জাতীয়

মানুষ এতটা অমানুষ হয় কি করে, এক ভয়ঙ্কর খুনের বর্ণনা

মির্জা মেহেদী তমাল: দুপুর হয়ে গেলেও স্কুল থেকে বাসায় ফেরেনি আনিস। সবাই চিন্তিত। অন্য দিন আনিস আরও আগেই বাসায় ফেরে। ওর বাবা রতন বাসাই ছিলেন। ঘরে পায়চারি করছেন। ছোট ভাই সাইফুলকে ডেকে আনিসের খোঁজ নিতে বলেন। সাইফুল তার ভাতিজার খোঁজে বেরিয়ে যান। প্রথমেই তিনি যান স্কুলে। ‘স্কুল ছুটি হয়েছে অনেক আগে। আনিসও বের হয়ে গেছে।’

দারোয়ানের কাছে এমন কথা শুনে সাইফুলের মনে ভয় হয়। বাসার কাছেই স্কুল। এত সময়ে বাসায় চলে যাওয়ার কথা ছিল। আনিস তবে গেল কোথায়? এমন সব ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরে যান সাইফুল। বড় ভাই রতন মোল্লা দরজার সামনে দাঁড়ানো। সাইফুলকে দেখেই বুঝতে পারেন, আনিসের খোঁজ মেলেনি। এবার অজানা আশঙ্কায় গোটা পরিবার। আনিসের মা-খালাদের কান্নার রোল। পুরুষদের সবাই বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। খুঁজতে থাকে আনিসকে। এ বাড়ি, সে বাড়ি। খেলার সাথীদের বাড়ি। কোথাও বাকি রাখছেন না তারা। দুপুরের পর বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কিন্তু আনিসের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কিছু বলতেও পারছে না। রতন মোল্লা পুলিশকে জানান। পুলিশও মাঠে নামে আনিসের সন্ধানে। রাতভর অভিযান চললেও পাওয়া যায় না আনিসকে।

পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুরের ঢালারচর এলাকার ঘটনা এটি। চরনতিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র আনিস নিখোঁজ হয় গত বছরের ২০ নভেম্বর। পুলিশ অভিযোগ পেয়ে রাতভর অভিযান চালালেও পায় না আনিসকে। পরদিন আবারও অভিযান শুরু করে পুলিশ। বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও পুলিশ কূলকিনারা খুঁজে পায় না।

পুলিশ খবর পায়, আনিসকে দেখা গেছে তার চাচি লাভলীর সঙ্গে। কিন্তু পুলিশ এর সত্যতা খুঁজে পায় না। কারণ পুলিশ খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারে, লাভলী বেগম ঘটনার সময় বাসাতেই ছিলেন। পুলিশের সব অভিযান ব্যর্থ হয়। রতন মোল্লার বাসায় হাহাকার। গ্রাম শুদ্ধ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক। স্কুল থেকে বেরিয়েই কীভাবে হাওয়া হয়ে গেল জলজ্যান্ত আনিস। কেউ কিছু ভাবতেই পারছে না। সেদিন পেরিয়ে যায় কোনোরকম ভালো খবর ছাড়াই। দুই দিন পর ২২ নভেম্বর বিকালে খবর রটে যায়, ঢালারচর উত্তরপাড়া এলাকার একটি ডোবায় আনিসের লাশ পড়ে আছে। এ খবরে আনিসের বাবা-মা-আত্মীয় স্বজন ছুটে যায় সেখানে। পুলিশও হাজির। হ্যাঁ, লাশ পড়ে আছে। রতন মোল্লা লাশের সামনে গিয়েই গগনবিদারী চিৎকার। লাশটি তার হারানো সন্তান আনিসের। নাক-মুখে রক্ত। লাশের শরীরের সঙ্গে লেপটে আছে কাদামাখা একটি কাপড়। আনিসের লাশ উদ্ধারের খবরে পুরো গ্রাম তখন ডোবার পাড়ে। পুলিশ বাঁশি বাজিয়ে লোকজনকে একটু দূরে সরিয়ে দেয়। রতন মোল্লা আর তার স্ত্রী তখন বিলাপ করছিলেন। লাশ ধরে কাঁদছিলেন চাচা সাইফুল। মানুষ তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তা ভালোভাবে আনিসের দেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকেন। নাক-মুখ থেকে তখনো রক্ত বেরোচ্ছিল। মুখের এক কোনায় ফেনার মতোও ছিল। গলায় বড় ধরনের কালো দাগ। বোঝা যায়, শিশুটিকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। লাশের সঙ্গে লেপটে থাকা কাপড়টিও পুলিশ তুলে নেয়। লাশ পাঠানো হয় মর্গে। কাপড়টি পুলিশ আলামত হিসেবে জব্দ করে।

আনিসের হত্যাকারী কে? এই প্রশ্নের জবাব বের করতে পুলিশ নামে তদন্তে। আনিসের পরিবারের পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না করায় পুলিশের সন্দেহের তালিকা দীর্ঘ হয়। কিন্তু হিমশিম খায় পুলিশ। আনিসের চাচি লাভলী বেগমের নামে পুলিশ উড়া কথা শুনলেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য পায় না। লাভলী বেগমকে আনিস মায়ের মতো দেখত। লাভলী বেগমও আনিসকে ভালোবাসতেন সন্তানের মতো। তবে লাভলী বেগমের সঙ্গে আনিসের চাচা সাইফুলের সম্পর্ক নেই দেড় বছর ধরে।

লাশের সঙ্গে লেপটে থাকা সেই কাপড়টি পরিষ্কার করার পর পুলিশ দেখতে পায় সেটি একটি মহিলার ওড়না। কোনোভাবেই যখন পুলিশ খুনের রহস্য বের করতে পারছিল না, পুলিশ তখন ওড়নাটিকেই তদন্তের সূত্র হিসেবে নিয়ে এগোতে থাকে। খুনি কে? এই প্রশ্ন থেকে সরে আসে পুলিশ। ওড়নাটি কার? এই প্রশ্নের জবাব উদ্ধারের চেষ্টা চালাতে থাকে। আনিসের পরিবারের কাছে সেই ওড়না সম্পর্কে জানতে চায় পুলিশ। কিন্তু ওড়নাটি তারা চেনে না বা তাদের কারও নয় বলে নিশ্চিত করে পুলিশকে। পুলিশ এবার যায়, আনিসের চাচি লাভলী বেগমের বাসায়। সেখানে লাভলী বেগমকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তবে পুলিশের দৃষ্টি ছিল ওই বাসার কাপড়-চোপড়ের দিকে। ওড়নার সঙ্গে ম্যাচিং কোনো কাপড় রয়েছে কিনা, তা দেখার চেষ্টা করে পুলিশ। হ্যাঁ, ওড়নার রং মিলে গেছে একটি সালোয়ার কামিজের সঙ্গে। পুলিশের সন্দেহ এবার চাচি লাভলী বেগমের ওপর। তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় সোজা থানায়। শুরু হয় জেরা। সারা রাত। মুখ খোলেন না লাভলী। পুলিশ এবার সেই ওড়নাটি লাভলী বেগমের চোখের সামনে তুলে ধরে। আঁতকে ওঠেন লাভলী। লাভলীর আঁতকে ওঠার দৃশ্য চোখ এড়ায় না পুলিশের। এবার তদন্তকারীরা নিশ্চিত মোটামুটি। ভোরে মুখ খুলতে শুরু করে। পুলিশের কাছে ফাঁস করতে থাকে খুনের ভয়ঙ্কর কাহিনী। কেন কীভাবে আনিসকে হত্যা করা হলো-কোনো কিছুই আর বাদ থাকে না পুলিশের জানতে। সব বলে দেয় পুলিশের কাছে।

পুলিশের কাছে লাভলী বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে শিশু আনিসের চাচা সাইফুলের সঙ্গে বিয়ে হয়। কিন্তু বনিবনা হয়নি। বছর তিনেক হলো বাপের বাড়িতে চলে আসি। কিন্তু গত বছর জানতে পারি, সাইফুল নাকি আরেকটা মেয়ে নিয়ে গেছে বাড়িতে। আমার ভাইদের কাছে বিষয়টা জানাই। সাইফুলকে ধরে নিয়ে আসে আমার ভাইয়েরা। মারধর করে। ওকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু সাইফুল সেই টাকা দূরের কথা, আমাকেও ঘরে তুলে নেয় না। জানতে পারি, ভাই-ভাতিজা ভাবী নিয়ে আনন্দে দিন কাটছে তার। আমার চরম জেদ হয়। ওই পরিবারের ক্ষতি করার চিন্তা করি। অবশেষে ভাবী, সাইফুলের বড় ভাই রতনের ছেলে আনিসকে খুন করে শিক্ষা দেব। সেদিন আমি রাস্তা থেকে তিলের খাজার কথা বলে আনিসকে বাসায় নিয়ে আসি। আমি ওকে কোলে নিয়ে ভাত খাওয়াই। কিন্তু ভাতের সঙ্গে আগে থেকেই ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে রাখি। ভাত খেয়েই ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে আনিস। এরই মধ্যে আনিসের খোঁজে চারদিকে হৈচৈ পড়ে। আনিসকে লুকিয়ে রাখি। সারা রাত ঘুমিয়ে থাকে আনিস। পরদিনও ঘুম ভাঙে না তার। এক পর্যায়ে ঘুমন্ত আনিসের পা চেপে ধরি। আমার মা আর ভাইয়ের বউ গলায় চেপে ধরে। এক পর্যায়ে আমার এক ভাই এসে আনিসের বুকে চরে বসে। আনিস নড়াচড়া করছিল বলে ওর মুখে সজোরে ঘুষি মারে আমার ভাই। এতে ওর দুটি দাত ভেঙে যায়। আনিসকে খুনের পর তাড়াহুড়া করে খাল পাড়ে নিয়ে যাই। লাশ দেখা যাচ্ছিল বলে আমি আমার পরনের ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে দিই। লাশ ফেলে আসি ডোবার পাড়ে।’ সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি