জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার রাজনীতি

যে কারণে ভেস্তে গিয়েছিল হাসিনা-খালেদার সংলাপ উদ্যোগ

মাহামুদুল হাসান: আজ বুধবার থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে।  সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।  কেননা বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি।  সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিন পূর্বে এই ক্ষণ গণনা শুরু হয়।  নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আগামীকাল সন্ধ্যায়  ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে।  এই সংলাপে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির মহাসচিবসহ পাঁচ সিনিয়র নেতা।

মাহামুদুল হাসান, সম্পাদক, জুমবাংলা ডটকম

এই সংলাপ এখন ‘টক অব দি কান্ট্রি’।  সংলাপ নিয়ে আলোচনা এখন সবার মুখে মুখে।  কদিন আগেও কেউ ভাবতে পারেননি যে চির বৈরী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা একসঙ্গে বসবেন।  এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও ভাবতে পারেননি তারা চির বৈরীদের সাথে নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসবেন।  সংলাপের মূল উদ্যোক্তা ঐক্যফ্রন্টের চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেনকে উদ্দেশ্য করে আজকে তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেই ফেললেন, ‘ড. কামাল সাহেব কামাল করে দিলেন।  আমরা বলেছিলাম সংলাপের প্রয়োজন নেই।  কিন্তু এখন সংলাপ করছি।  তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীও তা গ্রহণ করেছেন। ’

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সংলাপ নিয়ে এত জল্পনা কল্পনা সেই সংলাপ কতটা ফলপ্রসু বা সফলতার মুখ দেখবে? অতীতের ইতিহাস বলছে, এ ধরণের সংলাপের আয়োজন কোন আলোর পথ দেখাতে পারেনি বরং রাজনৈতিক  দ্বন্দটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল।  আমরা জানি, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এরকম একটি সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।  ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসের সেই সংলাপের উদ্যোগের কথা জাতি এখনো ভুলে যায়নি।

২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর।  শুক্রবার।  ঢাকায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের জনসভা থেকে সরকারকে আলটিমেটাম দেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।  নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে শনিবারের (২৬ অক্টোবর) মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ না নিলে রোববার (২৭ অক্টোবর) থেকে তিন দিনের হরতাল পালনের হুমকি দেন তিনি।  তারই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি বিরোধী নেত্রীর সাথে কথা বলে আলোচনার উদ্যোগ নেন শনিবারই।  আওয়ামী লীগ বিট করার কারণে ওই দিন আমি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে উপস্থিত ছিলাম।

ওইদিন দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা বার দুয়েক রিং করে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে টেলিফোনে পাননি।  পরে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীদের মধ্যে আলোচনার পর শনিবার সন্ধ্যায় দুই নেত্রীর মধ্যে ফোনে কথা হবে বলে ঠিক হয়।  খালেদা জিয়া চাইছিলেন রাত নয়টার দিকে কথা বলতে, তবে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে তিনি ছটায় কল নিতে রাজী হন।  অতঃপর সন্ধ্যে সোয়া ছয়টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তার  চির প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেন এবং প্রায় ৪০ মিনিট ধরে এই দুই নেত্রীর মধ্যে কথা হয়।

টেলিফোন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে সোমবার (২৮ অক্টোবর) সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে গণভবনে নৈশভোজের দাওয়াত দেন।  সে সময় হরতাল প্রত্যাহারে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও সংলাপের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।  খালেদা জিয়া বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচীর সময় তিনি বেরুতে পারবেন না।  তারপর যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলতে প্রস্তুত।  কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই নেত্রীর মধ্যে আর সংলাপ হয়নি।  কেন সংলাপ হয়নি তা অনুধাবন করার জন্য দুই নেত্রী ৪০ মিনিটের ফোনালাপে কি কথা বলেছিল সেটা সবার আরেকবার জানা দরকার।  দুই নেত্রীর ফোনালাপের পুরোটা নিচে তুলে ধরা হল।

খালেদা : হ্যালো, হ্যালো।

হাসিনা : হ্যালো, স্লামালেকুম।

খালেদা : স্লামালেকুম, ওলাইকুম আসসালাম।

হাসিনা : আপনি কেমন আছেন।

খালেদা : আপনি কেমন… আছি, ভালো আছি।

হাসিনা : আমি ফোন করেছিলাম আপনাকে। পাইনি।

খালেদা : দেখেন, এই কথাটা যে আপনি বলছেন, এটা কিন্তু সম্পূর্ণ সঠিক নয়।

হাসিনা : আমি আপনাকে দাওয়াত দিতে চাই।

খালেদা : কিন্তু না, আপনাকে তো আমার কথা শুনতে হবে। বলেছেন, দুপুরে ফোন করেছেন কিন্তু দুপুরে কোনো ফোন আসেনি। এ কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। দুপুরে কোনো ফোন আসেনি আমার এখানে। রেডফোন তো গত দীর্ঘদিন ধরে, বছর ধরে ডেড পড়ে আছে। তাহলে তো আপনারা গভর্মেন্ট চালান, কী খবর রাখেন। গভর্মেন্ট চালাচ্ছেন এই খবরটুকুও রাখেন না যে, বিরোধী দলের নেতার ফোন ঠিক আছে কিনা। আর আপনি যদি ফোন করবেনই, তাহলে তো গতকালই আপনার লোকদের এসে চেক করে যাওয়া উচিত ছিল যে, বিরোধী দলের নেতার ফোন ঠিক আছে কিনা।

হাসিনা : রেডফোন সব সময়ই ঠিক থাকে। এক্সচেঞ্জে…

খালেদা : আপনি লোক পাঠান। এখনই লোক পাঠান। আপনার লোক পাঠিয়ে দেখে যান।

হাসিনা : রেডফোন সব সময়ই ভালো থাকে। আপনি তো প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন। রেডফোন সব সময়ই ভালো থাকে।

খালেদা : ভালো থাকে, তো আমারটা তো ভালো নেই। আমি সেদিনও চেক করেছি। ভালো নেই।

হাসিনা : ভালো আছে। আমি যখন ফোন করেছি তখন রিং বেজেছে।

খালেদা : না কোনো রিং বাজেনি। আপনি যদি সত্য কথা না বলেন তাহলে তো চলবে না। রেডফোন ঠিক আছে এটা বিশ্বাস করতে আমি রাজি নই।

হাসিনা : সত্য কথা না বলার আমার কিছু নেই।

খালেদা : আমার ফোনে রিং আসেনি।

হাসিনা : রিং বেজেছে।

খালেদা : আপনার টেলিফোন এত পাওয়ারফুল যে, ডেডফোন জেগে উঠবে আপনার ফোনে।

হাসিনা : ঠিক আছে, যে কোনো কারণে আপনি ধরতে পারেননি।

খালেদা : না ধরতে পারিনি তা নয়। এখানে এই ছোট জায়গাটাতেই আমি বসা। এখানে ফোন বাজলে আমি না ধরার কোনো কারণ থাকতে পারে না। একটা ডেডফোন বাজতে পারে না। বুঝছেন। এটাই হল…

হাসিনা : ডেড ছিল না ডেড করে রাখা হয়েছে।

খালেদা : ডেড ছিল। বহু কমপ্লেন আপনাদের কাছে গ্যাছে। কিন্তু ফোনে, রেডফোনে আমার সঙ্গে কথা বলার কোনো লোক নেই। কাজেই আমি কার সঙ্গে কথা বলব।

হাসিনা : আমি আগামীকাল দেখব যে, কেন আপনার ফোন এরকম ডেড ছিল।

খালেদা : সেটা আপনি দেখবেন ভালো কথা।

হাসিনা : আমি আপনাকে ফোন করলাম। আগামী ২৮ তারিখে সন্ধ্যায় গণভবনে আমি আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি। আপনি যানেন যে, আমি ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি। আগামী নির্বাচন সম্পর্কে আমি আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি। আমার গণভবনে আসার জন্য আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি।

খালেদা : কি বিষয়ে দাওয়াত দিচ্ছেন সেটা তো বলবেন যে, কেন দাওয়াত দিচ্ছেন।

হাসিনা : দাওয়াত দিচ্ছি যে, আমার সঙ্গে বসে রাতে একটু খাবার খাবেন।

খালেদা : না, আমি খাবার খেতে রাজি আছি। কিন্তু ২৮ তারিখ আমি যেতে পারব না। আমাদের হরতাল আছে। ২৯ তারিখ ৬টায় আমাদের হরতাল শেষ হবে।

হাসিনা : আপনি হরতাল প্রত্যাহার করেন।

খালেদা : আমি হরতাল প্রত্যাহার করতে পারব না। আমি অনেকদিন ধরে আপনাদের রিকয়েস্ট করেছি আসুন আলোচনায় আসুন। আলোচনার সময় পর্যন্ত আপনারা শোনেননি। কাজেই আমার হরতাল পার হওয়ার পরে আপনি যেদিন…। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আমি বের হতে পারব না।

হাসিনা : কিন্তু আপনি তো নিজেই কালকে বলেছেন যে, এই সময়ের মধ্যেই…

খালেদা : আমি বলেছি, আলোচনাও চলবে। কর্মসূচিও চলবে। আমি সেটা বলেছি।

হাসিনা : আন্তরিকতা…।

খালেদা : ঠিক আছে। আন্তরিকতা ঠিক আছে। আলোচনার জন্য আমার যেতে কোনো আপত্তি নেই। আপনি যেতে বলেছেন, আমি একা যাব না। আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই আরও কিছু লোকজন থাকবে।

হাসিনা : আপনি সবাইকেই নিয়ে আসতে পারেন। যতজন খুশি নিয়ে আসতে পারেন।

খালেদা : না আমি দলবলসহ নিয়ে যেতে চাই না। আমি যাদের প্রয়োজন মনে করব তাদের নিয়ে আসব। তবে সেটা হবে ২৮ তারিখের পরে। ২৯ তারিখে আমার হরতাল শেষ হওয়ার পর।

হাসিনা : জাতির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে হরতালটা আপনি আজকে প্রত্যাহার করে নেন। হরতালে মানুষ খুন করা, এই আগুন দেয়া…।

খালেদা : না, আপনাদের অভ্যাস। গানপাউডার দিয়ে মানুষ মারা। আমাদের সেসব অভ্যাস নেই। আপনারা মানুষ মারেন। ইয়ে করেন। লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মারেন। এসব রেকর্ডেড। আপানার মুখ দিয়ে এসব শব্দ বেরিয়েছে। কাজেই আপনি এগুলো অস্বীকার করতে পারবেন না। সেজন্যই আমি বলছি। হরতাল ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় শেষ হবে।

হাসিনা : আমি অনুরোধ করব দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে হরতালটা প্রত্যাহার করে নেন।

খালেদা : না আমি দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থেই হরতালটা দিয়েছি। যেহেতু আপনারা কোনো আলোচনায় আসতে রাজি নন।

হাসিনা : আলোচনা…।

খালেদা : আপনার মন্ত্রীরা বলে দিচ্ছেন কোনো আলোচনা হবে না। সেটা বলে দিচ্ছে আপনার মন্ত্রীরা।

হাসিনা : কে বলেছে।

খালেদা : আপনি নিজে বলে দিয়েছেন। আমাদের প্রস্তাব রিজেক্ট করে দিয়েছেন। কোনো আলোচনার দরকার নেই। আবার এখন আলোচনা বলছেন। তো সেই আলোচনা হতে পারে। আমাদের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরে।

হাসিনা : আপনাকে অনুরোধ করব, হরতাল প্রত্যাহার করেন।

খালেদা : আপনি যদি এই প্রস্তাবটা আর একদিন আগে দিতেন তবে সেই আলোচনার সুযোগ ছিল। ইচ্ছে করলে উপায় বের করা যায়। কিন্তু সেটা আপনি করেননি।

হাসিনা : এটা একদিন আগের বিষয় নয়। আমি বিভিন্ন দলের সঙ্গে বসছি।

খালেদা : আমরা কতদিন আগে পারমিশন চেয়েছি। কিন্তু পারমিশন দিলেন না। মাইক পর্যন্ত লাগাতে দিলেন না। মানুষ তো আসে জনসভায় কথা শোনার জন্য। কিন্তু আপনারা মাইক পর্যন্ত লাগাতে দেননি। মানুষ দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে। এটা কোন দেশের গণতন্ত্রের নমুনা দিচ্ছেন আপনি।

হাসিনা : আমি যে সবার সঙ্গে আলোচনা করব এটা তো আমি বহুদিন আগে থেকেই বলছি।

খালেদা : আমরা যে জনসভাটা করলাম সেখানে মাইকের পারমিশনটা কেন হল না। মাইক কেন দেয়া হল না আমায়।

হাসিনা : না মাইক তো দেয়া হয়েছে।

খালেদা : আমি যতগুলো ইচ্ছে মাইক লাগাতে পারি। লোক অনেক বেশি। শুনবে। হানড্রেড ফোরটি ফোর জারি করে দেন। দেশে কি ইমার্জেন্সি হয়ে গেছে। দেশে কি ইয়ে হয়ে গেছে। জরুরি অবস্থা হয়ে গেছে। যুদ্ধাবস্থা হয়ে গেছে যে এরকম শুরু করে দিলেন আপনারা। এটা কি।

হাসিনা : আমি এ ব্যাপারে এখন কথা বলতে যাচ্ছি না। কারণ, এসব একেবারেই সত্য না। আপনি মিটিং করেছেন।

খালেদা : না আমি মিটিং করতে পারিনি। আপনারা মিটিং করতে দেবেন। মাইক দেবেন না ঠিকমতো। মিটিং করতে দিলে লাস্ট মোমেন্টে গিয়ে পারমিশন দেবেন। তো আপনি আগে মিটিং করেননি। আপনি মিটিং করেননি।

হাসিনা : আমার সেসব মনে আছে। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা মনে আছে।

খালেদা : আপনারা করিয়েছেন। গ্রেনেড হামলা আপনারা করিয়েছেন।

হাসিনা : রাত ১১টায় আপনারা পারমিশন দিয়েছিলেন সেটাও আমাদের মনে আছে। যাক সেসব আমি বলতে চাই না।

খালেদা : আপনাদের ভেন্যু ছিল…। সেই ভেন্যু চেঞ্জ করে নিয়ে গেছেন আপনাদের অফিসে সেটাও আমাদের জানাননি। এসব পুরনো কথা তুলে কোনো লাভ নেই।

হাসিনা : মুক্তাঙ্গনে পারমিশন দেননি। তখন আমরা অন্য জায়গায় গেছি। রেকর্ড আছে।

খালেদা : আমাদের কাছেও রেকর্ড আছে। কাজেই আমি বলছি আপনারা যদি সত্যি আলোচনা করতে আন্তরিক হন তাহলে আমাদের কর্মসূচি…।

হাসিনা : ঝগড়া করতে চাই না। আপনি একতরফাই তো বলে যাচ্ছেন। আমাকে তো কথা বলার সুযোগই দিচ্ছেন না।

খালেদা : আপনি তো ঝগড়া করছেনই। আর আমি একতরফা বলব কেন। আপনি কথা বলছেন আমি জবাব দিচ্ছি।

হাসিনা : আপনি একতরফাই তো বলে যাচ্ছেন। আমাকে তো কথা বলার সুযোগই দিচ্ছেন না।

খালেদা : না আপনি বারবার বলছেন হরতাল হরতাল। হরতাল প্রত্যাহার এখন হবে না। আমাদের কর্মসূচি শেষ হলে…। আপনি যানেন…।

হাসিনা : এভাবে মানুষ খুন করবেন।

খালেদা : আমরা মানুষ খুন করছি না। আপনারা মানুষ খুন করছেন। কালকেও আপনারা আমার ৯ জন মানুষকে খুন করেছেন।

হাসিনা : না না।

খালেদা : আপনার ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে না। আমরা অস্ত্রসহ ছবি দেখাতে পারব। ছাত্রলীগ যুবলীগ কিভাবে মানুষ খুন করে। নিরীহ মানুষকে।

হাসিনা : খুনের রাজনীতি আমরা করি না। বরং আমরা ভিকটিম।

খালেদা : না। এটা তো আপনাদের পুরনো অভ্যাস। সেই ’৭১-এ যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখনও তো হত্যা হয়েছে। মানুষ মেরেছেন। এগুলো ভুলে গেছেন আপনি?

হাসিনা : ৭১-এ আমরা হত্যা করেছি?

খালেদা : হ্যাঁ। অবশ্যই। ’৭১-এর পরে। যখন আপনারা ক্ষমতায় ছিলেন।

হাসিনা : যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য এখন…।

খালেদা : আপনারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যদি ঠিকমতো করতেন আমরা পূর্ণ সমর্থন দিতাম। কিন্তু আপনারা সেই ট্রাইব্যুনাল করেননি। সেটা একতরফা করছেন। আপনার দলের যারা যুদ্ধাপরাধী সেগুলোর একটাও ধরেননি। আপনি তো দলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে আপনি যেতে পারেননি। না হলে আমার সঙ্গে এই আচরণটা আপনারা করতেন না। যা করেছেন আপনারা। আমার সঙ্গে যে আচরণ করলেন, আমার পার্টি অফিসে যে আচরণ করলেন। এরপর আর বলতে হবে। যে বিরোধী দলের নেতাকে পর্যন্ত আপনারা সম্মান দিতে যানেন না। কিসের গণতন্ত্রের কথা বলেন আপনি।

হাসিনা : আপনার কথার জবাব দিতে গেলে তো সেই ২০০১-এর থেকে অনেক কথার জবাবই দিতে হবে। জেনারেল এরশাদ ও তার দলের সঙ্গে কি কি করেছেন।

খালেদা : আমরা কিছুই করিনি। যে এরশাদ যখন ক্ষমতা নিল তখন আপনি কি বলেছেন। আপনি বিবিসিকে বলেছেন আই অ্যাম নট আন হ্যাপি। তারপরে আর কি থাকে। আর বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা। ফকরুদ্দীন-মইনুদ্দিন কোন সাংবিধানিক সরকার ছিল বলেন তো?

হাসিনা : তারা তো আপনার চয়েস ছিল।

খালেদা : আমার চয়েস ছিল না। আপনার চয়েস ছিল। আপনি নিজে বলেছেন, আমার আন্দোলনের ফসল। সেরেমনিতে আমি যাইনি। আপনি গিয়েছেন। বলেছেন আমার আন্দোলনের ফসল। এগুলো ভুলে যান কেন? কিন্তু মানুষ ভুলে না।

হাসিনা : ৯ জন অফিসার ডিঙিয়ে মইনুদ্দিনকে আপনি আর্মি চিফ বানিয়েছিলেন। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন আপনাদের চয়েজ ছিল।

খালেদা : আমি বলতে পারি। এ রকম অনেক অফিসারকে আপনি বাড়ি পাঠিয়েছেন। নয়জন কী সাতজন সেটা বড় বিষয় নয়। মইনুদ্দিন যেই থাকুক না কেন। সেখানে গেলেন কেন আপনি। সেটা তো সংবিধানসম্মত ছিল না। কেন গেলেন সেদিন? সেদিন তো আপনি মনে করেননি আমরা দুই দলই ক্ষমতার বাইরে। তখন তো একবার মনে করলেন না আমরা আলোচনা করি। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের এখানে যাওয়া ঠিক হবে না। এরা সংবিধানসম্মত নয়। আপনি তো সেটা মনে করলেন না। চলে গেলেন সেখানে হাসিমুখে।

হাসিনা : আমি আগুনে বসেও হাসিখুশি থাকি। আবার বাবা, মা, ভাই…

খালেদা : অতীত ছেড়ে দিয়ে আমি বলতে চাই এখন সামনের দিকে কী করে আগাবেন…আপনার যদি সত্যি সৎ উদ্দেশ্য থাকে তাহলে আমরা সামনের দিকে কী করে এগোবো… সামনের দিকে এগোতে চাই।

হাসিনা : আপনি তো অনেক অভিযোগ করলেন। আমি তো এত অভিযোগ করতে চাই না। ছোট্ট রাসেল…, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছেন।

খালেদা : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আপনারা করিয়েছেন। আপনাকে হত্যা করতে কেউ চায়নি। আমরা চাই আপনি থাকুন। আপনি যত থাকবেন, তত আমাদের জন্য ভালো।

হাসিনা : ১৫ আগস্ট আপনি যখন কেক কাটেন…

খালেদা : ১৫ আগস্ট আমার জন্মদিন। আমি কেক কাটবই।

হাসিনা : খুনিদের উৎসাহিত করার জন্য যখন আপনি কেক কাটেন।…

খালেদা : …এটা বলেন না। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে কোনো মানুষের জন্ম হবে না? কোনো মানুষ পালন করবে না। কেউ কেক কাটবে না? এগুলো বাদ দেন। কথায় কথায় আপনারা বলেন। অনেক কথা বলেন জিয়াউর রহমানকে। আরে জিয়াউর রহমান তো আপনাদের নতুন জীবন দান করেছে। এগুলো কথা বইলেন না। বুঝেছেন। আপনারা তো বাকশাল ছিলেন। আপনারা জিয়াউর রহমানের বদলৌতে আওয়ামী লীগ হতে পেরেছেন। আদার ওয়াইজ আওয়ামী লীগ হতে পারতেন না।

হাসিনা : রাসেলকে তো এই বাসায় ঘুরতেও দেখেছেন।…

খালেদা : আমি তো সবকিছু ভুলে যেতে চাই। আসুন নতুন করে শুরু করি। সেটাতে আপনি রাজি থাকেন, আসেন আমরা সুন্দর আলোচনা করি। আমার আলোচনা করতে আপত্তি নাই। কিন্তু সেই ডেট হতে হবে আমার হরতাল শেষ হওয়ার পর।

হাসিনা : আপনার হরতাল প্রত্যাহার করবেন না?

খালেদা : না, আমি হরতাল প্রত্যাহার করতে পারব না। এটা তো আমার ডিসিশন না। এটা ১৮ দলের ডিসিশন। আমি এটা কী করে একলা করব।

হাসিনা : আপনি ১৮ দলকে ডেকে নিয়ে বলেন…

খালেদা : এখন সময় নাই। আপনি যে তাড়া করতেছেন। এখন তো খুঁজে পাওয়া যাবে না লোকজনকে। আপনি তো সবার পেছনে পুলিশ লাগিয়ে রেখেছেন। কী করে মানুষ পাওয়া যাবে, বলেন?

হাসিনা : আমরা পুলিশ লাগিয়ে রাখব কেন?

খালেদা : আপনি লাগিয়ে রাখবেন না তো কে রাখবে? পুলিশ কার কথায় আমার কথায় চলে? আপনি তো সবার বাসায় বাসায় রেড করছেন। বস্তি থেকে পর্যন্ত আপনি লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছেন।

হাসিনা : যেখানে বোমা ব্লাস্ট হয়ে যাবে সেখানে…

খালেদা : বোমা ব্লাস্ট হয়ে যাবে। বোমা ব্লাস্ট তো আপনারা করেন। আর নাম দেন আমাদের। এগুলো তো আপনাদের পুরাতন ঐতিহ্য। কাজেই এগুলো কথা আমাকে বলবেন না। আমি বলতে চাই, যদি আপনারা ২৯ তারিখের পরে করেন আমি রাজি আছি। ২৯ তারিখের পরে আমি নিশ্চয় কথা বলতে রাজি আছি।

হাসিনা : আপনি আলটিমেটাম দিলেন দুই দিনের। আমি দুই দিনের মধ্যেই ফোন করলাম। অথচ এখন হরতালও করবেন আবার বলছেন ২৯ তারিখের পরে। আপনি কী বক্তৃতা দিলেন আর আজকে এখন কী বলছেন, আপনি একটু ভেবে দেখেন তো।

খালেদা : আমি বলেছি আলোচনা চলুক, কর্মসূচিও চলবে।

হাসিনা : কিন্তু আপনি নিজেই বলছেন দুই দিনের মধ্যে আলোচনা…হরতাল দেবেন না।…শুনেন আমার কথা…আপনি কি ক্যামেরা-ট্যামেরা নিয়ে কথা বলছেন?

খালেদা : আমার এখানে ক্যামেরা-ট্যামেরা কেউ নেই। বুঝছেন। আমি নিজেই কথা বলছি। আমি বাসায় বসে কথা বলছি। অফিসে হলে আমার জন্য সুবিধা হতো। ক্যামেরা-ট্যামেরা থাকত। টেলিভিশনে দেখব আপনারাই ক্যামেরা দেখাচ্ছেন। আমাদের এখানে ক্যামেরা-ট্যামেরা কিছু নেই। আপনি চেক করেন যে বলেছে…টেলিভিশনে স্ক্রল দিয়েছে যে ওনার রেড টেলিফোন ঠিক আছে। আমি এটা দেখতে চাই।

হাসিনা : আমি খবর নিলাম। ফোন ঠিক আছে। ১০-১২ বার ফোন করেছি।

খালেদা : ফোন ঠিক নাই। তাহলে বলতে চান আমরা কেউ ফোনে শুনছি না। ফোন বাজে আমরা কেউ শুনি না।

হাসিনা : আমি কানে শুনব কী করে। গ্রেনেড হামলায় তো আমার এক কান এমনিতেই নষ্ট। …ফোন আমি নিজে করেছি।

খালেদা : হ্যাঁ সেই আপনি তো বলছেন ফোন বেজেছে। শুনেছেন। নিজে করলে কী হবে। আপনি একটা ডেডফোনকে… আপনি বলেছেন যে, আপনি ফোন করেছেন।

হাসিনা : না না আমি ফোন…রিং হচ্ছিল।

খালেদা : রিং হবে কী করে। যে ফোন ডেড, সেটা রিং হবে কী করে। এটাই তো মনমানসিকতার পরিচয়। যে আপনি কি সত্যি কথা বলছেন কিনা।

হাসিনা : আমি সত্যি কথা বলব না কেন। মিথ্যা বলার কিছু নেই…

খালেদা : আমি কাল পর্যন্ত চেক করেছি। আপনি করতে পারেন… এগুলো রিউমার ছড়াচ্ছে। আপনি করতে পারেন।… ফোন চেক করেছি, রিপোর্ট করেছি। আপনারা… লোকজন… কেউ আসেন। তারা তো আমাদের মানুষ বলে মনেই করে না। কাজেই আসেও না, টেলিফোন ঠিক করার গরজও বোধ করে না। রেড টেলিফোন কেন? আজকাল তো ফোন মোবাইলেই হয়, তারপর টিঅ্যান্ডটি আছে।

হাসিনা : রেড টেলিফোনের দোষ দিয়ে খামাখা মিথ্যা বলার তো কোনো দরকার নেই।

খালেদা : মিথ্যা বলব কিসের জন্য। যে টেলিফোন ডেড। তো ডেডকে ডেড বলবই তো। মৃতকে মৃত বলবই। আপনি বললে তো হবে না যে ফোন বিজি ছিল। এটা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না।

হাসিনা : আপনার নম্বর আমার মুখস্থ আছে। ০৬২…। এক্সচেঞ্জ কালকে খবর নেয়াই যাবে। এটা কোনো ব্যাপার না।

খালেদা : আপনার মুখস্থ থাকতে পারে। সামনে লেখাও থাকতে পারে। কিন্তু আপনার গুলশান এক্সচেঞ্জ থেকে যে বলেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সে সত্য কথাটা বলেনি।

হাসিনা : রেড টেলিফোন কিন্তু আলাদা এক্সচেঞ্জ। আরও ভালো করে জানবেন।

খালেদা : আলাদা এক্সচেঞ্জই তো। টেলিভিশন স্ক্রল দিচ্ছে। আপনি নিজে সামনে থাকলে দেখতেন।

হাসিনা : আমি গণভবনের অফিসে বসে আছি। আমার অফিস রুমে কোনো টেলিভিশন নেই। আমার এখনই আরেকটা মিটিং…।

খালেদা : তাহলে কেন বলা হচ্ছে, টেলিফোন ঠিক আছে। এই কথাটাই তো সঠিক নয়। তাহলে কি আপনি তাদের বলে দিয়েছেন…

হাসিনা : … ফোন ঠিক নাই। এরপর তো আমার এদিক দিয়ে আপনার শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হয়েছে…

খালেদা : আপনার সঙ্গে কথাই ছিল যে এই টেলিফোনে কথা হবে আমাদের। আমি তো বসে আছি এখানে। আধা ঘণ্টা বসে ধরে আছি যে আপনার টেলিফোন আসবে। আমরা তো গোপন কিছু বলব না। এক সময় আমরা অনেক কথা বলেছি। আমরা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে কাজ করেছি। কেন কথা বলব না। আপনার বাসায় গেছি। আমরা তো একসঙ্গে…। এসব করেছি। কেন করব না। এখনও করতে চাই, বলতে চাই, কাজ করতে চাই। যে আসুন দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে বসি, কথা বলি।

হাসিনা : এজন্যই আমি বলব যে আগামী ২৮ তারিখ আসেন। আমরা আলোচনা করি।

খালেদা : না, আমি ২৮ তারিখ যেতে পারব না। আপনি যদি সত্যি আন্তরিক হন, ২৯ তারিখের পর ডেট দেন। আমি আসব।

হাসিনা : আপনি কালকে বললেন…

খালেদা : না, আমি কর্মসূচি দিয়ে ফেলেছি। এখন সম্ভব না।

হাসিনা : আপনি নিজেই বলেছেন, দুই দিনের মধ্যে আলোচনার জন্য না ডাকলে হরতাল দেবেন।

খালেদা : আমি হরতাল দিয়ে ফেলেছি। তার আগে বলা উচিত ছিল।

হাসিনা : আপনি আপনার বক্তৃতাটা আবার শুনেন।

খালেদা : হ্যাঁ, এখন আমি নিজে শুনলেও কর্মসূচি দিয়ে ফেলেছি। সঙ্গে সঙ্গেই বলেছি, কর্মসূচিও চলবে, আলোচনাও চলবে।

হাসিনা : আমি দুঃখিত, আপনি যেহেতু বললেন দুই দিনের মধ্যে…

খালেদা : আমি বলেছি। কর্মসূচি-সংলাপ একসঙ্গে চলবে।

হাসিনা : এর আগেই আমি ফোন করলাম।

খালেদা : না, হরতাল ঘোষণা হয়ে গেছে। কর্মসূচি ঠিক হয়ে গেছে। ১৮ দলের সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৮ দলকে পাব কোথায় এখন? এখন কেউ নেই।

হাসিনা : ১৮ দল আপনি পাবেন, ডাকলেই পাবেন। আপনি ডাকলে হবে না, এটা কোনো কথা হল নাকি। এটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

খালেদা : বিশ্বাস করবে না ঠিকই। আমি ডাকলে হতো। কিন্তু এখন হবে না, এই কারণে…

হাসিনা : আপনি বললেন, দুই দিনের মধ্যে আলোচনা না করলে আপনি হরতাল দেবেন। এ সময়ের মধ্যেই আপনাকে ফোন করলাম।

খালেদা : না, আপনি যদি কাল রাতেও ফোন করতেন, তাহলে কর্মসূচি বিবেচনা করা যেত। পুরো রাত চলে তো গেছে। সকালে অফিসে চলে গেছি।

হাসিনা : রাতে ফোন না দিলে তো আপনার হয় না। আমি রাত জাগি না।

খালেদা : আপনি কি সন্ধ্যার সময় ঘুমিয়ে পড়েন?

হাসিনা : আমি নামাজ পড়ি…

খালেদা : আমি জানি। আপনি নামাজ পড়েন, কোরআন পড়েন… সব করেন। সবই জানি। আবার গুলি করে হত্যাও করেন। এগুলো আমি সবই জানি।

হাসিনা : আপনারা কোরআন শরিফ পুড়িয়েছেন। আপনি যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন আমি ঠিক সেই সময়ের মধ্যেই আপনাকে ফোন করেছি আলোচনার জন্য।

খালেদা : কোরআন শরিফ আপনারা পুড়িয়েছেন। যে, এখন আপনারা এগুলোতে বিশ্বাস করেন না।

হাসিনা : কোরআন শরিফ আমরা পোড়াই না। এটা অত্যন্ত একটা জঘন্য কাজ।

খালেদা : ২৯ তারিখের পর যদি আপনারা আলোচনা করতে চান। আমরা রাজি আছি। এখন আমার কিছু বলার কোন সুযোগ নেই।

হাসিনা : আমি ঠিক সময়েইর মধ্যেই আপনাকে ফোন করেছি। কাজেই এখন আপনি…।

খালেদা : আমি এখন পারব না। কারণ আমার দলের কোনো নেতাকে পাব না, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের পাব না, ১৮ দলের নেতাদের পাব না, কার সঙ্গে কথা বলে আমি এটা প্রত্যাহার করব, আপনি বলেন?

হাসিনা : আপনি কাউকে পাবেন এটা একটা কথা হল? আপনি হুকুম দিলেই তো সব হবে।

খালেদা : আরে আপনার ডিবি, এসবি তো আমার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছে। আমার নেতারা কি করে আসবে বলেন?

হাসিনা : আপনারা ছুরি-কাঁচি-দা-কুড়াল নিয়ে মানুষকে আক্রমণ করার কথা বলছেন।

খালেদা : ছুরি-কাঁচি-দা-কুড়াল নিয়ে তো আপনারা করেন। বিশ্বজিৎকে আপনার লোকজন দা দিয়ে হত্যা করল না?

হাসিনা : আমার লোকজন না। যারা করেছে তারা অনেক আগে থেকেই বহিষ্কৃত। আমরা তাদের সবাইকে গ্রেফতার করেছি।

খালেদা : জড়িতদের একটাও গ্রেফতার হয়নি। সব নিরীহ। নিরীহ মানুষকে ধরেন যদি আল্লাহর তরফ থেকে…।

হাসিনা : জড়িতদেরই ধরা হয়েছে। এবং ধরার পরই জানা গেছে তারা ছাত্রলীগের নাম বললেও তাদের বাবা-মা হয় জামায়াত করে নয়তো বিএনপি করে।

খালেদা: আপনাকে আবার রিকোয়েস্ট করছি, ২৯ তারিখের পর যে কোনো দিন আপনি সময় দেন, আমি আলোচনায় রাজি আছি। এখন এ কর্মসূচি থেকে বেরোনোর কোনো পথ নেই। আপনি ৩০ তারিখে ডাকেন, আমি যাব।

হাসিনা : আপনি জনগণের সামনে, জাতির সামনে যে বক্তব্যটা দিয়েছেন, সেটা অনুসরণ করেন। হরতাল প্রত্যাহার করেন। আপনি সেই কথাটাই রাখেন।

খালেদা : সেটা করার পথ আর খোলা নেই এখন। টাইম ওভার হয়ে গেছে। আপনি যদি কাল রাতেও ফোন করতেন, আমি রাতেই মিটিং ডাকতাম।

হাসিনা : আপনি দুই দিন সময় দিয়েছিলেন। আমি দুই দিনের মধ্যেই আপনাকে ফোন করেছি।

খালেদা : আমাকে আর যাতে কোনো কর্মসূচিতে যেতে না হয় সেজন্য ৩০ তারিখ রাখেন তাতে আমার কোন আপত্তি নেই।

হাসিনা : আপনি কালকে যে কথা বলেছেন সেটা তো…।

খালেদা : এখন আমি বলছি আমার কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। আর যদি ৩০ তারিখে করেন আমি যাব সেখানে।

হাসিনা : কিন্তু আমি দুঃখিত আমার মিটিং আছে। আমাকে এখন যেতে হবে। কালকে আপনি পাবলিকের কাছে যে বক্তৃতাটা দিয়েছিলেন…। এখন আমাদের জেনারেল সেক্রেটারি আছেন, আপনাদের ভারপ্রাপ্ত আছে। যদিও জেনারেল সেক্রেটারি ও ভারপ্রাপ্তদের কথাও… তারপরও সেটুকু আমরা কনসিডার করতে পারি। কথা হবে। বলবে।

খালেদা : না এগুলো কথা তুলবেন না।

হাসিনা : আপনি জনগণের সামনে যে কথাটা দিয়েছেন সেটা অনুসরণ করবেন।

খালেদা : না এখন আমার আর কিছুই করার নেই। টাইম ওভার হয়ে গেছে। আপনি যদি কাল রাতে ফোন করতেন আমি ওই রাতেই মিটিং ডাকতাম। কিন্তু সেটাও আপনি করেননি।

হাসিনা : আমি সেদিনই ১০টা-১১টার মধ্যেই…

খালেদা : কিসের ১০টা-১১টা। আমি তো সেই ৭টার সময় চলে গেছি। কিন্তু নেতারা বসা। আপনি ফোন করলে আমাকে দিয়ে দিত।

হাসিনা : না আমি তো রাত জাগি না।

খালেদা : নানা ৭টা তো রাত নয়। ৭টা তো সন্ধ্যা।

হাসিনা : আমাকে তো ফোন করতে হলে আলোচনা করে নিতে হবে।

খালেদা : আমাকেও তো আলোচনা করে নিতে হবে। আপনি যদি ফোন দিতেন তবে আমি…আপনি যদি সেই সময় ফোন করতেন তবে আমি সবাইকে ডেকে ১৮ দলকে বলে দিতাম যেহেতু প্রাইম মিনিস্টার বলেছেন উনি আলোচনা করতে চান। এবং একটা নিরপেক্ষ… কিন্তু ফোন আপনি করলেন না।

হাসিনা : আপনি দু’দিন সময় দিয়েছেন। আমি দু’দিনের ভেতরেই আপনাকে ফোন দিয়েছি।

খালেদা : আপনি কি মনে করছেন এই তিন দিন হরতালেই শেষ হয়ে যাবে।

হাসিনা : না আপনি তিনশ’ তিরিশ দিন হরতাল দেবেন। আমার মনে আছে।

খালেদা : আমি তিনশ’ তিরিশ দিন হরতাল দেইনি। আপনি একশ’ তেহাত্তর দিন হরতাল ডেকেছেন। ’৯১ সালে আমরা সকলে মিলে এক সঙ্গে আন্দোলন করে গণতন্ত্র আনলাম। তারপরে সেখানে আপনারা অপজিশনে গেলেন। সেটাই গণতন্ত্র। কিন্তু আপনি তো সেদিন ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বলেছেন একদিনও আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না।

হাসিনা : নো। এসব একেবারেই…

খালেদা : এগুলো তো রেকর্ড আছে। আপনি তত্ত্বাবধায়ক চাইলেন। তত্ত্বাবধায়ক তো ইয়ে ছিল। জামায়াতের ছিল। কিন্তু আপনি তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া মানবেনই না।

হাসিনা : ইলেকশন কি হয়েছিল…

খালেদা : এসব এখনও হচ্ছে। আপনার পক্ষে আপনার ডিসি ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছে।

হাসিনা : কে কি বলছে আর পত্রিকাগুলো কে কি লিখছে।

খালেদা : না কে কি বলছে নয়। এগুলো ঠিক তো। আজকে ভোট চাচ্ছেন। কালকে ডিসিকে বলবেন ব্যালট বাক্স…। এগুলো কিসের ইলেকশন। আপনি যদি ৩০ তারিখে করতে চান আমি রাজি আছি। এটা আমার ফাইনাল। এর বাইরে আমি যেতে পারব না।

হাসিনা : ডিসি ভোট চাইবে কিসের জন্য।

খালেদা : চেয়েছে তো। পত্রিকায় এসেছে।

হাসিনা : আমি যথেষ্ট স্ট্রং। ভোট চাওয়ার লোকের আমার অভাব নেই। আমার দল সংগ্রাম করেই ক্ষমতায় এসেছে।

খালেদা : আমার দলও সংগ্রাম করেই ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এ ধরনের কথা বললে কথার পৃষ্ঠে কথা আসবে।

হাসিনা : আমি আপনাকে আবার অনুরোধ করছি। আপনি হরতাল প্রত্যাহার করেন। আপনি আপনার কথা রাখেন।

খালেদা : আপনি সময়মতো টেলিফোন করেননি। কালকে যদি আপনি ফোন করতেন তবে পরিবেশ পরিস্থিতি অন্যরকম হতো।

হাসিনা : কালকে তো আপনি আলটিমেটাম দিলেন। আমি সেদিনই চেষ্টা করেছি। আমার এডিসি দেড়টা পৌনে দুটা পর্যন্ত চেষ্টা করেছে। শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে বার বার কথা বলেছে। না হলেও বিশ-পঁচিশবার কথা বলেছে।

খালেদা : কিন্তু আপনি তো সময়মতো ফোন করলেন না। আপনি যদি ৯টার সময়ও ফোন করতেন তবেও নেতারা থাকত। সবাইকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম।

হাসিনা : আমার অনেক মিটিং থাকে। আপনি জানেন আমি কখনও কোনো মিটিংয়ে দেরি করে যাই না।

খালেদা : আপনি যদি মনে করেন মিটিং ইম্পর্টেন্ট না এটা ইম্পর্টেন্ট তবে সেটা… তাছাড়া মিটিং থেকে বেরিয়ে এসেও আপনি কথা বলতে পারেন।

হাসিনা : মিটিং তো ইম্পর্টেন্টই। প্রতিটি মিটিংই ইম্পর্টেন্ট। আপনি এখন সিদ্ধান্ত নেন। আপনি বলেন যে আমি আপনাকে টেলিফোন করেছি। তাহলে…

খালেদা : তাহলে আপনি বলেন, আপনি নির্দলীয় সরকার মেনে নিলেন। তাহলে আমি হরতাল উইথড্র করে নেব।

হাসিনা : না, আপনি হরতাল… সর্বদলীয় সরকার।

খালেদা : আমরা কখনই বলিনি সর্বদলীয় সরকার।

হাসিনা : যারা মাইনাস টু করতে চেয়েছিল তাদের আপনি আবার সুযোগ করে দিতে চান কেন।

খালেদা : না আমি সুযোগ করে দিতে চাই না। আপনি সুযোগ করে দিতে চাইছেন। আপনি যে ভাষায় কথা বলেন…।

হাসিনা : আর আপনি খুব মধুর ভাষায় কথা বলেন। আমি এখন যেটা বলতে চাচ্ছি আমরা পার্লামেন্টে আছি। আপনি অপজিশনে। কখনও আমি অপজিশনে। কখনও আমি সরকারে। কখনও আপনি সরকারে। আমরা যা করব পার্লামেন্টের ভেতরেই করব।

খালেদা : আপনি বলে দেন যে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে…। তাহলে আমি হরতাল উইথড্র করে নেব।

হাসিনা : না আলোচনা।

খালেদা : নির্দলীয় হবে না সর্বদলীয় হবে। আপনার ফর্মুলা না আমার ফর্মুলা অনেক আলোচনা। আপনি যদি রাজি হন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আপনি রাজি আছেন তাহলে আমি হরতাল উইথড্র করে নেব।

হাসিনা : নিজের দলের লোকের ওপর আপনার ভরসা নেই।

খালেদা : না কালকেই যদি নির্দলীয় সরকার মেনে নেন তবে আমরা রাতেই ঘোষণা দিয়ে দেব। হরতাল উইথড্র করে নেব। কোনো অসুবিধা নেই।

হাসিনা : আপনি সর্বদলীয়টা মেনে নেন।

খালেদা : না সর্বদলীয়টা হবে না। সর্বদলীয় মানা যায় না।

হাসিনা : ওরকম করেন না। পরে আবার কাকে আনবেন। ফকরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের মতো হয়ে যাবে। আসুন আমরা নিজেরা নিজেরাই করি।

খালেদা : না আপনি রাজি আছেন বলে দেন… মেনে…। ২৯ তারিখের পরে ডেট দেন আমি করব।

হাসিনা : ২৮ তারিখে আমি আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি আপনি আসেন।

খালেদা : না আমি ২৮ তারিখে যেতে পারব না। হরতালের মধ্যে আমি কোথাও যাই না।

হাসিনা : ২৮ তারিখ কাকে কাকে আনবেন বলে দেন। (পাশ থেকে কেউ শেখ হাসিনাকে কিছু বলে দিচ্ছিলেন)

খালেদা : ২৮ তারিখ আমি যাব না। আপনাকে কে ওখান থেকে প্রম্পট করছে।

হাসিনা : আপনি ভাল থাকেন। সুস্থ থাকেন। ধন্যবাদ

খালেদা : ২৮ তারিখে হরতাল প্রত্যাহার হবে না।

দীর্ঘ সময় ধরে অনেক বাক বিতন্ডার পরও দুই নেত্রী আলোচনায় বসার একটি তারিখ নির্ধারণে একমত হতে ব্যর্থ হন।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে প্রায় ৪০ মিনিটের এই বহুল প্রত্যাশিত ফোনালাপ দুদিন পরেই ফাঁস হয়ে যায়।  ফোনালাপের পুরোটাই ছিল তিক্ততাপূর্ণ।  ছিল একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ।  দুই নেত্রীর ফোনালাপ প্রকাশকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত হিসেবে দেখেছিলেন সেসময়ে বিরোধী দল বিএনপির নেতারা।  তাদের অভিযোগ ছিল সংলাপের পরিবেশ নষ্ট করতেই এটা প্রচার করা হয়েছে।  বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগমগীর বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক সংকট নিরসনে যে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটাকে অংকুরেই নষ্ট করার জন্য টেলিফোন আলাপ ফাঁস করা হয়েছে’।

যাহোক, শেষ পর্যন্ত সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন বানচালে আন্দোলনের নামে সহিংসতা-ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছিল।  ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি-জামায়াত জোট। তারা ভেবেছিল এই সরকার টিকবে না বেশি দিন।  তাদের আন্দোলনের মুখে সরকার পতন হবে।  কিন্তু গত পাঁচ বছরে সেরকম আন্দোলন করতে পারেনি বিএনপি।  দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এখন জেলে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ছাড়াই বিএনপির পাঁচ নেতা নবগঠিত রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্য নেতাদের নিয়ে আগামীকাল সন্ধ্যায় আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সংলাপে বসবেন।অনেকে বলছেন, এই সংলাপও সফল হবে না।  নির্বাচনকালীন সরকার গঠন প্রসঙ্গে সংলাপে কোনো পক্ষ ছাড় দেবে না।  তবুও আমরা আশা করছি এই সংলাপ সফল হোক।   বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভালো কিছুর চল চালু হোক এটা আমরা সবাই প্রত্যাশা করছি।

জুমবাংলানিউজ/এইচএম