জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা-সঞ্জয় কাঠুরিয়া

সংযোগ থেকেই শুরু করা যাক। ১৯৪৭ সালের পর উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশটির বাকি অংশের যোগাযোগের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা পথটি ছিল শিলিগুড়ির নিকটবর্তী ‘চিকেনস নেক’, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
উদাহরণ টেনে বলা যায়, কোনো একটা বন্দরে পৌঁছতে ব্যবসায়ীদের এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরার আগরতলা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় যেতে হতো। সেখানে মাত্র ৬০০ কিলোমিটারেরও কম পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ হয়ে একই মঞ্জিলে পৌঁছনো সম্ভব। এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থাও আছে। মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরেই পাওয়া যেতে পারে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর।

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের (এর মধ্যে রয়েছে চলমান উত্তর-পূর্ব ভারত পর্যন্ত ভারতীয় পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের আশুগঞ্জ বন্দর দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিবিআইএন—বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের গাড়ি চুক্তি) ভিত্তিতে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাকি দেশের যোগাযোগের খরচ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। এর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য ও সেবার দাম কমবে, যা ক্রেতাসাধারণের স্বার্থ ও দারিদ্র্য নিরসনে শক্তিশালী প্রভাব রাখতে পারে। এ ধরনের সহযোগিতা ভারতের মিয়ানমার হয়ে আসিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের বেশ কিছু বাড়তি সম্ভাবনার পথও খুলে দিতে পারে। যেমন মিজোরাম ও মণিপুর—বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংযোগ হিসেবে কাজ করতে পারে।
ভাবুন, থাইল্যান্ড থেকে সড়কপথে অন্ধ্র প্রদেশের হায়দরাবাদে ওষুধ আসবে বাংলাদেশ, মণিপুর ও মিয়ানমার হয়ে।

ডিজিটাল সংযোগও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য ১০ জিবিপিএস ব্রডব্যান্ড সংযোগ আসছে বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে। এর চেয়েও বেশি গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের।

বাণিজ্য সম্পর্কও জোরদার হচ্ছে। ২০০২ সালে এর পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি ডলার। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০০ কোটি ডলারে। ২০১১ সাল থেকে সব বাংলাদেশি পণ্যকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে ভারত। বাংলাদেশ থেকে ভারতের আমদানি ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। যদিও বাকি বিশ্ব থেকে আমদানি কমেছে বছরে ৮ শতাংশ হারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য আয়তন ও অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশই সম্ভাব্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। যদিও উত্তর-পূর্ব ভারত (এনইআই) ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাবনা কাজে লাগানো শুরু হয়েছে সম্প্রতি। যেমন কৃষিপণ্য, উত্তর-পূর্ব ভারত এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তারা বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজারও তৈরি করা সম্ভব।

বিনিয়োগ আরেকটি ক্ষেত্র। যেখানে খুব একটা হাত দেওয়া হয়নি। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী ভারত। বাংলাদেশে বিশেষায়িত ‘ভারতীয় অর্থনৈতিক জোন’ও রয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশি কম্পানিগুলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিনিয়োগ করতে পারে।

জ্বালানি সহযোগিতা ফল দিতে শুরু করেছে। ভারত এরই মধ্যে বাংলাদেশে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে (এর মধ্যে ১০০ মেগাওয়াট যাচ্ছে ত্রিপুরা থেকে)। আরো অনেক কিছুই প্রক্রিয়াধীন। ভবিষ্যতে জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে ভুটান ও নেপালের জলবিদ্যুৎও যুক্ত হতে পারে। বিবিআইএন গঠনের মধ্য দিয়ে এই বিদ্যুতের বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। সহযোগিতা গভীরতর করতে পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহও সম্ভব।

ভারত-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনা উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতি পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে তা ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট ভিশনকেও এগিয়ে নেবে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই সরাসরি সংযোগকে আরো বিস্তৃত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশকেও ভারত হয়ে নেপাল ও ভুটানে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। ফলে এদের মধ্যে সময় ও বাণিজ্যের খরচ কমবে।

চূড়ান্তভাবে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ধারাবাহিক ও ক্রমবর্ধমান গতি আরো সংহত দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করবে।

লেখক : বিশ্বব্যাংকের ট্রেড অ্যান্ড কম্পিটেটিভ গ্লোবাল প্র্যাকটিস বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ও সমন্বয়ক

সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ