মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক-এ কে এম আতিকুর রহমান

মাঝেমধ্যে একটি কথা কানে আসে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময় বিশ্বের অন্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হলেও মুসলিম, বিশেষ করে আরব দেশগুলোর সঙ্গে তেমন একটা সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এমনও শুনি যে ১৫ আগস্টের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর আরব দেশগুলোর সঙ্গে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকারের শুধু সম্পর্ক

স্থাপন করাই হয়নি, ক্রমান্বয়ে তা অনেক বিস্তার লাভ করে।

ওই সরকারকে পাকিস্তান সরকারের তাত্ক্ষণিক সমর্থন এবং পরবর্তী সহযোগিতার ঘোষণা এ ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখে বলে কেউ কেউ বিশ্বাসও করেন। পাকিস্তানের ওই প্রতিক্রিয়ার ভেতরকার ইতিহাস এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ আজকের এ লেখাটির উদ্দেশ্য পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসার পর থেকে জাতির জনকের নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপন এবং ক্রমান্বয়ে তা দৃঢ়তর হওয়ার ঐতিহাসিক সত্যটিকে সবার কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের বীজ বপন করে চারার সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সেটিকে ধীরে ধীরে বড় গাছে পরিণত করার পরিকল্পনাও তাঁর ছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস যে সেই কাজটি তাঁর পক্ষে আর করা হয়ে ওঠেনি। তবে তাঁর গড়া ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই বাংলাদেশের বর্তমান বিশ্বসম্পর্কের ক্ষেত্র হয়েছে বহুমুখী, শক্তিশালী ও বিস্তারিত।

আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশ আমাদের সমর্থন জানালেও আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, জর্দান, মরক্কো, লিবিয়া পাকিস্তানকে সমর্থন করে গেছে। তবে সদ্যপ্রয়াত কূটনীতিক ড. ক্লোভিস মাকসউদ ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগদানের পর ২৩ সেপ্টেম্বর একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন যে পাকিস্তান সরকারের বাঙালিদের প্রতি জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিজয়ী দল আওয়ামী লীগকে দমন করার বিষয়টি বেশির ভাগ মুসলিম দেশ বুঝতে পেরেছে। নানা ঘটনায় আমরা এ কথার সত্যতাও খুঁজে পাই। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী প্রথম মুসলিম দেশ আফ্রিকার সেনেগাল শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে সমর্থনই করেনি, সে দেশের প্রেসিডেন্ট সেংঘর বাংলাদেশের জন্য সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো সফর করেন এবং তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ কথা ভুলে যাননি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সেনেগালে বাংলাদেশের দূতাবাস স্থাপন করা ছাড়াও আফ্রিকায় চটের বস্তার চাহিদা মেটানোর জন্য সে দেশে পাট চাষের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং একটি পাটকল স্থাপনে সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন। এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কথা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করতে হয় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের সমর্থন করার জন্য। আমাদের সমর্থন করার কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সম্পর্ক তিক্ততার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তারাই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে ইরাক, সিরিয়া, আলজেরিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, মিসর আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে একটু সময় নেয়। সেনেগাল (১ ফেব্রুয়ারি), মালয়েশিয়া (২৪ ফেব্রুয়ারি), ইন্দোনেশিয়া (২৪ ফেব্রুয়ারি), গাম্বিয়া (মার্চ), গ্যাবন (৬ এপ্রিল), সিয়েরা লিওন (২১ এপ্রিল), ইরাক (৮ জুলাই), দক্ষিণ ইয়েমেন (৩১ জুলাই), উগান্ডা (৫ আগস্ট), বুরকিনা ফাসো (১৯ আগস্ট) প্রভৃতি মুসলিম দেশ ১৯৭২ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

আমাদের পাশে সেদিন যারা দাঁড়িয়েছিল, সাহায্য করেছিল, সমর্থন দিয়ে উজ্জীবিত করেছিল, তারা শুধু মানবতাকেই সম্মান জানায়নি, আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবায়ন করতে উৎসাহিত করেছে। যদিও বিদ্যমান সম্পর্ক ও বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন ও অপপ্রচারের মাধ্যমে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে আরব দেশগুলোকে বাংলাদেশ থেকে দূরত্বে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিধাহীন সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবেই উচ্চারণ করেছেন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গেই বৈরিতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার অমোঘ বাণী তিনি শুধু উচ্চারণ করেই ক্ষান্ত হননি, বাংলাদেশের সংবিধানে ঠাঁই দিয়েছেন। আর এই ইস্যুটা নিয়ে পাকিস্তান ও তার এ দেশীয় দোসররা মুসলিম দেশগুলো, বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে ব্যাপক অপপ্রচার করে, যাতে বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এমনও অপপ্রচার চালানো হয় যে বাংলাদেশের মানুষ মুসলমান নয়। এই অপপ্রচার যে একেবারেই কাজ করেনি তা নয়। আর ওই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে বঙ্গবন্ধুকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে বাংলাদেশ সম্পর্কে মুসলিম দেশগুলোর ভ্রান্ত ধারণা যেভাবেই হোক ভাঙতে হবে। তাই মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও জোরদার করার জন্য আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে ছাড়াও বহুপক্ষীয় কূটনীতির সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যবহারের কথা চিন্তা করে পদক্ষেপ নিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি কায়রোতে অনুষ্ঠিত Afro-Asian Solidarity Conference-এ অংশগ্রহণের জন্য তিনি মোল্লা জালালউদ্দিনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাঠান।

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আদম মালিকের নিমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন জুলাই মাসের ৯ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া সফর করেন। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে উভয় দেশ সম্মত হয়। কাবুলে অনুষ্ঠিত ন্যামের প্রস্তুতি কমিটির সভায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে সমর্থনের জন্য ইন্দোনেশিয়াকে ধন্যবাদ জানানো হয়। ওখান থেকে ড. কামাল মালয়েশিয়া সফরে যান। সংস্কৃতি, শিক্ষা, বাণিজ্য, নৌ ও বিমান চলাচল, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে উভয় দেশ সম্মতি প্রকাশ করে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য পদের আবেদনে মালয়েশিয়া কো-স্পনসর হওয়ায় এবং কাবুলে অনুষ্ঠিত ন্যামের প্রস্তুতি কমিটির সভায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে সমর্থনের জন্য মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে এক সংক্ষিপ্ত সফরে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। ওই সফরের ফলে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতার দৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ওই সফরকে সম্মান জানিয়ে পরের বছর ৩ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার রাজা আবদুল হালিম মোয়াজ্জাম শাহ্ বাংলাদেশ সফর করেন এবং সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

১৯৭৩ সালে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান আল-জিয়াত বাংলাদেশ সফর করায় মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে যায়। ওই বছরের প্রথম দিকে লেবানন (২৮ মার্চ), আফগানিস্তান (১৮ ফেব্রুয়ারি), আলজেরিয়া ও মরক্কো (১৩ জুলাই) এবং তিউনিশিয়া ও মৌরিতানিয়া (১৭ জুলাই) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময় বঙ্গবন্ধু অনেক মুসলিম দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু মুসলিম নেতাদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। বিশেষ করে সৌদি বাদশাহ ফয়সল, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার কর্নেল গাদ্দাফি ও লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বঙ্গবন্ধু তাঁদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ওই বৈঠকগুলোর ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে পাকিস্তানের প্রচারিত ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে। উল্লেখ্য, শীর্ষ সম্মেলনের পরপরই মিসর ও সিরিয়া (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

অনেকেরই হয়তো মনে আছে, ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু ইসরায়েলকে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন; যদিও ইসরায়েল ওই অঞ্চলের প্রথম দেশ যে ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ ছাড়া আরব ভাইদের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ মিসর ও সিরিয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু এক লাখ পাউন্ড চা পাঠিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি সিরিয়ার জন্য ভিন্নভাবে একটি চিকিৎসকদলও পাঠিয়েছিলেন। মুসলিম ভাইদের জন্য জাতির জনকের এই সহমর্মিতার ফসল হিসেবে আমাদের ঘরে জমা পড়ে জর্দান (১৬ অক্টোবর), কুয়েত (৪ নভেম্বর) ও উত্তর ইয়েমেনের স্বীকৃতি।

১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে নাইজেরিয়া (৭ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিজের (ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ওই সম্মেলনে নিতে চাইছেন তাঁর অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বন্ধুরা। কিন্তু পাকিস্তান যদি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে ওই সম্মেলনে তিনি কিভাবে যোগ দেবেন? তাই পাকিস্তানকে রাজি করাতে আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মুসলিম নেতারা। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন জর্দানের বাদশাহ হোসেন। তাঁরা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে চাপ প্রয়োগ করলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে নিমন্ত্রণ করতে। পাকিস্তান সম্মত হওয়ায় ২১ ফেব্রুয়ারি সাত সদস্যের ওআইসি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এলো বঙ্গবন্ধুকে নিমন্ত্রণের জন্য। পাকিস্তান ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং কালবিলম্ব না করে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রতিনিধিদল নিয়ে পরের দিনই একটি বিশেষ বিমানে লাহোর পৌঁছে যান। সম্মেলন শুরুর আগেই স্বীকৃতি দেয় ইরান ও তুরস্ক (২২ ফেব্রুয়ারি)। আর সম্মেলনের পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় কাতার (৪ মার্চ), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১০ মার্চ) ও বাহরাইন (১৯৭৪)। তবে অন্য আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও ওমান স্বীকৃতি না দিলেও বাংলাদেশের প্রতি তাদের মনোভাবে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

২৫ ফেব্রুয়ারি মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এক রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন। এরপর ৮ মার্চ সফরে আসেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারি বুমেদিন। উভয় সফরেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয় এবং পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ সফর করেন ১৯৭৪ সালের ২৭ থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত। ২৮ জুন বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

আফগানিস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াহেদ আবদুল্লাহ ১৯৭৪ সালের ২৯ ও ৩০ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি আফগান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ দাউদের একটি বার্তা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পৌঁছে দেন। দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করা ছাড়াও একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং শিগগিরই বিমান চলাচল চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৭৪ সালের ৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু চার দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে ইরাক যান। দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর একটি পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই বছরের ৫ নভেম্বর মিসর সফরে যান। ওই সফরে মিসরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ সহযোগিতা কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু কুয়েত সফরে যান। কুয়েতের আমির শেখ জাবের আল সাবাহ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধুর এ সফরগুলো মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন শক্তিশালী করে, তেমনি আগের ভ্রান্ত ধারণা দূর করে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।

ডিসেম্বর মাসের ১৮ তারিখে বঙ্গবন্ধু এক রাষ্ট্রীয় সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত যান। সফরকালে শেখ জায়েদ আল নাহিয়ান ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ফিলিস্তিনকে সমর্থন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ওআইসির সদস্য, লাহোরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইসলামিক শীর্ষ সভায় যোগদান ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্থান সৃষ্টি করে নিতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক যখন দানা বেঁধে উঠছিল, তখনই বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। ওই দিনই পাকিস্তান সরকার খন্দকার মোশতাকের সরকারকে স্বাগত জানিয়ে অভিনন্দনবার্তা পাঠায়। এর পরপরই সৌদি আরব (১৬ আগস্ট), সুদান (১৬ আগস্ট) ও ওমান (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ধর্মীয় বিভ্রান্তির বশবর্তী হয়ে আরব দেশগুলো যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করেনি, তেমনি রাজনৈতিক ভ্রান্তির শিকার হয়েছিল দুই বিশ্বশক্তি আমেরিকা ও চীন। তবে আমেরিকা ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও চীন দেয় ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট।

খুবই কম সময়ের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনটি মুসলিম দেশ অর্থাৎ সৌদি আরব, ওমান ও সুদান ছাড়া বিশ্বের সব মুসলিম দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক তথা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়ে গেছেন। তবে ওই তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনের পথ সুগম করে গেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তা তিনি করে যেতে পারেননি। আর বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা সেই পথে হেঁটে হেঁটেই বাংলাদেশের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোসহ পৃথিবীর সব দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আজকের এই শক্তিশালী অবস্থান।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত

Add Comment

Click here to post a comment