মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার লাইফ স্টাইল

‘মধ্যরাতের প্রেমিকদের’ থেকে সাবধান

প্রতীকী ছবি

গসিপ ডেস্ক : মোবাইলে নোটিফিকেশনের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো নীরার। এত রাতে কে? বিরক্তি নিয়ে ফোনটা দেখলো ও। ম্যাসেঞ্জারে ওর এক পুরুষ সহকর্মীর লেখা, কেমন আছেন নীরা? এতো রাতে অনলাইনে? মন ভালো নেই, খুব মনে পড়লো আপনার কথা! ম্যাসেজ পড়ে মেজাজ খারাপ হলো নীরার। রাত ২টার সময় এ ম্যাসেজ! প্রথমে ভাবলো, উত্তর দিবে না। পরে ভাবলো এ অসভ্য আচরণ প্রথমেই বন্ধ করতে হবে। লিখলো, আপনার পাশে ভাবী আছে না? তাকে দিন। কথা বলি। তাকে বলি, আপনার মন ভালো নেই, মন ভালো করে দিক। ভদ্রলোক দ্রুত ফোন রেখে দিলেন।

বর্ষা একা থাকে। এক বছর হলো বরের সাথে তার সেপারেশন। ও জানালো, প্রায় রাতে তাকে নক করে কিছু বন্ধু, কিছু কলিগ। ও হাসতে হাসতে বলে, জানেন এদের সবার ফেসবুক প্রোফাইলে কিন্তু বউ বাচ্চার সাথে হাসিমুখের ছবি। একেবারে যাকে বলে সুখী পরিবার। দেখলে মনে হবে এদের চেয়ে জগতে সুখী আর কেউ নেই। দিনের বেলা অফিসে কী ভালোমানুষি চেহারা তাদের! অথচ মধ্যরাতে তারা অন্য ভূমিকায় নেমে আসে। আমি যেহেতু একা থাকি, এজন্য আমাকে নক করে বেশি। এদের প্রত্যেকের মুখোশ যদি পরিবারের কাছে উন্মোচন করে দেয়া যায়, সংসারে টিকতে পারবেন তারা? ক্ষুব্ধ প্রশ্ন তার।

সুপ্রিয় পাঠক, নীরা, বর্ষার মতো এরকম অভিজ্ঞতা প্রায় নারীদেরই হয়। একটু রাত পর্যন্ত অনলাইনে থাকলেই বিভিন্ন পুরুষেরা নক করে তাদের। কেমন আছেন? এত রাতে জেগে কেন? শরীর খারাপ করবে! মিস ইউ, স্ত্রী বোঝে না, স্ত্রী স্মার্ট না, আপনার মতো কাউকে দেখিনি ইত্যাদি নানা কথা, নানা বাণী, কবিতাসহ নানা উপদেশ-পরামর্শ দিতে থাকে তারা। এসব লেখায় বা যোগাযোগে অনেক নারীই বিব্রত হোন। হোন বিরক্ত। অনেক সময় পরিচিত সিনিয়র লোকেরা এমন কুরুচিপূর্ণ লেখা লেখেন যে, অনেকেই তা পড়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক বলেন, জানেন এ বিষয় নিয়ে একদিন কথা বলতে গেলে এক পুরুষ সহকর্মী ধমকে ওঠেন। এতো আধুনিকতার কথা বলেন, আর রাতে কথা বলতে চাইলে তখন পুরনো সংস্কারে চলে যান। কী হয় কথা বললে? তাকে সমর্থন জানান অন্যরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি সারারাত অনলাইনে থাকবো। আমি অনলাইনে থাকলেই আমাকে নক করতে হবে কেন? আমি তো পরামর্শ চাইনি তাদের। এতো কেন পুরুষদের মাথাব্যথা? মাঝে মাঝে মনে হয় ম্যাসেঞ্জার বন্ধ করে দেই। পরে মনে হয় একটা খারাপ মানুষের জন্য আমি কেন ফেসবুক বন্ধ করবো!

ফেসবুকে অনেক ছেলের সস্তা আচরণ, কুরুচিপূর্ণ লেখা দেখলে, পড়লে অসুস্থ হয়ে যাই বললেন অ্যাডভোকেট নীরা তাবাসসুম। তার মতে, ফেসবুকে সবার কিছু নীতিমালা মেনে চলা দরকার। কোনটা শোভন, কোনটা অশোভন তা বোঝা দরকার। তিনি বলেন, কোনো কোনো ছেলে শুধু মেয়েদের প্রোফাইল দেখে বেড়ায়। এটা এক ধরনের যৌন নির্যাতন। চিনি না, জানি না, অনেকে ফেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। কতগুলো যে ফেক আইডি তা দেখলেই বোঝাই যায়। কী উদ্ভট তাদের নাম!

ব্যাংকার নাসরিন বলেন, বিবাহিত পুরুষেরা বেশি বিরক্ত করে মধ্যরাতে। এমন এমন চেনা সব মানুষ, অবাক হতে হয়। রাত হলে এরা যেন শ্বাপদের ভূমিকায় নেমে আসে। এতো রাতে কোনো মানুষকে যে নক করতে হয় না, অন্যেরা বিরক্ত হতে পারে এ সিভিক সেন্সটুকু অনেকের নেই। এদের বউদের জন্য দু:খ হয়্। কাকে ভালোবেসে জীবন পার করছেন তারা? বউরা জানতে পারলে এক ঘন্টায় একটা নয়, ২০ টা করে ডিভোর্স হতো প্রতিদিন, বলেন তিনি। তিনি দু:খ করে বলেন, এর ফলে মানুষের প্রতি দিন দিন শ্রদ্ধা,  সম্মানবোধ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

গৃহিনী রোখসানা আলম (ছদ্মনাম) বলেন, রাতে মেয়ে পড়ছে। আমি আর আমার বর ফেসবুক দেখছি। এমন সময় একজন ম্যাসেঞ্জারে লিখলো, এতো রাতে জেগে কেন? আমি তাকে বলতে পারতাম, আপনি নিজে জেগে থেকে এ প্রশ্ন করছেন কেন? এরপরে লিখলো, তোমার সাহেব কি জানে তুমি ফেসবুকে? আমি কি লিখবো, আপনার বউ জানে আপনি আমাকে লিখছেন? রোখসানা বলেন, আমি আর কথা বাড়ালাম না। এসব বিরক্তিকর প্রশ্নের উত্তর দিলেই কথা বাড়তে থাকে। তার মতে, ফেসবুকে পুরুষ কবি’র সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ম্যাসেঞ্জারে অনেকে আবার কবিতা লিখে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, আমার নিজের প্রয়োজনে অনলাইন সবসময় চালু থাকতেই পারে। সবসময় বসবো কী বসবো না, তা আমার ইচ্ছে। এখানে আমাকে তো প্রভাবিত করা উচিত না।

স্বাস্থ্য নিয়ে বেসরকারি সংস্থায় কাজ করা ফারজানা রহমানের মতে, রাত ১০টার পরে আসলে খুব ঘনিষ্ঠ ছাড়া কাউকে ম্যাসেঞ্জার, ভাইবারে নক করা উচিত না। কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যাদের কোনো কাজ নাই, তারা মনে করে যেকোনো সময় যেকোনো মেয়েকে নক করা যায়। দেখি না যদি সাড়া দেয়! তিনি বলেন, মাঝে মাঝে নেট বন্ধ করতে ভুলে যাই। তখন যার সাথে আমার তেমন ঘনিষ্ঠ সর্ম্পক না, তেমন লোকেরাও নক করেন।

ব্যক্তিজীবনে অসুখী মানুষেরা সাধারণত ফেসবুকে সুবিধা নিতে যায়। তারা প্রোফাইলে সুন্দর সুন্দর ছবি দিয়ে বোঝায় সে হ্যাপি। এতে বিভ্রান্ত হয় অনেক মেয়ে। তারা সুন্দর সুন্দর কথায় ভুলে যায়। সে বোঝে না সে ফাঁদে পড়ছে। তখনই অনাকাংখিত ঘটনা ঘটে। এসব সুযোগ সন্ধানী পুরুষেরা রাতে যে টোনে কথা বলে, সকালে সুর একদম পালটিয়ে ফেলে। ফারজানার মতে, অনেক ধরনের মুখোশ থাকে ফেসবুকে। তাই এখানে সর্ম্পকের একটা সীমারেখা টানা দরকার। বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক থাকা দরকার। না চিনলে বন্ধু হিসেবে এ্যাড করা উচিত না।

তবে শুধু পুরষরা নয়, অনেক নারীও উত্যক্ত করে বললেন সরকারি কলেজের শিক্ষক মেহজাবীন। তিনি জানান, তার বর ডাক্তার। তাকে প্রচুর রোগী দেখতে হয়। কথা বলতে হয় নানা মানুষের সাথে। দেখা গেল কোনো রোগী দেখেছে, তার সাথে আসা আত্মীয় পরে ম্যাসেঞ্জারে প্রথমে ভাই, পরে ডারলিং বলে নানা কথা লেখে। ইনিয়ে বিনিয়ে ভালবাসার কথা বলে। তিনি বলেন, কলেজেও দেখি অনেক ছাত্রী নাম্বার বেশি পাওয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। রাতে ভিডিও কলও করে অনেকে। সুযোগ সন্ধানী অনেক শিক্ষক এ সুযোগগুলোকে কাজে লাগান। এদের থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।

অনাকাংখিত আচরণ নিয়ে মনোবিজ্ঞানী জেবিন নাহার বলেন, ম্যাসেঞ্জারে, টুইটার, ভাইবার বা হোয়াটসআপে কুরুচিপূর্ণ নানা ধরনের লেখা বা বলা কিন্তু এক ধরনের ইভটিজিং। এটা করা উচিত না। তারপরেও কিছু মানুষ উত্যক্ত করছে। তারা অন্যকে বিরক্ত করে একধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। সে বোঝে না সে সেক্সচুয়ালি একজনকে হ্যারেস করছে। এটা পার্সোনালটি ডিজঅর্ডার থেকে আসে। যারা এ ধরনের আচরণ করেন, তাদের বলা হয় সাইকো সেক্সচুয়াল ডিসফাংশন। এই আচরণগত সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য তাদের কাউন্সিলিং দরকার। নইলে একসময় তা ভয়াবহ রুপ নিবে।

তিনি এধরনের আচরণগত সমস্যা সমাধানে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নারীদের প্রতিরোধ করার আহবান জানান।
ব্যারিস্টার তানজীব-উল-আলম জানান, ইলেকট্রনিক মাধ্যম বা ফেসবুকে যদি কোনো ব্যক্তি উত্যক্ত করে, তবে তার বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হতে পারে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে পেনাল কোর্টে যাওয়া যেতে পারে। এখানে সাজা হতে পারে তিন মাস। এছাড়াও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করলে তার সর্বোচ্চ ১৪ বছর এবং কমপক্ষে ৭ বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।

সাইবার ক্রাইম এ্যান্ড এনালাইসিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জেনিফার আলম বলেন, কেউ ম্যাসেঞ্জার বা ফেসবুকে বিরক্ত করলে প্রথমে থানায় জিডি করতে হবে। জিডির পর তারা বিনামূল্যে এর বিচার কাজে সহায়তা করে থাকেন। এছাড়া যে কোনো সময় ৯৯৯ নাম্বারে ফোন দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি। তিনি সাইবার ক্রাইম থেকে নিজের একাউন্ট সেফ রাখতে প্রাইভেসি সেটিং করে রাখার পরামর্শ দেন।

ঢাকা মহানগরের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আলিমুজ্জামান জানান, তাদের বিভাগে ২০১৬ সালে সাইবার ক্রাইম নিয়ে ১৬টি অভিযোগ আসে। ২০১৭ সালে আসে ৫৬৬টি। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মাস পর্যন্ত অভিযোগ এসেছে ১১৮০টি। তিনি বলেন, সাধারণত ৩৫ বছরের মধ্যে নারীরা এর শিকার হোন বেশি। তিনি জানান, অপরাধীরা প্রথমে প্রোফাইলের ছবি দেখে তাকে টার্গেট করে। এরপর আস্তে আস্তে তার ছবি ও তথ্য হ্যাক করে নানা জটিলতায় ফেলে। অনেকে জানতেও পারেন না তার প্রোফাইল পিকচার ব্যবহার করা হচ্ছে অন্য জায়গায়। ফেক আইডিগুলো সাধারণত এভাবে করা হয় বলে জানান। তিনি ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, হোয়াটসআপ, ভাইবার, ইমোর নিরাপত্তায় পাসওয়ার্ড সহজ না করে নানা কম্বিনেশনে দেয়ার পরামর্শ দেন।

সুপ্রিয় পাঠক, তাই আর দেরি না করে মধ্যরাতে বা যে কোনো সময়ে ভারচুয়ালি কেউ উত্যক্ত বা বিরক্ত করলে নীরব না থেকে প্রতিবাদী হোন। নিন আইনের আশ্রয়। আপনার সাহসী উদ্যোগ অন্যদেরও সচেতন ও প্রতিবাদী হওয়ার পথ দেখাবে।

মূল লেখক : আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

জুমবাংলানিউজ/এসএস