জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার লাইফ স্টাইল

শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়ক, শৈশবে সৃজনশীলতার অনুশীলন

রুতব সরকার: শৈশব মানে দুরন্তপনা। হই-হুল্লোড়, ছুটোছুটি আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক সময়। প্রতিটা মানুষই তার শৈশবের কথা মনে করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। কখনও কখনও শৈশবে ফিরে যাওয়ার আকুতি ব্যক্ত করে বলেন, ইস! আবার যদি ছোট হয়ে যেতে পারতাম। একই সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসও আসে এই ভেবে যে; এখনকার শিশুরা আমাদের মতো দুরন্তপনায় মেতে ওঠার সুযোগ পায় না কিংবা প্রাণচঞ্চলতায় ভরপুর নয় ।

২০১৭ সালে সেভ দ্য চিলড্রেনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, শৈশবের রং হারিয়ে ফেলেছে বিশ্বের ৭০ কোটি শিশু। বলা যায়, আমরা বড়রাই ওদের শৈশবের রং কেড়ে নিয়েছি। কারণ নব্বইয়ের দশক কিংবা তার আগের সময়ের বিনোদন ও বর্তমান সময়ের বিনোদনের ধরন একেবারেই ভিন্ন। বলা যেতে পারে, এখনকার বিনোদন প্রায় পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রভাব ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’ধরনের হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। আর তাই শিশুর বিনোদনের ব্যাপারে বর্তমান মা-বাবার একটু বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি।

শিশুর আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে সবার আগে প্রয়োজন উদ্বেগমুক্ত বা শঙ্কামুক্ত পারিবারিক পরিবেশ। কেননা শিশুরা যেকোনো ‘প্রথম’ কিছু পরিবারের সদস্যদের দেখেই শেখে। শিশুর বাবা-মা, বড় ভাই-বোন, দাদা-দাদী ও কাছের আত্মীয়রা যেভাবে আচরণ করে, শিশুরাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, সচেতন বা অবচেতন মনে তা ধারণ করে। পরবর্তীকালে তা-ই অনুশীলন করে। বড়রা যা করে, শিশুরা তার অনুকরণ করে। তাই শিশুর জন্য একটি ইতিবাচক ও সৃজনশীল পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এখনকার জীবন যাপন মূলত নগরকেন্দ্রিক। নাগরিক ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতা শিশুর মানসিক বিকাশে অন্যতম প্রধান একটি বাধা। গ্রামে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর তুলনায় শহরের একজন শিশু কম রঙিন শৈশব পায়। শহরে খেলার মাঠের অপ্রতুুলতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যে কয়েকটা খেলার মাঠ আছে সেগুলোও কোনো না কোনোভাবে বেদখলে চলে গেছে। ফলে শহরের শিশুরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি মানসিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যেটা করা যেতে পারে, তা হলো শহরে যেসব বিদ্যালয় আছে; সেগুলোয় মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করা। যেহেতু শিশুরা দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বিদ্যালয়ে কাটায়, সেহেতু বিদ্যালয়ে খোলা মাঠ থাকলে মাঠে তারা সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করার সুযোগ পাবে। এতে শিশুর শারীরিক ও মানসিক উভয়ক্ষেত্রের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। শিশুর মনে বড় হয়ে ওঠার আকাক্সক্ষা জাগ্রত হবে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব থেকে শিশুকে রক্ষা করতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া উচিত। শিশুর কান্নাকাটি, বা ‘যন্ত্রণা’ থেকে ‘রেহাই’ পেতে তার হাতে স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ তুলে দেন অনেক বাবা-মা। সাময়িক ‘প্রশান্তি’ পাওয়ার বিনিময়ে তারা সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তৈরিতে যে অপভূমিকা রাখছেন, তা সত্যি ভয়াবহ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর উপকরণ নয়, বরং সৃজনশীলতা চর্চায় সহায়ক এমন সব উপকরণ শিশুর হাতে তুলে দিন। এতে তার বুদ্ধির বিকাশ ও মানসিকভাবে বড় হয়ে উঠা দুটোই ত্বরান্বিত হবে। নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার

পাশাপাশি চিত্রাঙ্কন, গান, কবিতা, নাচ, বুদ্ধিবৃত্তিক গেমস, শিশুতোষ-শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র প্রভৃতি শিশুর মানসিক বৃদ্ধিকে করবে দ্রুততর ও ইতিবাচক।
শিশুকে অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপ দেওয়া উচিত নয়, যেটা বর্তমানে করা হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে তিনটা করে বই পড়ানো হলেও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে একই পর্যায়ে দশ বা কখনও কখনও দশটারও বেশি বই পড়ানো হয়। এছাড়া একাধিক গৃহশিক্ষকের কাছে দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পড়ার ব্যবস্থা থাকে, যা শিশুর পক্ষে একেবারেই সহনশীল নয়। এই বয়সে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় সময় দেওয়া উচিত। এই খেলাধুলা যেন সৃজনশীল হয়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। সৃজনশীলতার চর্চা শিশুর মনে বড় হয়ে উঠার ক্ষিধে বাড়িয়ে দেয়। তখনই দরকার বাড়তি পুষ্টির। এ সময় সন্তানকে বাড়তি খাবার খাওয়ানো উচিত।

তাকে জ্ঞানভিত্তিক ছবি সংবলিত বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, আকর্ষণীয় মলাটের এ বইগুলো শিশুকে যেমন আকৃষ্ট করে, তেমনি এসব বই থেকে শিশুর জ্ঞান-বুদ্ধির বিকশিত হবে। এছাড়া চিত্রাঙ্কন শিশুর প্রিয় বিষয়। শিশুর চিত্রাঙ্কন উৎসাহিত করা হলে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটবে। সাধারণভাবেই বেশিরভাগ শিশুই সৃজনশীল। দরকার যত্ন, স্নেহ ভালোবাসা; যা শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে আরও আনন্দময় করে তুলবে।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়