ফেসবুক মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

রাজনীতির দীনতা এবং অনলাইন আসক্তির কথাও শেয়ার করা উচিত

এহসান জুয়েল :: একটা লোক তার স্বভাবসূলভ ভঙ্গিতে কথা বলেন। আঞ্চলিক ভাষায়, তার মতো। লোকটা রাষ্ট্রপতি, তবে সেটা নিয়ে তার আলগা ভাব নেই। রাষ্ট্রপতি নবী-রাসুল কিংবা কোরান-হাদিস না যে, তাকে সবসময় পূজনীয় স্টাইলে চলতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, একটা লোক যা নন, তার কাছে সেটা প্রত্যাশা করাও কিন্তু ভণ্ডামী। তিনি মজা করে প্রিয়াংকা চোপড়া নিযে কী বলেছেন, সেটা যারা ইস্যু করছেন, তাদের উচিত রাজনীতির দৈন্য এবং অনলাইন আসক্তি নিয়ে তিনি কী বলেছেন, সেটাও শেয়ার করা।

ahasan jewel

“গরিবের বউ নাকি সবারই ভাউজ। অহনে যারা শহরে থাকেন, তাঁরা তো ভাউজ চিনবেন না, ‘ভাউজ’ হইলো ভাবী। ভাইয়ের বউকে ভাবি ডাকি আমরা, গ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাবীদের ‘ভাউজ’ ডাকা হয়। আর গরিবের বউ হলে মোটামুটি পাড়া বা গ্রামের সবাই আইস্যা ভাউজ ডাকে। এহন রাজনীতি হয়া গেছে গরিবের বউয়ের মতো। এখানে যে কেউ, যেকুনো সময় ঢুইকা পড়তে পারে। কোনো বাধা বিঘ্ন নাই।’

“অন্যান্য পেশায় চাইলেই যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও রাজনীতিতে তা আছে। যে কারণে সবাই চাকরি শেষ করে রাজনীতিতে ঢুকতে চায়। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। আমি যদি বলি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিকসের লেকচারার হইতাম চাই, নিশ্চয়ই উপাচার্য সাহেব আমারে ঢুকাইবেন না। বা আমি যদি কোনও হাসপাতালে গিয়া বলি, এতদিন রাজনীতি করছি, হাসপাতালে ডাক্তারি করার লাইগ্যা দেও। বোঝেন অবস্থাটা কী হবে?’

“কিন্তু রাজনীতি গরিবের ভাউজ, সবাই ইঞ্জিনিয়ার কইন আর ডাক্তারই কইন, এই ভিসি সাবও ৬৫ বছর হইলে কইব, আমিও রাজনীতি করুম। যারা সরকারি চাকরি করে, জজ সাবরা যারা আছে, ৬৭ বছর চাকরি করব। কইরা রিটায়ার্ড কইরা কইব, ‘আমিও রাজনীতি করিব’। আর্মির জেনারেল অয়, সেনাপ্রধান অয়, অনেকে রিটায়ার্টমেন্টে গিয়েই কয়, ‘আমিও রাজনীতি করিব’। সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি বা জয়েন্ট সেক্রেটারি প্রত্যেকেই রিটায়ার কইরা বলে, ‘আমি রাজনীতি করিব’। এটার কোনও রাখ-ঢাক নাই, কোনও নিয়মনীতির বালাই নাই। যে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা, তখনই রাজনীতিতে ঢুকতাছ।”

“ডাইরেক্ট রাজনীতির মধ্যে আইসা তারা ইলেকশন করবে, মন্ত্রী হয়ে যাবে, এটা যেন কেমন-কেমন লাগে। যার জন্যেই আমার মনে হয়, আমাদের দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে না। এমনকি পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন ডিআইজি, আইজিরাও রাজনীতি করে। আবার মনে মনে কই, আমরা রাজনীতি করার সময় এই পুলিশ তোমার বাহিনী দিয়া কত বাড়ি দিছ। তুমি আবার আমার লগে আইছ রাজনীতি করতা। কই যামু। রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে হবে। এই যে রাজনীতিবিদদের সমস্যা, এই সমস্যার কারণও এটা। বিজনেসম্যানরা তো আছেই। শিল্পপতি-ভগ্নিপতিদের আগমন এভাবে হয়ে যায়। কী করবেন। এগুলো থামানো দরকার।”

“চাকরি কইরা কেউ ৫৯ বছর, কেউ ৬৫ বছর, কেউ ৬৭ বছর কইরা ওনার সমস্ত কিছু যা করার কইরা বলে যে, ‘আমি রাজনীতি করিব’। আমার মনে হয় সকল রাজনৈতিক দলকে এটা চিন্তা করা উচিত। হ্যাঁ অনেক সময় এক্সপারটাইজের দরকার আছে। বলে যে পেশাভিত্তিক পার্লামেন্ট এ ধরনের কথাও বলে। পেশাভিত্তিক করেন, যে ডাক্তারি পড়ে চাকরিটা করেন নাই, এমবিবিএস পাস কইরা সরাসরি রাজনীতিতে ঢুইকা পড়েন, চাকরিডা না কইর‍্যা। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে রাজনীতিতে আসেন কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু চাকরিতে না ঢুইক্যা রাজনীতিতে ঢুকেন।”

রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন কুপ্রভাবও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা কলেজে পড়ার সময় মোটামুটি প্রেমপত্র লিখছি। অনেক সময় বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতা নিছি। ভালো কোটেশন কীভাবে চিঠিতে দিলে সুন্দর হবে। এখন তো দেখি চিঠি লেখাই একেবারে বন্ধ। এখনতো মেসেজ পাঠায়। ইংরেজিতে বাংলা লেখে। কেমনে যে লেখে, কী লেখে? ফেইসবুক-টেইসবুক এসব আমি বুঝি না। আমি তো ব্যাকডেটেড। আমি মোবাইল ব্যবহার করি। টিপাটিপা নম্বরটা একটা টিপ দিই, যার কাছে মোবাইল করি সে ধরে। আর যে কেউ টেলিফোন করলে একটা টিপ দিয়া রিসিভ করতাম পারি। আর কিছুই পারি না।”

রসিকতা করে আবদুল হামিদ বলেন, “আমনেরা যে প্রেমপত্রকে বিসর্জন দিছেন। প্রেমের সাহিত্য তো মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে যাচ্ছে। আমি বলতে চাই, প্রেমপত্র লেখার চর্চাটা অন্তত রাখেন। তাহলে প্রেম বেঁচে থাকবে, প্রেমপত্র সাহিত্য বেঁচে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।”

“আমার দুই আড়াই বছরের নাতিডারে যখনই খাওয়াইতে চায়, খায় না। তখন করি কী মোবাইলের মধ্যে গেম আছে কার্টুন আছে এগুলো দেখাইলে দ্যাহে আর তারে যা দিতাছে তাই গিলতাছে। কী যে একট অবস্থা। আমরা তো ছোটবেলায় কান্নাকাটি করছি, চিল্লাইছি আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা কানছি, এই যে কানছি হার্টের একটা বিকাশ হইছে। এহন এগুলো চিল্লাইতেও পাড়ে না। মোবাইল একটা দিয়া বসাইয়া রাখে। এটা নিয়া চিন্তা ভাবনা করা উচিত।”

“আমরা ট্রেনের মধ্যে গেলে পাশের বেডারে জিগাইতাম বাড়ি কই। আমনে কই যাবেন? এখন কোনো কথাই নাই। বইয়াই মোবাইল টিপ দিয়া দেয়। তুই ব্যাটা জাহান্নামে যা, আমি আছি মোবাইল আছে আর কিচ্ছু নাই। এই যে অবস্থা। আমার মনে হয় এতে সামাজিক বন্ধন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। কেউ কাউরে চেনে না। খালি ফেসবুকের মাধ্যমে চেনে আরকি। সাক্ষাৎ দেখা আর মোবাইলের ফেসবুকে দেখা এক জিনিস না। হৃদ্যতা বন্ধুত্ব বন্ধন সৃষ্টি হচ্ছে না। এগুলোর ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।”

(সাংবাদিক এহসান জুয়েলের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত ও সংশোধিত)

জুমবাংলানিউজ/এইচএমজেড