অর্থনীতি-ব্যবসা জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

সুদিনের বার্তা নিয়ে বাংলায় ফিরে এলো নীল চাষ

এস এম পিয়াল : বাংলায় কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী আন্দোলনগুলোর মধ্যে নীল বিদ্রোহের অবস্থান সামনের সারিতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীলকরের অত্যাচারে বিপর্যস্ত কৃষকরা একসময় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নীলের বিরুদ্ধে। কৃষকের রক্ত ঝরিয়ে বাংলা থেকে বিদায় নিয়েছিল নীল চাষ। কালের পরিক্রমায় নীল চাষ এখন বাংলাদেশে আবার ফিরে এসেছে। তবে এবার আর কৃষকের গলার ফাঁস হয়ে নয়। ফিরেছে কৃষকের সুদিনের বার্তাবাহী হয়ে। এ নীল এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

পৃথিবীজুড়েই এখন প্রাকৃতিক রঙ ফিরে পাচ্ছে তার হারানো গৌরব। রাসায়নিক দিয়ে তৈরি কৃত্রিম রঙের পরিবেশ বিনষ্টকারী প্রভাব সম্পর্কে সরব হয়ে উঠছেন পরিবেশবিদরা। এসব উপাদানের কারণে কৃত্রিম রঙে রাঙানো কাপড় পরে ত্বকের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ব্যাধির ঝুঁকিতে পড়ছেন ভোক্তারা। ঝুঁকির মুখে রয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট শ্রমিকসহ অন্যরাও। আবার এসব কৃত্রিম রঙ উৎপাদনকারী কারখানার বর্জ্য নদী নালায় প্রবাহিত হয়ে পরিবেশকে করে তুলছে মারাত্মকভাবে দূষিত। ফলে পোশাকে কৃত্রিম রঙের ব্যবহারকে এখন করা হচ্ছে নিরুৎসাহিত। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পক্ষ থেকেও কৃত্রিম রঙে রাঙানো পোশাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে প্রসার লাভ করছে প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহার করে উৎপাদিত রঙের বাজার। এটি এখন পরিণত হচ্ছে ফ্যাশন জগতের বড় আকর্ষণে। আর সে আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘ইন্ডিগো’ বা প্রাকৃতিক নীল রঙ।

সারা পৃথিবীতে বর্তমানে প্রাকৃতিক নীলের ব্যাপক চাহিদা। এর মধ্যে শুধু প্রতিবেশী দেশ ভারতেই পণ্যটির প্রয়োজন পড়ে প্রতি বছর ২৫০ টন। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় বড় ফ্যাশন হাউজও এখন ‘ট্রু বেঙ্গল ইন্ডিগোর’ (বাংলার খাঁটি নীল) মতো প্রাকৃতিক নীলের উৎস খুঁজছে।

বর্তমানে রংপুরে যে নীল উৎপাদন হচ্ছে তা এ উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানের বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া, ঢাকার অরণ্য ও প্রবর্তনার মতো খ্যাতনামা ফ্যাশন হাউজগুলোও এখন এ নীল দিয়েই রাঙাচ্ছে তাদের পোশাকপণ্য।

উত্তরবঙ্গের জেলা রংপুরের রাজেন্দ্রপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এখন এমন অনেক কৃষকের দেখা মেলে, যাদের জীবনে সুদিনের আলো নিয়ে এসেছে নীল চাষ। জামনি রানী, মঞ্জু রানী, বিমলা বা বুলু মিয়াসহ এখানে এখন অনেকেরই দেখা মিলবে, যাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে নীল চাষ ও এ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের সঙ্গে। সব মিলিয়ে এখানকার কয়েকশ পরিবারের জীবন-জীবিকা এখন নীলসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

একসময় বছরের জুলাই-আগস্টের দিকে এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা প্রস্তুতি নিতেন আসন্ন মঙ্গা মোকাবেলার। সামান্য কিছু ধানের জমি নিড়ানো ছাড়া এ সময় আর কোনো কাজ মিলতই না বলা চলে। এখন আর সে দুর্দিন নেই। এখানকার কৃষকদের আগে বছরের যে সময়টা কাটত আসন্ন মঙ্গার শঙ্কা নিয়ে, সে সময়টায় তারা এখন নীলের আবাদ ও প্রক্রিয়াকরণেই ব্যয় করেন। এ সময়টা এখান স্থানীয়রা পার করেন নীলের পাতা উত্তোলন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও শুকানোর কাজে। মঙ্গাও নেই। মঙ্গা নিয়ে ভাবার অবকাশও নেই।

নীলের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে যে বর্জ্য পাওয়া যায়, সেটি আবার নাইট্রোজেনে ভরপুর। কৃষকরা এটিকে ব্যবহার করছেন ইউরিয়ার বিকল্প সার হিসেবে। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এ সার তাই ড্রামে করে সরবরাহ করা হচ্ছে আশপাশের ধানক্ষেতে। কৃষকের জন্য এক সময়ের সর্বনাশা নীল চাষ এখন পরিণত হয়েছে উপকারী বন্ধুতে।

এ অঞ্চলে এখন নীলে কাপড় রাঙানোর কাজেও ব্যস্ত একদল মানুষকে দেখা যায়। তাদের রাঙানো এসব কাপড় আবার সেলাইয়ের জন্য সরবরাহ করা হয় গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে আবার এগুলো দিয়ে তৈরি হয় কাঁথা, শাল ও স্কার্ফ।

এ অঞ্চলে ‘ভাতের কষ্ট’ এখন অতীতের গল্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে এখানকার জীবনচিত্র। আর এ বদলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম থেকে আসা সুমন্ত, সালমা, মমতাজ, রশিদা, জোলেখা নামের কয়েকজন। ২০০৬ সালে তারা গড়ে তোলেন লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর পৃষ্ঠপোষকতা করছে কেয়ার বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত নীল দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। গত বছরেও প্রতিষ্ঠানটি ৬০ হাজার ডলার (৫০ লাখ টাকারও বেশি) মূল্যের নীল যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে এখন নীল উৎপাদনে সরাসরি জড়িত পরিবারের সংখ্যা ৭২০টিরও বেশি। এছাড়া নীলের পাতা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকের সংখ্যা কয়েক হাজার। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার কেজি প্রাকৃতিক নীল উৎপাদন হচ্ছে, যা দেশের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণের পর বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরের সদস্য আনোয়ারুল হক বলেন, হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেডের জন্ম। এর সদস্যরা সবাই আগে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। এখন তাদের জীবনমানের অনেক উন্নয়ন হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি নীল উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করার আগেও এখানকার অনেক কৃষক জ্বালানি ও পাতা দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের জন্য নীল গাছ রোপণ করতেন। স্থানীয়ভাবে নীল গাছকে সাধারণত মাল গাছ হিসেবেই অভিহিত করা হয়।

স্থানীয় নীলচাষী পাতানী রানী বলেন, ‘২০০৬ সালের আগে আমরা মাল গাছ আবাদ করতাম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এখন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতি কেজি পাতা ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। প্রতি কেজি বীজ বিক্রি করি ১০০ থেকে ২০০ টাকায়।’

বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনাময় হয়ে দেখা দিয়েছে বাণিজ্যিকভাবে নীল উৎপাদন। আবাদ ও প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ঘটানো হলে বহির্বিশ্বে এ নীলের বড় ধরনের বাজার তৈরি করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।

জানা গেছে, রংপুর জেলার সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে এখন নীলের আবাদ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এগুলো হলো রাজেন্দ্রপুর ইউনিয়ন, খলেয়া গঞ্জিপুর, মমিনপুর, চন্দনপাঠ ও হরিদেবপুর। এছাড়া গঙ্গাচড়া উপজেলায়ও কিছু পরিমাণে নীলের আবাদ হয়।

রংপুরের জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মূলত এখানকার বালিময় পরিত্যক্ত জমি ও রাস্তার পাশেই নীলের আবাদ হচ্ছে। গাছটির জন্য বৃষ্টিপাত উপকারী। তবে গোড়ায় পানি জমলে গাছের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নীল গাছ রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে মার্চ মাস। প্রতিটি গাছ রোপণের তিন মাস পর পাতা সংগ্রহের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। এ পাতা সংগ্রহ করা যায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। গাছের ২২ থেকে ২৫ ইঞ্চি পর্যন্ত আগা কেটে পাতা সংগ্রহ করা হয়। ভালোমতো পরিচর্যা করা হলে তিন কেজি বীজ বপন করে পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে প্রায় দেড় হাজার কেজি নীলের পাতা পাওয়া সম্ভব।

কেয়ার বাংলাদেশ রংপুরের প্রজেক্ট ম্যানেজার মিশাইল আজিজ জানান, গত বছর লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে এক টন নীল যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়েছে। তাই এবার এক হাজার একর জমিতে নীল চাষের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এটিকে আরো উৎপাদনমুখী করার জন্য বর্তমানে কারিগরি, আর্থিকসহ সব ধরনের সহায়তা দেয়া হয়েছে। আগে প্রতিষ্ঠানটি ‘নিজেরা কটেজ অ্যান্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে পরিচিত ছিল। পরে নাম পরিবর্তন করে লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেড রাখা হয়।

লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেডঅর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ভিন্নধর্মী সামাজিক উদ্যোগ

বর্তমানে রংপুর অঞ্চলে লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেড প্রাকৃতিক নীল উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এখানেই উপমহাদেশের সবচেয়ে ভালো মানের প্রাকৃতিক নীল উৎপাদন হচ্ছে। পৃথিবীর সেরা প্রাকৃতিক নীল হিসেবে বাংলাদেশে উৎপাদিত নীলের পরিচিতি রয়েছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান সুমন্ত কুমার বর্মণ বলেন, ‘আমাদের নীল বাংলার নীল। ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায় এ নীল বিশ্বসেরা হিসেবে খ্যাত।’

তার মতে, ব্রিটিশ শাসনামলেও পৃথিবীব্যাপী বাংলাদেশের নীলের ব্যাপক চাহিদা ছিল। ইংরেজরা এটিকে ব্যবহার করেছিল আমাদের শোষণ করার কাজে। এখন আমরাই হতে পারি প্রাকৃতিক নীলের সবচেয়ে বড় উৎস। এক সময় ইংরেজরা আমাদের শোষণ করে যে টাকা নিয়ে গেছে, এখন সময় এসেছে সে টাকা ফেরত আনার।

এ কাজে লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানই এখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

সুমন্ত কুমার বর্মণ বলেন, এ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আমাদের। আমরাই শ্রমিক, আমরা দরিদ্ররাই এর মালিক। গত চার বছরে আমরা উৎপাদন করেছি প্রায় চার হাজার কেজি নীল। বিদেশে বিক্রি করছি খুচরায় প্রতি কেজি ৮০-১০০ ডলার দরে। সারা বিশ্বে এখন এর চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ধীরে ধীরে আমরাই হতে চাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক নীল উৎপাদন কেন্দ্র।

সংগঠনটি মূলত নীল উৎপাদন ও বাণিজ্য থেকে আয়কৃত টাকা দিয়েই চলে। লাভের টাকার কিছু অংশ সব সদস্যের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। বাকি অংশ আবার কাজে লাগানো হয় ব্যবসা বড় করার জন্য। উৎপাদনের পাশাপাশি সংগঠনের সদস্য গ্রামের দরিদ্র নারীরা নীলে রাঙানো বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজেও নিয়োজিত রয়েছেন। গড়ে উঠেছে তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক রঙের অবকাঠামো। সব মিলিয়ে এ সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় তিন হাজারেরও বেশি দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবার। এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মেলায় অংশ নিয়ে এখানকার উৎপাদিত নীল বেশ সুনাম অর্জন করেছে। ভারতের নয়াদিল্লিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি মেলায় পণ্য বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক নীলের প্রতি বিশ্ববাসীর আগ্রহে কমতি নেই। এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে লিভিং ব্লু প্রাইভেট লিমিটেডের মতো সামাজিক উদ্যোগ এখন শত শত দরিদ্র পরিবারের জীবন পাল্টে দেয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এ সংগঠনও এখন প্রতিনিয়ত বড় হয়ে উঠছে। দুই-তিন বছরের মধ্যে সব মিলিয়ে স্থানীয় ১০ হাজার দরিদ্র পরিবার এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সংগঠনটি হয়ে উঠছে এক বিকল্প অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল, যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গ্রামের হতদরিদ্র কৃষকেরাই।

সূত্র : বণিক বার্তা

জুমবাংলানিউজ/পিএম