মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসীকে এ কেমন রসিকতা?

ছোটবেলা থেকে টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে রান্নার অনুষ্ঠান ছিল আমার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। আমাদের শৈশবের সেই সময়টায় এখনকার মতো এত চ্যানেল এবং ভূরি ভূরি রন্ধনশিল্পী ছিলেন না। দু-একটা রান্নার অনুষ্ঠানে প্রিয় কিছু চেনা মুখ। এই গুণী চেনা মুখের মানুষগুলোই কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে রান্নাকে শিল্পে পরিণত করেছেন। তাঁদের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় খুব সাধারণ রান্নাও হয়ে উঠেছে অনন্যসাধারণ। তখনকার সময়ের রন্ধনশিল্পীদের যদি নামের তালিকা করি, তবে কেকা ফেরদৌসীর নামটা সবার আগেই চলে আসে। কারণ, টেলিভিশনের পর্দায় কেকা ফেরদৌসী ছিলেন অতিপরিচিত মুখ।

মনে পড়ে, দেশে ফেলে আসা সেই রমজান মাসগুলোর কথা! ইফতার সাজিয়ে বসে আছি আজানের প্রতীক্ষায়। এরই ফাঁকে কেকা ফেরদৌসীর ‘মনোহর ইফতার’ অনুষ্ঠান। একেক দিন একেক রকমের ইফতারের রেসিপি। বাহারি আর লোভনীয় সেসব ইফতার দেখে পরের দিনই চেষ্টা করতাম ইফতারের আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে। বছরের পর বছর প্রতি রমজানে কেকা ফেরদৌসী তাঁর রান্নার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সবার মনে ঠাঁই করে নিয়েছেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, একসময় সবার মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসী তাঁর অবস্থান থেকে ইদানীং ছিটকে পড়েছেন অনেকটা দূরে! আর সে জন্য হয়তো দায়ী আমাদের অতি আধুনিক হুজুগে সমাজ। আধুনিকতার নামে বর্তমান তরুণ সমাজ এতটাই নিচে নেমে গেছে যে সভ্যতা নামক শব্দ যে পৃথিবীর ভান্ডারে কখনো ছিল, সেটাই যেন তারা ভুলতে বসেছে।
রমজান মাস সিয়াম সাধনার ও সংযমের মাস। কিন্তু সংযমের এই মাসে একদল মানুষ উঠে-পড়ে লেগেছেন কেকা ফেরদৌসীর পেছনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান হাতিয়ার! এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলেই দেখা যায়, কেকা ফেরদৌসীকে নিয়ে বিভিন্ন রকম ট্রল। তাঁকে ব্যঙ্গ করে তৈরি এসব ট্রলে নানাভাবে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। মায়ের বয়সী একজন ভদ্রমহিলাকে নিয়ে কৌতুক আর হাস্যরসের যেন শেষ নেই আমাদের যুবসমাজের কাছে। কেকা ফেরদৌসী যেন হয়েছে উঠেছেন ফেসবুকের প্রধান টপিক। তাঁর রান্নার রেসিপি নিয়ে ইউটিউবেও তৈরি হয়েছে নানা কুরুচিপূর্ণ ভিডিও চিত্র। বিষয়টি সত্যি খুব বেদনাদায়ক।

আমাদের দেশে সেলিব্রেটিদের নিয়ে সমালোচনা, গুজব ও ব্যঙ্গ করার প্রচলন অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল বানিয়ে তাঁদের সরাসরি অসম্মান করা যেন এখন হালের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এর আগেও অনন্ত জলিল, শাকিব খানসহ আরও অন্যান্য সেলিব্রেটিকে নিয়ে ফেসবুকে উঠেছে হাস্যরসের ঝড়! তবে রমজান মাসে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে নিয়ে দিনের পর দিন যেসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। বছরের পর বছর কেকা ফেরদৌসীর রান্নার অনুষ্ঠান কি আমরা উপভোগ করিনি? আমাদের মায়েরা কি তার রেসিপি অনুসরণ করেননি? তবে আজ যখন তিনি ব্যতিক্রম কিছু উপহার দিতে চাইছেন, তাতে আমজনতার এত মাথাব্যথা কেন? মানলাম, তিনি নুডলস দিয়ে বিভিন্ন রকমের রেসিপি তৈরি করে দেখাচ্ছেন। আমাদের যদি ভালো না লাগে আমরা সেই অনুষ্ঠান দেখব না। শুধু শুধু তাঁর পেছনে জোঁকের মতো লেগে থেকে কি লাভ?
নুডলস দিয়ে তিনি যদি কাচ্চি বিরিয়ানি কিংবা মগজ ভুনা করে দেখান তাহলে তো বলতে হবে তিনি অনেক বড়মাপের প্রতিভাধর রন্ধনশিল্পী। একজন শিল্পী তার শৈল্পিক গুণের ছোঁয়ায় অসুন্দরকে সুন্দর, আর অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। তার এই ব্যতিক্রম চেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাতে পারি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন রন্ধনশিল্পী নিশ্চয়ই অখাদ্য তাঁর দর্শকদের উপহার দেবেন না। আমরা তাঁর রেসিপি অনুসরণ করে দেখতে পারি, ভালো না লাগলে তাঁকে জানাতে পারি। কিন্তু তাঁকে ছোট করার জন্য রুচিহীনতার পরিচয় দিতে পারি না।

ভাবতে খুব অবাক লাগে, বর্তমান প্রজন্মের কিছু উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ে কেকা ফেরদৌসীকে খুব বেখাপ্পাভাবে কেকাপ্পা ডাকা শুরু করেছে। মায়ের বয়সী একজন নারীকে যদি আপা হয়, তাহলে তো আমরা জন্মগ্রহণই করিনি। তিনি তাঁর অনুষ্ঠানে অতিথি শিল্পীদের কথা বলার সুযোগ দেন না। এটা নিয়েও অনেক সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টি আমার কাছেও ভালো লাগে না কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালনা করা হয়? একজন উপস্থাপক তাই করেন, যা পরিচালক তাঁকে নির্দেশ দেন। হয়তো সময়স্বল্পতার জন্য কেকা ফেরদৌসী তাঁর অনুষ্ঠানে আগত অতিথি শিল্পীদের কথা বলার খুব বেশি সুযোগ দিতে পারেন না। সেটা যদি দৃষ্টিকটু মনে হয়, এর সবটুকু দায়ভার কেন শুধু একা কেকা ফেরদৌসীর ওপর পড়বে? যাঁরা অনুষ্ঠানের আয়োজক ও পরিচালক, তাঁরা কি বিষয়টি লক্ষ করেননি?

কেকা ফেরদৌসীকে যারা কেকাপ্পাসহ আরও অন্যান্য ব্যঙ্গাত্মক নামে ডেকে হেয় করার চেষ্টা করছে, তারা কি আদৌ কেকা ফেরদৌসীর পায়ের নখের যোগ্যতা রাখে? মূলত, যোগ্যতাহীন মানুষেরাই অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বিবেকবান মানুষের পক্ষে অন্যকে এতটা ছোট করা সম্ভব নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যদি আমরা সামাজিকই হতে না পারি, তবে তো আমাদের চিড়িয়াখানার জীবজন্তুদের সঙ্গে থাকলেই মানায়। এখনকার যুগের অনেক ছেলেমেয়েরা মনে করে মানুষকে হেয় করা, ছোট করে কথা বলাই স্মার্টনেস। কিন্তু এটা যে তাদের চরম নৈতিকতার অবক্ষয়, সে বিষয়ে তারা বিন্দুমাত্র সচেতন নয়। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উদাসীনতাও অনেকাংশে দায়ী। ছোটবেলা থেকে যদি সন্তানদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা উপযুক্তভাবে দেওয়া হয়, তাহলে কখনই তারা পথভ্রষ্ট হবে না।

একবার ভাবুন তো মাতৃতুল্য কেকা ফেরদৌসীকে নিয়ে যে মজার খেলায় মেতেছে এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা, কাল যে আপনাকে-আমাকে নিয়েও এমন কিছু করবে না, তার কি নিশ্চয়তা!

রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে কোনো পরিচয় নেই। তাঁকে আমি চিনি শিল্পী হিসেবে আর একজন শিল্পীর শিল্পসত্তাকে আমি সব সময়ই সম্মান করি। প্রবাসে বসে যখন আমরা আমাদের দেশের গুণী শিল্পীদের অন্যান্য দেশে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে দেখি, তখন ভীষণ গর্ব হয়। মনে হয়, আমাদের সোনার বাংলাদেশও পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে। তাই নিছক মজার ছলেও উচিত নয়, একজন শিল্পীকে তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করা। সূত্র : প্রথম আলো

জুমবাংলানিউজ/এসএস