মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

মানবাধিকার হায় মানবাধিকার-প্রভাষ আমিন

প্রতি বছর ডিসেম্বরের একটি বিশেষ দিন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘ দিবসটি পালন করে আসছে।

দিবস পালন করা কতটুকু দরকার জানি না। তবে তার চেয়ে আরও বেশি দরকার বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার নিশ্চিত করা। মানবাধিকার মানে বিশ্বের প্রতিটি কোণে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের অধিকার বেশি, মার্কিন অভিবাসী বা মুসলমানদের অধিকার কম, আফ্রিকান কালো মানুষদের অধিকার কম, সংখ্যালঘুদের রোহিঙ্গাদের অধিকারই নেই; সার্বজনীন মানবাধিকারের ধারণায় এই বৈষম্য অনুমোদন করে না। সম্পদে বৈষম্য আছে, শিক্ষায় বৈষম্য আছে, ক্ষমতায় বৈষম্য আছে। কিন্তু মৌলিক মানবাধিকার প্রশ্নে কোনো বৈষম্য নেই, থাকা উচিত নয়। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন মানবাধিকারের ধারণায়ও দারুণ বৈষম্য ঢুকে গেছে। মানবাধিকারের ধারণার সঙ্গে মিশে গেছে ধর্ম-বর্ণ-জাতি, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ নানা বিবেচনা। অথচ একজন মানুষকে শুধু একজন মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করার কথা ছিল, উচিত ছিল।মানবাধিকার দিবস আসে, বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজনে পালিত হয়, চলেও যায়। কিন্তু মানবের অধিকার রক্ষিত হয় না। মিয়ানমারের আরাকানে বছরের পর বছর ধরে সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূল বা দেশছাড়া করার অভিযান চলছে। বিশেষ করে গত ৯ অক্টোবর থেকে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলছে, গোটা বিশ্ব যেন চোখ বুজে আছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আরাকান গিয়েও কিছু দেখতে পাননি। তিনি দাবি করেছেন, সেখানে গণহত্যা হচ্ছে না। মাননীয় কফি আনান, গণহত্যার সংজ্ঞাটা কি একটু বুঝিয়ে বলবেন? নাকি সংজ্ঞাটা বদলে গেছে? মিয়ানমার সেনাবাহিনী শুধু খুন-অত্যাচার-নির্যাতন-ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; সেখানে কোনো সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীকেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বাধায় সেখানে ত্রাণও পৌঁছানো যাচ্ছে না। অভিযোগ করেই কি দায়িত্ব শেষ জাতিসংঘের? জাতিসংঘ কেন সবাইকে নিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না? কেন শুধু বাংলাদেশের কাছে মানবতা আশা করা হচ্ছে? কেন মিয়ানমারকে মানবিক হওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে না? আরাকানে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কি জাতিসংঘের নয়? মিয়ানমার কি পৃথিবীর বাইরের দেশ? রোহিঙ্গারা কি অন্য গ্রহ থেকে এসেছে? জাতিসংঘ অং সান সু চিকে পরামর্শ দিয়েছে, আরাকানে গিয়ে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে। কিন্তু অং সান সু চি অনেক আগে প্রমাণ করেছেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে চোখে ঢুলি পরে আছেন। তাই সেখানে গেলেও কফি আনানের মতো অং সান সু চিও কিছুই দেখতে পাবেন না। প্রসঙ্গটা যখন মানবাধিকারের; তখন আসলে অন্য কোনো বিবেচনা এখানে আসারই কথা নয়। মানবাধিকারের সঙ্গে অন্যকিছুর বিনিময় করা যাবে না। যেমন বাংলাদেশে উন্নয়ন চলছে দারুণ গতিতে। উন্নয়ন প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল। অর্থনৈতিক-সামাজিক সব সূচকেই বাংলাদেশের অগ্রগতি বিস্ময়কর। কিন্তু প্রশ্নটা যখন মানবাধিকারের, তখন লজ্জায় আমাদের মুখ লুকাতে ইচ্ছা করে। সংখ্যালঘু হিন্দু বা সাঁওতালরা আজ নিরাপত্তাহীনতার বোধে আক্রান্ত। বাপ-দাদার ভিটা আজ তাদের জন্য নিরাপদ নয়। ক্রসফায়ারের নামে বিচার ছাড়াই মানুষ খুন এখন ডালভাত। ক্রসফায়ার এখন আর মানবাধিকার কর্মীদের আন্দোলিত করে না। তবে যখন র‌্যাব বা পুলিশের বন্দুকের নল ঘুরে যায়, যখন মরে যায় ছাত্রলীগ বা যুবলীগের কেউ, তখন সরকারি দলে দারুণ তোলপাড় হয়। কিন্তু ক্রসফায়ারের নামে খুন বন্ধ হয় না, খুনের দায়ে কেউ সাজা পায় না। ক্রসফায়ার নিয়ে হৈচৈ বেশি হলে বেড়ে যায় গুমের প্রবণতা। এখন ক্রসফায়ার-গুম দুটিই সমানতালে চলছে।

ক্রসফায়ার একটু ঝামেলার। খুন করার পর আবার মিথ্যা কথাও বলতে হয়। মিথ্যা গল্প লিখে একটা প্রেস রিলিজ পাঠাতে হয়। কিন্তু গুম খুব সহজ। শুধু বললেই হয়, আমরা কিছু জানি না। ব্যস, দায়িত্ব শেষ। গত ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হওয়া ২০ ব্যক্তির পরিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। সেদিনই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘গুম বলে কোনো শব্দ নেই। গুম বলে আমাদের কোনো কিছু জানা নেই। যারা গুম রয়েছেন বলে অভিযোগ হচ্ছে, তারা বিভিন্ন কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন। আমরা অতীতে দেখছি তাদের অনেকেই ফিরে এসেছেন। ’ বাহ! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলে দিলেন, গুম বলে কোনো শব্দ নেই। তাহলে আর কারও কিছু করার নেই। বাংলাদেশে এখন দুই ধরনের নিখোঁজের ঘটনা ঘটছে। কিছু তরুণ পরিবারের কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকদিন পর তারা আবির্ভূত হয় ভয়ঙ্কর জঙ্গি হিসেবে। হলি আর্টিজানের পর এখন কোনো তরুণ হারিয়ে গেছে শুনলেই আমরা ভয় পাই। আরেক ধরনের নিখোঁজ হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে রাস্তা থেকে, বাসা থেকে, স্বজনদের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া। এদের কারও লাশ পাওয়া যায়, কেউ ফিরে আসে, কাউকে পাওয়া যায় ভারতে, কাউকে হুট করে র‌্যাব গ্রেফতার দেখায়, কাউকে কাউকে পাওয়া যায় কোনো জঙ্গি আস্তানায়। তবে বেশির ভাগেরই কোনো খোঁজ মেলে না। তারা হারিয়ে যায় একেবারেই।

এখন আসলে স্বজনদের কাছে অপশন দেওয়া দরকার, তারা ক্রসফায়ার চায় না গুম চায়। আমার বিবেচনায় ক্রসফায়ার ভালো। মরে গেল, লাশ পাওয়া গেল, কবর দেওয়া হলো, কয়েকদিন কান্নাকাটি করে শেষ। কিন্তু গুম মানে অনন্ত অপেক্ষা। স্বজনদের স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষ কখনো মরে না। চিরতরে গুম হয়ে যাওয়া মানে তার কোনো মৃত্যুবার্ষিকী নেই, কোনো কবর নেই। শোকেরও নেই শেষ।

আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা বিশ্বাস করছি। আসলে তাদের কেউ তুলে নেয়নি, তারা নিজেরাই আত্মগোপনে আছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেয়নি বা নিজেরাই আত্মগোপনে আছে; এটুকু বললে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেন হঠাৎ করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, কেন তারা আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে; এর কারণ অনুসন্ধান করা, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খুঁজে বের করাও তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরই কাজ। দেশে সব মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরই দায়িত্ব। জঙ্গি দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানে আমরা অনেকটাই আশ্বস্ত। কিন্তু সম্প্রতি ৯ তরুণের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া আমাদের আবার শঙ্কিত করে। তারা গোপনে গোপনে আবার কোনো ভয়ঙ্কর কিছুর ছক আঁকছে না তো?

ভিন্নমতের মানুষদের তুলে নিয়ে যাওয়া বা হুটহাট হারিয়ে যাওয়া বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় আত্মগোপনে যাওয়াও আমাদের শঙ্কিত করে। ভিন্নমত তো অপরাধ নয়। কেউ যদি অপরাধ করে, প্রচলিত আইনে তার সাজা হবে। কিন্তু যুবলীগ হোক আর যুবদল, ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল, পক্ষের বা বিপক্ষের সবার অধিকার আছে ন্যায়বিচার পাওয়ার, আইনের প্রোটেকশন পাওয়ার। ক্রসফায়ার বা গুম কখনোই কোনো সমাধান নয়। আমি ক্রসফায়ার বা গুমকে বিবেচনা করি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূচক হিসেবে। ক্রসফায়ার-গুম বেড়ে যাওয়া মানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়া। এই যখন বাংলাদেশের, মিয়ানমারের অবস্থা; তখন আমরা বড় গলায় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার দিবস পালন করি। হয় হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব, সবল-দুর্বল, সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হোক; নইলে নিশ্চিত করতে না পারা পর্যন্ত মানবাধিকার দিবস পালন স্থগিত রাখা হোক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবাধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে মানবাধিকার দিবস পালন হাস্যকর মনে হয়।

লেখক : সাংবাদিক।

[email protected]




Add Comment

Click here to post a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.