মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গ্লাস কি অর্ধশূন্য-এ এম এম শওকত আলী

১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের ফলে নির্বাহী থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়েছিল। এ নিয়ে যথেষ্ট কালক্ষেপণের পর শেষ পর্যন্ত ২০০৮-০৯ সালে নির্বাহী বিভাগে জেলাপর্যায়ে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা রদ করা হয়।

এর ফলে ধারণা করা হয়েছিল যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জন করা হয়েছে। এ ধারণা কয়েক বছর ধরে উচ্চ আদালতের বিচারকরাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। বিশেষ করে বর্তমান প্রধান বিচারপতি একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন যে বিচার বিভাগ এখনো পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে তা হলো, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, কর্মস্থল নির্ধারণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক কর্মকাণ্ড সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম নন। মূল কারণ সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদ। এক. ১১৬ এবং দুই. ১১৬(ক)। প্রধান বিচারপতি বহুদিন পর এই দুটি অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ১৯৭২-এর মূল অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করার দাবি জানিয়েছেন। গত ১১ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক খবরে আবার তিনি এ বক্তব্যই দিয়েছেন। তাঁর মতে, ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের মূল স্তম্ভের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরো বলেছেন যে ‘সংসদ সংবিধানের মূল স্তম্ভ পরিবর্তন করতে পারে না। ’ তিনি রাষ্ট্রের মূল তিনটি অঙ্গের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। যেমন—নির্বাহী, সংসদ ও বিচার বিভাগ। এ সূত্রে তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগসহ সংসদ একাধিকবার লাইনচ্যুত হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগ হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মূল স্তম্ভ বলতে তিনি বিচার বিভাগকেই মনে করছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনায় মূল স্তম্ভ হিসেবে তিনটি অঙ্গকেই চিহ্নিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিভাজনের জন্যই সংবিধানে এ তিনটি স্তম্ভের অধিক্ষেত্রসহ কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী যেকোনো গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এ বিষয়টি অনুসরণীয়। এ ক্ষেত্রে যা পালনীয় তা হলো, নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত দায়িত্ব পালনে একে অপরের কাজ করার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। অর্থাৎ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হলে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে আরো একটি তথ্য ছিল যে সংসদ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হলেও প্রণীত সব আইন সংবিধানসম্মত হতে হবে। অন্যথায় তা বেআইনি বলে গণ্য হবে। বেআইনি ঘোষণার ক্ষমতা উচ্চ আদালতের, অন্য কোনো অঙ্গের নয়। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ ক্ষমতা উচ্চ আদালতকে দেওয়া হয়েছে। সংসদ যেমন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না, ঠিক তেমনই কোনো সংবিধানসম্মত আইন যা অন্য বিভাগের নির্বাহী অধিক্ষেত্রভুক্ত তা নির্বাহী বিভাগ প্রয়োগ করার ক্ষমতাবান হবে না। এ দুটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব ও কর্তব্য উচ্চ আদালতের। প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রতীয়মান হয় যে ১১৬ ও ১১৬(ক) অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানসম্মত নয়। কারণ সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি স্বীকৃত হলেও এ বিভাগ স্বীয় অধিক্ষেত্রভুক্ত অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি করতে বা উপযুক্ত ক্ষেত্রে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে  পারছে না। এ থেকে মনে হয়, ২০০৮ পূর্ব নির্বাহী বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিদের বিচারিক ক্ষমতা রদ করলেই যে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে এমন কোনো কথা নয়। অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগসহ সংসদে কর্মরত ব্যক্তিদের বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বিচার বিভাগের কোনো ক্ষমতা নেই। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের যে ক্ষমতা রয়েছে তা হলো, কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি আদালতে সুবিচার প্রার্থনা করেন তাহলে সংশ্লিষ্ট আদালত হস্তক্ষেপ করতে ক্ষমতাবান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কারণেই এ ধরনের বিধান যুগ যুগ ধরে দৃশ্যমান। এ নিয়ে কোনো বিতর্ক হয় না। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। সংবিধানের মূল কাঠামো (Basic Structure) সংসদও পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না। ভারতের ক্ষেত্রে ওই দেশের সুপ্রিম কোর্টও বেশ কিছু বছর আগে এমনই রায় দিয়ে মূল কাঠামোর বিষয়াবলিও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল কাঠামোর বিষয়াবলি এখনো কোনো রায়ে উল্লেখ করা হয়নি। অথচ একদলীয় শাসন ও একাধিকবার সামরিক শাসনের ফলে মূল কাঠামো বিঘ্নিত বা বিলুপ্ত হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের সংবিধানের ব্যাখ্যাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় সামরিক শাসনের সময়েই হয়েছিল। সে রায় ছিল ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট স্থানান্তরের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে যে রিট মামলা হয়েছিল তা হলো, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি একক (Unitary) রাষ্ট্র। এ কারণেই হাইকোর্ট স্থানান্তর করা সংবিধানসম্মত নয়। এর পরই একক সংস্থা হিসেবে উচ্চ আদালতে দুই বিভাগ সৃষ্টি করা হয়। বলা হয় সুপ্রিম কোর্ট একক, তবে এটিতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগ থাকবে। অন্য একটি রায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বিলুপ্তি সম্পর্কিত। রায়ে বলা হয়েছে, এ প্রথা সংবিধানসম্মত নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তী সময়ে অসাংবিধানিক মর্মে ঘোষিত হওয়ার ফলে এ প্রথা বিলুপ্ত হয়। এ থেকে মনে হয় রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্যই যথেষ্ট নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার কথা। এর মূল কাজ সংসদীয় নির্বাচন ন্যায়সংগতভাবে সম্পন্ন করা। কিন্তু এটা ছিল সম্পূর্ণ অনির্বাচিত সরকার, যা সংবিধানসম্মত নয়। তবে বর্তমান সংবিধানে মন্ত্রিসভার মোট সদস্যের মধ্যে এক-দশমাংশ সংখ্যা অনির্বাচিত মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টি স্বীকৃত। এ অনুচ্ছেদের অংশ এখনো বিলুপ্ত হয়নি, তবে বাস্তবে নির্বাচিত ব্যক্তিদেরই মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হচ্ছে। বাস্তব প্রথাই স্বীকৃত বিষয়।

প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি বাস্তবেও কিছু কাজ করছেন। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে মিডিয়ায় কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক খবর অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট ১৫ জানুয়ারির মধ্যে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধি গেজেটে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ তথ্যের বৈশিষ্ট্য হলো আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানা যায় যে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত হলো চাকরির শৃঙ্খলাবিধি গেজেটে প্রকাশের প্রয়োজন নেই। এ তথ্য নিয়েই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে কিছুটা প্রতিবাদমূলক বক্তব্য। ১৫ জানুয়ারির মধ্যে গেজেটে বিধি প্রকাশের সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগ বাধ্য হয়েই দিয়েছে। এ নিয়ে হয়েছে নানা মন্তব্য। যেমন—রাষ্ট্রপতিকে ভুল বোঝানো হয়েছে। একটি পত্রিকার তথ্য বিশ্লেষণমূলক খবরের প্রধান প্রশ্ন ছিল, রাষ্ট্রপতি কি অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। যেখানে প্রধান বিচারপতি বলছেন ১১৬ ও ১১৬(ক) অনুচ্ছেদ সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তার পরও নির্বাহী বিভাগের আইন মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হলো বিধি গেজেটে প্রকাশ করার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্য একটি পত্রিকায় প্রতিবেদকের অভিমত হলো, অতীতে গেজেট প্রকাশের একাধিক নজির আছে। রাষ্ট্রপতির আদেশেই ২০০৭ সালে বিধি সংশোধনের বিষয় গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী একমাত্র বিধি না রাষ্ট্রপতি অনুমোদিত সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গেজেটে প্রকাশ করার রেওয়াজ রয়েছে। এমনকি কর্মকর্তাদের বদলি ও শৃঙ্খলাজনিত গুরুদণ্ডের আদেশ। এ ছাড়া সব ধরনের আইনের অধীনেই বিধি প্রণয়ন করা ও গেজেটে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ধরনের বাধ্যবাধকতার অর্থ হলো বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব বিভাগসহ জনগণকে অবহিত করা। অন্য অর্থে এ প্রথা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্যই করা হয়। গেজেটে প্রকাশের পর অনেক সময় আইন ও বিধির কিছু বিতর্কিত অংশ উচ্চ আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সরকারি কার্য সম্পাদন বিধিসহ সচিবালয় নির্দেশিকায়ও আইন ও বিধি গেজেটে প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো আইন বা বিধি গেজেটে যেদিন প্রকাশ করা হয়, সেদিন থেকেই কার্যকর বলে গণ্য হয়। ১৫ ডিসেম্বর খসড়া শৃঙ্খলাবিধি গেজেটে প্রকাশ করার বিষয়ে কিছু তথ্য একটি পত্রিকায় দৃশ্যমান ছিল। একজন প্রবীণ আইনজীবীর অভিমত হলো, শৃঙ্খলাবিধি গেজেটে প্রকাশ না করলেও তা আইন বলে গণ্য হবে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত আদেশ আইনের মর্যাদাতুল্য। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এ কথাও বলেছেন যে বিষয়টি গেজেটে প্রকাশ করা উচিত। নির্বাহী বিভাগে এ-সংক্রান্ত বিধি গেজেটেই শুধু প্রকাশ করা হয় না। এ বিধির সংকলনও সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়। কারণ দৈনন্দিন ভিত্তিতে এ বিধি প্রয়োগ করতে হয়। আর সংশ্লিষ্ট বিচারকদের চাকরিতে প্রবেশ করার পর এ বিধিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণও নিতে হবে। সব দিক বিবেচনা করলে বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি গেজেটে প্রকাশ করাই ভালো। অন্যথায় থাকবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে শূন্যতা।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Add Comment

Click here to post a comment