ক্যাম্পাস জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার শিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালগুলোর আবাসিক হলে ছাত্রলীগ নেত্রীদের বর্বরতার সারসংক্ষেপ!

Universityঅনিমেষ চৌহান: ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হল। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে পদ পাওয়া দুজন নেত্রীই এই হলে থাকেন। একজন তৃতীয় তলায়, আরেকজন চতুর্থ তলায়। এই দুটো তলার বেশিরভাগ রুম তাদের দখলে এবং এক একেকটা রুম গোয়াল ঘরের মত। একটা রুমে চারটা সিটে আটজন করে থাকে। যারা রাজনীতি তে সম্পৃক্ত নয় কিন্তু মেধার মাধ্যমে সিট পেয়ে আছে তাদেরকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। আর আমরা যারা অন্য কোন উপায় না পেয়ে শুধু সিটের জন্য রাজনীতির সাথে যুক্ত, তাদের অবস্থা হচ্ছে কিছুটা এ রকম-মুখ আছে কিন্তু আওয়াজ করা যাবে না। চোখ থাকবে কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করতে হবে। তাদের অস্তিত্ব থেকেও থাকবে না। তারা মানুষ কিন্তু হৃদয়হীন, প্রাণ থাকতেও তারা প্রাণহীন!’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ভিত্তিক একটি পেজে এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরেন শম্পা (ছদ্মনাম)। শুধু চবি নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেত্রীদের দাপটের কাছে অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অসহায় মেয়েদের ওপর তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছু চিত্র পাঠকেদের জন্য তুলে ধরা হল।

চবিতে রাতগুলো কাটে আত্মচিৎকারে:
চবির শম্পা আরো লিখেছেন, চবির ছাত্রী হলে নিয়মিত চলে নির্যাতন। তা নিয়ে লেখার বা বলার মত অনেক কিছুই আছে। প্রয়োজনে তাগিদে লিখতে বসলাম। অনেক দিন ধরেই চোখের সামনে অনেক আপত্তিকর বিষয় দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই বলে চুপ ছিলাম। আছি কিন্তু আগামীতে চুপ থাকব কিনা বলতে পারছি না। অনেক মেয়ের আত্মচিৎকারের মাঝে আজ নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে। সারাদিন পড়াশোনা, টিউশন করে মেয়েরা রাতের বেলা একটু শান্তিতে ঘুমানোর জন্য যখন রুমে আসে, তখন তারা মানসিক নির্যাতনের জন্য ঘুমাতে পারে না। তাদের রাতগুলো কাটে আত্মচিৎকারের মধ্য দিয়ে। সেই চিৎকার সবার কানে পৌঁছায় না।

জাবিতে দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে রূমে দৈর্ঘ-প্রস্থ্য মাপতে হয়:
জাবির জাহানারা ইমাম হলের নৃবিজ্ঞান বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র ছাত্রী ছাত্রলীগ নেত্রী সূচি। গাঁজা সম্রাজ্ঞী নামে সমধিক পরিচিত (তার গাঁজা সেবন ও হলে রুমের সামনে টবে গাঁজা চাষের বিষয়টি ক্যাম্পাসের প্রায় সকলেরই জানা)। হলের নামাজরুমে অবস্থানরত ( উল্লেখ্য সিট সংকটের কারণে নামাজরুমে থাকতে হতো) একজন নবাগত ছাত্রী লোপাকে (ছদ্মনাম) তার রুমে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে সূচির সাথে আরো তিনজন সিনিয়র ছাত্রী যোগ দেয়। উত্তরবঙ্গের অজো পাড়া গাঁ থেকে আসা লোপাকে সূচির রুমে নিয়েই কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সূচি গাঁজা সম্বলিত একটি সিগারেট ধরায়। ঘটনার আকস্মিকতায় লোপা একেবারে থতমত খেয়ে যায়।

এরপর লুপাকে বলা হয় আপুরা যা বলবে তাই করতে হবে, তা নাহলে তোমার (লোপার) ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে। আর এটাই নাকি জাবির নিয়ম। লোপাকে সিগারেট খেতে বললে সে অপারগতা প্রকাশ করে। এরপর লোপাকে একটি ম্যাচের কাঠি দিয়ে সূচির রুমের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাপতে দিয়ে তারা গাঁজা সেবন ও ড্রিংকস্ করতে থাকে। এরপর শুরু হয় আসল পর্ব। লোপাকে জোর করে স্বীকার করানো চেষ্টা করা হয় সে এ পর্যন্ত কতজনের সাথে সেক্স করেছে? কি কি খারাপ অভ্যাস রয়েছে? আর এসব প্রশ্ন করা হয় চরম অকথ্য ও নোংরা ভাষায়। তারা এসব প্রশ্নের স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বলে তারা সবাই এসব করেছে , সে কেন করেনি? সূচি ও সঙ্গীরা লোপাকে প্রায় বিবস্র করে জোরপূর্বক। লোপার দেহের গঠন নিয়ে অত্যন্ত অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য করে। লুপাকে তাদের সামনেই চরম বিকৃত কাজের জন্য চাপ দেওয়া হয়। চলে বর্ণনাতীত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এরপর সূচি তার সঙ্গীর সাথে বিকৃত কাজ করে লোপাকে শিখানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তৎক্ষণে লোপা জ্ঞান হারায়। পরে লোপা বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়লেও এ রকম চরম বিকৃত-ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে কেউ কেউ জাবিতে পড়াশোনার ইতি টেনে চলে যায়। ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ নামে একটি ওয়েবসাইটে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হওয়ার কথা লেখেন লোপা।

ঢাবির হলগুলো যেন একেকটা ভয়ের দোকান:
মধ্যরাতে ছাত্রীর রগ কাটার অভিযোগে ছাত্রলীগ নেত্রী ইফফাত জাহান এশাকে বহিষ্কার করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এশা কান্ড পরপরই ঢাবির মেয়েদের হলগুলোতে বহুমাত্রিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। হলে থাকা মেয়েরা নেত্রীদের সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা হাজিরা দেওয়ার আদেশ রয়েছে। এশার এমন একটি অডিও সম্পতি প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন হাতিয়ে নেওয়াসহ ছাত্রলীগ নেতাদের দ্বারা গণধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পশুর মতো আচরণ করা হয়। শুধুমাত্র হলে থাকার জায়গা দেওয়ার বিনিময়ে এই নেত্রীরা এক রকম দস্তখত লিখে নেন। তাদের কথায় উঠতে বসতে হয়। তাদের ‘চোখে চোখ তুলে তাকানো’র অপরাধে হল থেকে বের করে দেওয়া হয় যখন খুশি তখন। হলের বড় নেত্রীরা এক রুমে যেখানে একজন কি দুজন করে থাকেন, গণরুমে সেখানে ৩০-৪০ জন থাকে। অনেকে যেখানে লাইব্রেরি রুম, মসজিদে, বারান্দায়, এমনকি ছাদেও বিছানা পেতে ঘুমায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট, হাউস টিউটরদের মেরুদণ্ডহীনতার কাছে এই নেত্রীরাই মুরুব্বি। আর এদের প্রত্যেকে হলগুলোতে ভয়ের দোকান খুলে রাখে।

রাবিতে হলে থাকার চাঁদা না দিলেই নির্যাতন:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আবাসিক হলে ছাত্রীদেরকে চাঁদা দিতে হয়। কথা না শুনলে নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। গত বছর নভেম্বরে এক ছাত্রীকে ১০ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ২০২ নম্বর কক্ষে ওই ছাত্রীকে আটকে রাখে ছাত্রলীগের দুই নেত্রী। পরে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হলে গিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করেন। নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যলয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ৮ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তিনি ওই হলের ২০৩ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্রী।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক টুম্পা রানী সাহা ও উপ-ক্রীড়া সম্পাদক ইসরাত জাহান নিপা ওই ছাত্রীর কাছে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করে। অন্যথায় হল থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়। কিন্তু ওই ছাত্রী তা দিতে অপারগতা জানালে ছাত্রলীগের নেত্রীরা তাকে পাশের কক্ষে ডেকে আটকে রাখে। এ সময় তারা ওই ছাত্রীর কক্ষে তালা লাগিয়ে দেয়। ঘটনা জানতে পেরে হলের আবাসিক শিক্ষকরা তাকে উদ্ধার করতে গেলে ছাত্রলীগ নেত্রী টুম্পা ও নিপা তাদের অপমান করে বের করে দেয়। ওই সময়ের বিভিন্ন পত্রিকায় এ বিষয়ে সংবাদ ছাপা হয়।

ইডেনে নির্যাতনের আগে চুরির অপবাদ:
ইডেনে কোন ছাত্রীকে টার্গেট করলে তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয় চুরির অপবাদ। গত ১০ এপ্রিল মোবাইল চার্জার চুরির অপবাদ দিয়ে এক ছাত্রীকে তিনদিন ধরে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠে। অভিযুক্ত প্রধান নির্যাতনকারী ছাত্রলীগ নেত্রী জারিন তাসনিম পুর্ণি ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। জানা যায়, সেজুতি চারদিন আগে ছাত্রলীগ নেত্রী পূর্ণিকে মাসিক এক হাজার টাকা চাঁদা দেয়ার বিনিময়ে কলেজের হাসনাহেনা হলের ৩০২ নম্বর কক্ষে উঠে। হলে ওঠার প্রথম দিনই কক্ষের তমা নামের এক বহিরাগত ছাত্রীর মোবাইল চার্জার হারিয়ে যায়। সেজুতি তার চার্জার চুরি করেছে বলে তমা পূর্ণির কাছে অভিযোগ দেয়। পূর্ণি তার লাগেজ তল্লাশী করে। কিন্তু মোবাইল চার্জার না পেয়ে পূর্ণি ভুক্তভোগীকে মারধর শুরু করে কয়েকজন।