আন্তর্জাতিক

মসজিদ আল-আকসা বা হারাম আল-শরিফ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

১. মসজিদ কমপ্লেক্সের গুরুত্ব : রুপার গম্বুজ শোভিত আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সটি ৩৫ একর জমির ওপর নির্মিত। আল-আকসাকে হারাম আল-শরিফ বলে উল্লেখ করা হয়। এটি মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। ইহুদিরা একে টেম্পল মাউন্ট বলে থাকে। জেরুসালেম কমপ্লেক্সটি জেরুসালেমের প্রাচীন নগরীতে অবস্থিত। জাতিসঙ্ঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো একে বিশ্বের ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।

ইব্রাহিম আ:-এর থেকে আসা তিনটি ধর্মের কাছেই এই মসজিদ অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালে ইসরাইল পশ্চিমতীর ও গাজা উপত্যাকাসহ পুরনো শহর পূর্ব জেরুসালেম দখল করার পর পূর্ব জেরুসালেম ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ একখণ্ড জমি হচ্ছে এই মসজিদ কমপ্লেক্স। অবশ্য ইসরাইল সৃষ্টির বহু আগ থেকেই জেরুসালেম নিয়ে সঙ্ঘাত চলছে।

ব্রিটিশের দখলে থাকার সময় ১৯৪৭ সালে ঐতিহাসিক ভূখণ্ড ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করে জাতিসঙ্ঘ। এর একাংশে প্রধানত ইউরোপ থেকে আমদানি করা ইহুদিদের দেয়া হয় এবং অন্য ছোট অংশ সেখানকার আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের দেয়া হয়। ইসরাইলকে দেয়া হয় ফিলিস্তিনের ৫৫ শতাংশ এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভাগে রাখা হয় ৪৫ শতাংশ। আর আল-আকসা মসজিদের নগরী জেরুসালেমকে জাতিসঙ্ঘের প্রশাসনাধীনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য রাখা হয়। হজরত ইব্রাহিম আ:-এর বংশধরদের তিনটি ধর্মের মানুষের জন্য এ নগরীকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়।

১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইল ফিলিস্তিনের ৭৮ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয়। পশ্চিমতীর, পূর্ব জেরুসালেম ও গাজার বাকি এলাকা মিসর ও জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল তার দখল আরো সম্প্রসারিত করে। ইসরাইল এ যুদ্ধে আল-আকসা মসজিদ ও ওল্ড সিটিসহ পূর্ব জেরুসালেম দখল ও পরে একীভূত করে নেয়। ওল্ড সিটিসহ পূর্ব জেরুসালেমের ওপর ইসরাইলের অবৈধ দখল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এতে বলা হয়েছে, অধিকৃত এলাকায় দখলদার শক্তির কোনো সার্বভৌমত্ব থাকতে পারে না।

জেরুসালেমের মালিকানা এবং ভৌগোলিক ও জনসংখ্যা তাত্ত্বিক অবস্থার পরিবর্তনে ইসরাইলের অপচেষ্টাকে বিশ্বের কোনো দেশ এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। প্রায় চার লাখ ফিলিস্তিনির জেরুসালেমে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা রয়েছে তারা সেখানে জন্ম নিলেও তাদের নাগরিকত্ব নেই। অথচ ইহুদিদের ক্ষেত্রে এর উল্টো নিয়ম। ১৯৬৭ সাল থেকে নানা শর্ত ও অজুহাত জুড়ে দিয়ে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের জেরুসালেম ছাড়া করে।

ইসরাইল নগরীতে ১২টি সুরক্ষিত ইহুদি বসতি গড়ে তুলেছে। তাতে ২ লাখ ইহুদি বসবাস করে। অন্য দিকে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর নির্মাণের কোনো অনুমতি দেয় না এবং অবৈধভাবে তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করছে।

২. কম্পাউন্ডের ধর্মীয় গুরুত্ব : এখানে অবস্থিত মুসলিমদের কাছে তৃতীয় পবিত্রতম স্থাপনা অর্থাৎ মসজিদুল আকসা। তা ছাড়া এখানেই রয়েছে কুববাতুস সাখরা মসজিদ, যেখান থেকে মহানবী সা:-এর মিরাজ বা ঊর্ধ্বাকাশে গমন শুরু হয়েছিল। ইহুদিরা মনে করে, এই কম্পাউণ্ডে ছিল বাইবেলে উল্লিখিত ইহুদিদের উপাসনালয়। তবে ইহুদি আইন অনুযায়ী এখানে কারো যাওয়া ও প্রার্থনা করা নিষেধ।

কম্পাউন্ডের পশ্চিম দেয়ালটি ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী ক্রন্দন প্রাচীর, যা বাইবেলে উল্লিখিত দ্বিতীয় উপাসনালয়ের শেষ চিহ্ন; কিন্তু মুসলিমদের মতে এই পাথরের গায়ে বাঁধা হয়েছিল মহানবী সা:-এর মিরাজের বাহন বোরাক।

৩. বিদ্যমান পরিস্থিতি : ১৯৬৭ সালে জর্ডান ও ইসরাইল এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরের সব কিছু দেখভাল করবে ওয়াক্ফ বা ইসলামি ট্রাস্ট। আর ইসরাইল এটির বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। অমুসলিমরা শুধু পরিদর্শনে যেতে পারবেন। তবে সেখানে প্রার্থনা করতে পারবেন না। প্রার্থনা করার অনুমতি কেবল মুসলিমদের।

৪. সাম্প্রতিক উত্তেজনা : দুই বছর ধরে আল-আকসা মসজিদের কাছে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ২০১৫ সালে শতাধিক ইহুদি তাদের একটি ছুটির দিন পালনের জন্য মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রবেশের চেষ্টা করলে এই উত্তেজনা শুরু হয়। এর এক বছর পর রমজান মাসের শেষ দশ দিনের এক দিনে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা নিয়ম ভেঙে মসজিদে প্রবেশের চেষ্টা করলে এই উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। বেশির ভাগ উত্তেজনার কারণ মসজিদ কম্পাউন্ডে ইহুদিদের প্রার্থনা করার চেষ্টা থেকে, যা ১৯৬৭ সালের চুক্তির খেলাফ।

৫. বৃহত্তর ইস্যু : আল-আকসা মসজিদ ফিলিস্তিনের ছোট্ট একটি অংশ; কিন্তু এটি ইসরাইল-ফিলিস্তিন বিরোধের প্রতীক। মসজিদ মুসলমানদের কাছে অতি পবিত্র স্থান এবং বিশেষ করে আল-আকসা মসজিদ। এমনকি আল-আকসার পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার ইহুদি তৎপরতার বিরুদ্ধে সেখানকার খ্রিষ্টানরাও প্রতিবাদ জানায়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই স্থাপনার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাকে মুসলিমরা তাদের প্রতি ইসরাইল সরকারের অব্যাহত অবিচার ও নিপীড়নের প্রতীক বলে বিবেচনা করেন।