ওম শান্তি ওম, তিস মার খান, হ্যাপি নিউ ইয়ার এর মতো দর্শকনন্দিত ব্যবসাসফল সিনেমা। এছাড়া তিনি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রকল্প যেমন, মেরি গোল্ড : অ্যান অ্যাডভেঞ্চার ইন ইন্ডিয়া, মনসুন ওয়েডিং এবং চাইনিজ চলচ্চিত্র পারহেপ্স লাভ এ কাজ করেছেন।

কলকাতা বাংলার নারী নির্মাতারা প্রশংসিত:

সেই ৬০-এর দশকের অরুন্ধতী দেবীর ছুটি কিংবা হালের নন্দিতা রায়ের ইচ্ছে, বেলাশেষে। নারী নির্মাতাদের সুনিপুণ হাতে নির্মিত হয়েছে এমন অনেক দর্শকপ্রিয় ভারতীয় বাংলা সিনেমা। তবে, টালিগঞ্জভিত্তিক বাংলা সিনেমা নির্মাণচর্চায় যে নারী নির্মাতার নাম সগৌরবে সামনে এসে দাঁড়ায় নিঃসন্দেহে তিনি অপর্না সেন। ১৯৮১ সালে ৩৬ চৌরাঙ্গী লেন দিয়ে শুরু। এরপর একে একে পরমা, সতী, পারমিতার একদিন, ১৫ পার্ক এভিনিউ, দ্য জাপানিজ ওয়াইফ, গয়নার বাক্স; প্রভৃতি ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি। তার পরিচালিত অধিকাংশ সিনেমাই বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত।

মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের নারী নির্মাতাদের জেগে ওঠার গল্পও কম নয়:

ইরান, ইরাক, পাকিস্তান কিংবা অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত ও শাসিত দেশগুলোতে চলচ্চিত্রের জাগরণ ও উন্নয়ন শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে থেকেই। সেসব দেশের নারীরাও ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে ইরানের নারগিস, নিকি কারিমী, শিরিন নিশাত, সামিরা মাখমালবাফ,মার্জিয়া মেশকানি,রাখসান বানী এহতেমাগদ ও ইরাকের আনিসা মেহদী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এতদিন জনসম্মুখে চলচ্চিত্র প্রদর্শন সৌদি আরবে রীতিমতো নিষিদ্ধ ছিল। তবে ২০১২ সালে নিষিদ্ধের বেড়াজাল ছিড়েছে ওয়াজদা নামের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হল, সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন হাইফা আল মনসুর নাম্মী এক নারী নির্মাতা। সিনেমাটি সে বছর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছিল।

আমাদের খবর কী?

সত্তরের দশকে সিনেমা নির্মাণ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন রেবেকা নামে একজন সাহসিনী। ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ নামে একটি ছবি নির্মাণ করে তিনি সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে নারীদের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন। তার পথ ধরেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুজাতা, রোজি, সুচন্দা, কবরী ও মৌসুমী। সিনেমা নির্মাণ করেছেন নারগিস আক্তার, ক্যাথরিন মাসুদ, সামিয়া জামান, রুবাইয়াত হোসেন, মারিয়া তুষার। নির্মাণ করছেন আফসানা মিমি, রোকেয়া প্রাচী ,তানিয়া আহমেদের মতো অভিনেত্রীরাও।

শাহনেওয়াজ কাকলীর উত্তরের সুর, কবরীর আয়না কিংবা হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে মেহের আফরোজ শাওনের কৃষ্ণপক্ষ; চলচ্চিত্র নির্মাণে আমাদের নারীদের উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিতই বহন করছে। তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা সারা আফরীন নির্মিত শুনতে কি পাও নন্দিত হয়েছে বিশ্ব দরবারে। আরেকটি তথ্য তো রীতিমতো উৎসাহ উদ্দীপক। উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ সেরা দশ নারী নির্মাতার তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন। তার প্রথম চলচ্চিত্র মেহেরজান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আন্ডার কন্সট্রাকশন দিয়ে তিনি দর্শকের ভেতর আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা তৈরি করেছেন।

বাংলা নাটকের নারী নির্মাতা:

যদি উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম তুলে দেয়া হয় তাহলে প্রথম দশজনের মধ্যে থাকবেন মাতিয়া বানু শুকু, রোকেয়া প্রাচী, চয়নিকা চৌধুরী, নুজহাত আলভী আহমেদ, অরুণা বিশ্বাস, নাজনীন চুমকি, রুমানা রশীদ ইশিতা, হৃদি হক ও ইরানী বিশ্বাস। এদের প্রত্যেকেই নাটক নির্মান করে সুনাম অর্জন করছেন।

বাংলা ইনসাইডার



সর্বশেষ খবর