অর্থনীতি-ব্যবসা জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ স্লাইডার

সিলেটে ৩২ অবৈধ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

সমীর কুমার দে, ডয়চে ভেলে: অবৈধভাবে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনার পর সিলেটে অবৈধ ট্র্যাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে প্রশাসন। এ পর্যন্ত ৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সিলেটের যে প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ এই মানবপাচারে জড়িত সেই ‘ইয়াহিয়া ওভারসিজ’-এর কর্ণধার এনামুল হক তালুকদারকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব৷ এছাড়া তার দুই সহযোগী ‘দালাল’কেও গ্রেফতার করা হয়েছে৷ র‌্যাব বলছে, ইউরোপে মানবপাচারে ১৫-২০টির মতো গ্রুপ জড়িত৷ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে র‌্যাবের অভিযান চলছে৷

এদিকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার এনামুল হকসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে সিলেটে৷ অবৈধভাবে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্য সাগরে নৌকা ডুবে নিহত আব্দুল আজিজের ভাই মফিজ উদ্দিন বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় এ মামলা দায়ের করেন৷ ফেঞ্চুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল বাসার মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মানবপাচার এবং আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলাটি করা হয়েছে৷’’ র‌্যাবের হাতে এনামুল হকের আটকের কথা তিনি মিডিয়ায় দেখলেও এখনো আসামী বুঝে পাননি৷

এই মামলায় সিলেটের রাজা ম্যানশনের ‘ইয়াহিয়া ওভারসিজ’-এর মালিক গোলাপগঞ্জ উপজেলার পনাইরচক গ্রামের এনামুল হক তালুকদার, একই উপজেলার হাওরতলা গ্রামের ইলিয়াস মিয়ার ছেলে জায়েদ আহমেদ, ঢাকার রাজ্জাক হোসেন, সাইফুল ইসলাম, মঞ্জুর ইসলাম ওরফে গুডলাক ও তাদের ১০-১৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় সহযোগীকে মামলায় আসামি করা হয়েছে৷ ফেঞ্চুগঞ্জের মুহিদপুর গ্রামের মফিজ উদ্দিন বলেছেন, তার ছোট ভাই আব্দুল আজিজকে ইটালি পৌঁছে দেওয়ার জন্য আট লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল৷

টিউনিসিয়ায় নৌকাডুবির পর নড়েচড়ে বসেছে সিলেটের প্রশাসন৷ এ ঘটনার পর মানবপাচারে জড়িত অবৈধ ট্র্যাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সিলেটের জেলা প্রশাসন৷ এরই ধারাবাহিকতায় পাঁচটি টিম প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ট্র্যাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে৷ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩২ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে৷ এ পর্যন্ত এই অভিযানে ৯ জন গ্রেফতার হয়েছেন৷

অভিযানের বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি বাংলাদেশ (আটাব) সিলেটের সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযানে অনেক অবৈধ ট্র্যাভেল এজেন্সি মালিকরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালিয়েছেন৷ ট্র্যাভেল এজেন্সি চালু করতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন করতে হয়৷ এমন নিবন্ধন আছে সিলেটের প্রায় দুইশ’ প্রতিষ্ঠানের৷ তবে নিবন্ধন ছাড়াই আরো পাঁচশ’ ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে সিলেটে৷ জনাব জলিলের মতে, ‘‘সিলেটে বৈধের চেয়ে অবৈধ ট্রাভেলস এজেন্সিই  বেশি৷ এরা বিদেশ পাঠানোর নামে নানাভাবে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছে৷ এসব মানবপাচারকারীর কারণে সিলেটের সাধারণ মানুষ অনেকে সর্বস্ব হারাচ্ছেন৷ বর্তমানে সিলেটে অবৈধ ট্র্যাভেল এজেন্সির সংখ্যা পাঁচশ’র বেশি৷’’ নৌকাডুবির ঘটনায় আলোচিত ইয়াহিয়া ওভারসিজের সরকারি নিবন্ধন ছিল বলে জানান তিনি৷ তবে তাকে আটাবের সদস্যপদ দেওয়া হয়নি৷

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার তিনজন হলেন সিলেটের এনামুল হক তালুকদার (৪৬), শরিয়তপুরের মো. আক্কাস মাতুব্বর (৩৯) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মো. আব্দুর রাজ্জাক ভূইয়া (৩৪)৷ বৃহস্পতিবার রাত ৩টা  থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর থেকে আক্কাসকে, খিলক্ষেত  থেকে এনামুলকে এবং বিমানবন্দর এলাকা থেকে রাজ্জাককে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান৷

মুফতি মাহমুদ খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সিলেটের জিন্দাবাজারে ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামে একটি এজেন্সি আছে এনামুলের৷ তিনি ১০/১২ বছর ধরে মানবপাচারে জড়িত৷ আব্দুর রাজ্জাক গত চার-পাঁচ বছর ধরে এনামুলের দালাল হিসেবে কাজ করছিলেন৷ আক্কাসও দুই-তিন বছর ধরে মানবপাচার চক্রের দালাল হিসেবে কাজ করছেন৷ তারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন যাবত এই অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত আছেন৷ এই চক্রটি বিদেশি চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে ইউরোপে লোক পাঠিয়েআসছে৷’’

ডয়চে ভেলের এক প্রশ্নের জবাবে জনাব খান বলেন, ‘‘কতগুলো এজেন্সি অবৈধভাবে মানবপাচার করে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন৷ তবে ১৫-২০টি গ্রুপ এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে৷ এই চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে উন্নত দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে৷ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে বিপদে পড়ছেন৷’’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এ মোমেন গত বুধবার এক ব্রিফিংয়ে জানান, যে মানবপাচার চক্র এ ঘটনায় জড়িত তার হোতাসহ পাঁচ জনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছে সরকার৷ এদেরই একজন গ্রেফতার হওয়া এনামুল হক তালুকদার৷ লিবিয়ার জুয়ারা থেকে অবৈধভাবে ইটালিতে যাওয়ার পথে গত ১০ মে টিউনিসিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে বহু মানুষের মৃত্যু হয়৷ ওই নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ ৩৯ বাংলাদেশির একটি তালিকা সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে৷ নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২২ জনের বাড়ি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে৷ চার জনের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জে৷

শ্রম অভিভাসন বিশেষজ্ঞ হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রথমত, ট্র্যাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে পার্থক্য আছে৷ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কিন্তু এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাবে না৷ এখন গ্রামে-গঞ্জে ট্র্যাভেল এজেন্সি গড়ে উঠেছে৷ তারা মানুষকে ভুল বুঝিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এই পথে নিয়ে যাচ্ছেন৷ একজন মানুষ কেন এইভাবে যেতে উদ্যোগী হন? কারণ, তিনি যখন দেখেন তাঁর পাশের বাড়ির কেউ বা পরিচিতজন এভাবে বিদেশে গিয়ে বাড়িতে পাকা দালানঘর তুলেছেন, তখনই অন্যরা আগ্রহী হয়ে পড়েন৷ বাংলাদেশে ১১/১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে৷ সেখানে আমাদের দেশের তরুণরা এভাবে বিদেশে যেতে গিয়ে বিপদে পড়বেন, সেটা তো হয় না৷ আসলে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে৷ না হলে মানুষকে এই পথ থেকে ফেরানো যাবে না৷ আবার এঁরা তো পায়ে হাঁটা কোনো পথ দিয়ে লিবিয়া পৌঁছেনি৷ তাঁরা তো বিমান দিয়েই গেছে৷ সেখানে আমার ইমিগ্রেশনকে আরো কঠোর হতে হবে৷ এছাড়া আমাদের জন্য বড় শ্রমবাজার দুবাই, মালয়েশিয়া, ইরাক– সেগুলো তো বন্ধ হয়েছে৷ অথচ ভিয়েতনাম, নেপাল, এমনকি ভারতে থেকেও ওই সব দেশে শ্রমিকরা যাচ্ছেন৷ এই জায়গাগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে৷’’ সূত্র: ডয়চে ভেলে

জুমবাংলানিউজ/একেএ