জাতীয়

রাজধানী মেয়েদের জন্য কতটা নিরাপদ?

এমন যদি হতো, প্রিয় শহর ঢাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছি শঙ্কাহীন, নির্ভয়ে। কবে আসবে এমন দিন? যেদিন কোনো রকম ভাবনা ছাড়া, শঙ্কাহীনভাবে বাইরে বের হতে পারবে একা একটি মেয়ে। ঘড়ির কাঁটা রাত নয়টা পেরোলে দুরু দুরু কাঁপবে না বুক। কোনো উৎসবে যাওয়ার আগে মনের মধ্যে উঁকি দেবে না নিপীড়িত হওয়ার ভয়। স্বাভাবিক ও সাধারণ এ সহজ চাওয়াকে মনে হতে পারে এ যেন কল্পলোকের কোনো স্বপ্ন। নিজের প্রিয় শহর ঢাকায় নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে একজন মেয়ে একা চলতে পারে না। তাহলে কি এই শহর মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়?

অনেক স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কোচিং করতে এসেছিল মেয়েটি। কিন্তু তার পরিচিত মানুষের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। মনের স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই স্বপ্নের পালক ঝরে যায়।
অন্যান্য দিনের মতো কাজ শেষে বাড়িতে ফেরার যানবাহনের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল মেয়েটি। একটি মাইক্রোবাস এসে জোর করে তুলে নিল। চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর ফেলে দিল তাকে। থানায় মামলা করতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাকে ও তার বোনকে।

পয়লা বৈশাখে নারী নিপীড়ন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে রাতে বাড়ি ফেরার পথে দুই পোশাকশ্রমিক, উত্তরায় আরেক কর্মজীবী কিশোরীসহ বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে গত কয়েক মাসে।
ধর্ষণের শিকার হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুও। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬১টি শিশু। (সূত্র: প্রথম আলো, ৯ আগস্ট)

সমাজের এ আদর্শহীনতা, নীতিহীনতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের পেছনের কারণ কী? জানতে চাওয়া হয়েছিল সাংসদ ও কর্মজীবী নারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিরীন আখতারের কাছে। তিনি বলেন, নারীকে যতক্ষণ নারী মনে করা হবে, ততক্ষণ শহর নারীবান্ধব হবে না। যারা বিকৃত মানসিকতার, নারী নির্যাতন করে, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তা ছাড়া প্রশাসনে যারা এ শাস্তির প্রক্রিয়ার অংশ, তাদের মানসিকতার বদলও খুব প্রয়োজন। এত প্রতিকূলতার মধ্যে কেউ কেউ হেরে গেলেও বেশির ভাগ নারী পিছিয়ে যাচ্ছেন না। যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে সংগ্রাম করছেন।

যে শহরে রাস্তাঘাটে মেয়েদের জন্য পরিচ্ছন্ন পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই, সেই শহর কতটা নারীবান্ধব তা সহজে বোঝা যায়। ঢাকার ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যাকালীন এমবিএ করছেন যোশিতা হাসান। অনেক সময় ক্লাস শেষ হতে তাঁর রাত ১০টা বেজে যায়। তখন ধানমন্ডি থেকে খিলক্ষেতের বাসায় না পৌঁছা পর্যন্ত বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে তাঁর। এমন ভয় নিয়ে চলতে তাঁর মোটেও ভালো লাগে না। তিনি মনে করেন, কোনো সহিংসতার শিকার হলে পুলিশের কাছে গেলে উল্টো নাজেহাল হতে হবে না তো।
বাস্তব চিত্র বেশির ভাগ সময় তেমনটাই বলে। ধর্ষণের শিকার হয়ে তা প্রমাণ করতে যাওয়া তো আরেকবার ধর্ষণের শিকার হতে হয় নারীকে।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড ‘নিরাপদ নগরী নির্ভয় নারী’ প্রচারণার অংশ হিসেবে একটি গবেষণা অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস ২০১৪ সালের মে-জুন মাসে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ৮০০ জন নারী ও কিশোরী এবং ৪০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালনা করে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ৯৫ শতাংশ নারী মনে করেন, পুলিশি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে হেনস্তার শিকার হতে হয়। যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৪ শতাংশ নারী এ ব্যাপারে কোথাও অভিযোগ করা দরকার বলে মনে করেন না। উত্তরদাতাদের ৬৫ শতাংশ নারী মনে করেন, পুলিশ অভিযোগকারীকেই দোষারোপ করে।

৫৭ শতাংশ নারীর মতে, মামলা নিতে পুলিশ গড়িমসি করে, ৫৩ শতাংশ নারীর মতে অভিযোগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। আর পুলিশ কর্তৃক আবার হয়রানির আশঙ্কায় ৩০ শতাংশ নারী কোনো অভিযোগ করেন না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আরও নারী পুলিশ সদস্য নিয়োগ ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছি আমরা। পুলিশ সদস্যদের মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দেশের সব থানায় একজন নারীবান্ধব পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।’

নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নয়নের কথা বলে আমরা মুখে কথার ফেনা তুলছি। নারীবান্ধব শহরের জন্য মাথাব্যথা কজনের আছে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লাকী আক্তার মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তন আনতে হবে। নারীদের নীতিনির্ধারণের জায়গায় এসে পরিবর্তন ত্বরান্বিত করতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব অনিরাপদ নগরের জন্য দায়ী।

ইউএন উইমেন নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ‘সেফ সিটিস ফ্রি অব ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন অ্যান্ড গার্লস ইনিশিয়েটিভ ইন পাবলিক প্লেস’ বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে কাজ শুরু করেছে। তারা মনে করে, পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে যতটা সচেতনতা বেড়েছে, ঠিক ততটা অবহেলিত হচ্ছে সর্বসাধারণের চলাচলের স্থানগুলো—গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাস্তা, পার্ক ইত্যাদি। তাদের মতে, সেই শহরই নারীর জন্য নিরাপদ, যেখানে তাঁরা নির্বিঘ্নে যেকোনো সময় সব জায়গায় চলাচল করতে পারবেন, তাঁদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেবে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার। যদি কোনো সহিংসতার শিকার হন তাঁরা, তাহলে অপরাধীকে উপযুক্ত সাজা দিতে হবে।

একা একা দুনিয়া ঘুরে দেখার স্বপ্ন থাকে অনেক মেয়ের মনে। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, কানাডার অটোয়া (সূত্র: এসকেপহেয়ার ডট কম) অন্যতম নারীবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র। নিরাপদে ঘুরতে পারবেন একজন নারী। ইট-দালানের এই শহরে নিজের ঘরে বসে অন্তর্জালে যখন এ তথ্য চোখের সামনে আসে, তখন দীর্ঘশ্বাস হয়তো বেরিয়ে আসবে। মনে হবে আমাদের শহরটা কবে আমাদের জন্য নিরাপদ হবে?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিরা চাইলে সহিংসতা ও নির্যাতন কমাতে পারেন। এ বিষয়ে আমরা মন্তব্য জানতে চেয়েছি ঢাকা শহরের দুই মেয়রের কাছে

ভিডিওঃ যে ভিডিও দেখার পর হাসতে হাসতে

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি