মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

মৃত্যুহীন শাহজাহান সিরাজ-শফি আহমেদ

১৯৮৪ সালের ২২ ও ২৩ ডিসেম্বর অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ আহূত ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘট সফল করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন সাহসী ছাত্রনেতা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ। ধর্মঘটের সমর্থনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ দেশব্যাপী মিছিল-মিটিংয়ের ডাক দেয়।

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো আহূত ধর্মঘটকে সফল করার

আহ্বান জানায়। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যজোট (স্কপ) ধর্মঘট আহ্বান করলেও তা হরতালে রূপ নেয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কাজলার গেটে যখন সমবেত হচ্ছিল তখন ছিল পুরো রাজশাহী শহরে থমথমে অবস্থা। রাস্তার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বিডিআরের অবস্থান। অসীম সাহসী ছাত্ররা নেতাদের আহ্বানে মিছিল নিয়ে শহরের দিকে এগোতে চাইলে বিডিআর মিছিলে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। শাহজাহান সিরাজ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে শত শহীদের তালিকায় যুক্ত হয় আরেক মৃত্যুহীন নাম শাহজাহান সিরাজ। আজ থেকে ২২ বছর আগে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া অকুতোভয় শাহজাহান সিরাজকে স্মরণ করি বিনম্র শ্রদ্ধায়। অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে আগত, সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় বিশ্বাসী একজন দৃঢ় সংগঠক অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন সামরিক জান্তার বুলেটে। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখলকারী এরশাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ ওই বছরেই সামরিক শাসন প্রত্যাহার, শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দাবি করে স্মারকলিপি পেশ করে। ওই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন জাতীয় শ্রমিক জোটের শ্রমিক নেতা মরহুম মো. শাহজাহান, রুহুল আমীন ভূঁইয়া, সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা মুখলেসুর রহমান, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের আবুল বাসার ও টিইউসির পক্ষে সাইফুদ্দিন মানিক ও জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতারা। আজকের এই দিনে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্মৃতিচারণ করে দুই-একটি কথা বলতে চাই। আমি তখন জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক। কমিটিটি অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্র থেকে ওই অকার্যকর কমিটি ভেঙে দিয়ে ১১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। আমাকে মনোনীত করা হয় উক্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু আমি দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করি। আমার যুক্তি ছিল, মফস্বল শহর থেকে অতিসাধারণ পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান আমি। সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যা পরিস্থিতি তাতে ওই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। শাহজাহান সিরাজ সেই রাতে মহসীন হলে ৩৬৪ নম্বর রুমে আমার সঙ্গে রাত যাপন করেন। এর আগে আমরা একত্রে বেইলি রোডে ঢাকা থিয়েটারের ‘কীত্তনখোলা’ নাটক দেখি ও নাজিমউদ্দীন রোডে নীরব হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে গভীর রাতে হলে ফিরি। সে সারা রাত ধরে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে আমি যাতে দায়িত্ব গ্রহণ করি। নিরুপায় হয়ে আমি শেষতক রাজি হই। বীর মুক্তিযোদ্ধা সিলেটের লোকমান আহমেদ সকালে হলে এসে আমার কাছ থেকে সম্মতি আদায় করে নেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সামরিক জান্তার পেটোয়া বাহিনীর অস্ত্রের ঝনঝনানি, সেই পরিস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আমি তাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারিনি। এরপর দায়িত্ব নিয়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিপ্লবী আদর্শে সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কাজ শুরু করি। তাই আজ বারবার মনে পড়ছে মিছিলের সেই সহকর্মীর কথা, আমরা চেয়েছিলাম সমাজ বদল করতে, সেই মিছিল থেকে কতজন ঝরে গেছে! কিন্তু আমি আজও বেঁচে আছি।   সামরিক স্বৈরতন্ত্রের অবসান হয়েছে, ১৯৯০ সালে সেই বিজয়ী ছাত্র গণআন্দোলনে আমিও নেতৃত্বের কাতারে ছিলাম।লেখক : রাজনীতিক

Add Comment

Click here to post a comment