অন্যরকম খবর ইতিহাস মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

বায়তুল হিকমাহ : মুসলিম ইতিহাসের এক হারিয়ে যাওয়া গৌরব

আব্দুল্লাহ আল মেহেদী :: ইতিহাস মানুষকে জানান দেয় ইরাকের সোনালী অতীত আর গৌরবময় সভ্যতাগুলোর কথা। মুসলিম ইতিহাসে নানান ঐতিহ্যের কারণে আলোচিত এই আরব ভূখণ্ড। তেমন একটি ঐতিহ্য ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া  বিশালাকার এক লাইব্রেরি, যার নাম ছিল ‘বায়তুল হিকমাহ’।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এই লাইব্রেরি। দজলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই নগরী ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প–সাহিত্য ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। কবি, দার্শনিক ও গবেষকরা আসতেন এই বাগদাদে। এখানকার ‘বায়তুল হিকমাহ’ ছিল এক অসামান্য জ্ঞানভাণ্ডার। এখানে ছিল দুর্লভ সব বই। আরবী নামটির বাংলা অর্থ হলো ‘জ্ঞানগৃহ’।

halaku attack on bagdad

উমাইয়া শাসক প্রথম মুয়াবিয়া তার রাজধানী দামেস্কে (সিরিয়া) বইয়ের একটি সংগ্রহ গড়ে তোলেন। এটিকে তখন বায়তুল হিকমাহ বলা হতো। ৭৫০ সালে উমাইয়াদের হটিয়ে শাসন কায়েম করে আব্বাসীয়রা। তাদের রাজধানী ছিল ইরাকের বাগদাদ। এ নগরীর গৌরব ও সুনামের জন্য গড়ে তোলা হয় সুসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। কালক্রমে এরই স্থায়ী নাম হয় বায়তুল হিকমাহ।

বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার বই ছিল এই সংগ্রহশালায়। বাদশাহ হারুন-অর- রশিদ ও তার উজির বার্মাক ইয়াহিয়া বিন খালিদের উদ্যোগে ফরাসি, গ্রিক, মিশরীয়, কালদীয় এবং আরো বিভিন্ন ভাষার বই গ্রন্থাকারটিকে সমৃদ্ধ করেছিল। বাদশাহ হারুন-অর-রশিদের পরে তার ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন বায়তুল হিকমার উন্নয়নের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

বায়তুল হিকমাতে ছিল একটি বিশাল অনুবাদ কেন্দ্র। সেখানে পৃথিবীর খ্যাতনামা প্রাচীন লেখকদের বই বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হতো। সেখানে প্লেটো, এরিস্টটল, গ্যালেনসহ বিভিন্ন দার্শনিকদের বই আরবি ভাষায় অনুদিত হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খলিফা মামুনের সময় শুধু গ্রিক ভাষার গ্রন্থ অনুবাদ করতে তিন লাখ দিনার ব্যয় করা হয়। আব্বাসীয় রাজবংশের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নগরী ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজধানী।

সব চাইতে অবাক করার তথ্য হচ্ছে, বায়তুল হিকমাতে দুস্প্রাপ্য এমন কিছু গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল, যার দ্বিতীয় কপি আর পৃথিবীতে নেই। ইসলামের আগের যুগের বিভিন্ন আরবী কবিতা, চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ ও সন্ধিপত্র ছিলো এই তালিকায়। বায়তুল হিকমাহ নামে এই লাইব্রেরি তৎকালীন বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বায়তুল হিকমার গ্রন্থাগারিকদের মধ্যে সাহল ইবন হারুন, সাইদ ইবন হারুন এবং সালাম অন্যতম ছিলেন। খলিফা মামুনের সময় বীজগণিতের জনক মুহাম্মদ ইবন মুসা আল খারেজামি গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেন।

১২৫৭ সালের শেষ দিকে মোঙ্গল শাসক হালাকু খান বাগদাদে অভিযান শুরু করেন। সে সময়ে বাদশাহ ছিলেন আল মুস্তাসিম বিল্লাহ। মাত্র দুই সপ্তাহে ধ্বংস হয়ে যায় বাগদাদ। ধ্বংস হয় বায়তুল হিকমাহ-ও। বেঁচে যাওয়া লোকজন বলেছিলেন, গ্রন্থগারের বইয়ের ছাইয়ের কারণে নদীর পানি নাকি কালো হয়ে গিয়েছিল।

জুমবাংলানিউজ/এইচএমজেড