জাতীয় স্লাইডার

সাবধান! বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা, রোগীদের অবস্থাও ভয়াবহ

ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে অগ্নিদগ্ধ শিশু আয়েশার শিয়রে মা রিপা আক্তার। ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বাসাবাড়ির সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা। এসব ঘটনায় আহত রোগীদের অবস্থাও ভয়াবহ বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। গ্যাস সরবরাহকারী এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি উঠেছে সচেতন মহলে। সেই সাথে গ্যাস ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হওয়ার কথা বলছেন অনেকে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের তথ্য বলছে, অক্টোবর মাসে শুধু গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হওয়া রোগী ছিল ৩০৭ জন। গত এক সপ্তাহে ভর্তি রোগীর মধ্যে মারা গেছে চারজন। আটজনের অবস্থা গুরুতর।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জাতীয় সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, চিকিৎসক হিসেবে ৪০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছি। কয়েক মাস ধরে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনার সংখ্যা এবং রোগীদের যে ভয়াবহ অবস্থা দেখছি, তা আগে কখনো দেখিনি।

গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরখানের একটি ফ্ল্যাটে গ্যাসের চুলার আগুনে ফ্ল্যাটের তিন পরিবারের আটজন দগ্ধ হন, পরে মারা যান পাঁচজন।মোহাম্মদপুরে গত মঙ্গলবার গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ হন এক দম্পতি। এ ঘটনায় মারা যান স্বামী।

ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে দেখা যায়, গত সোমবার দোহারের নবাবগঞ্জ থেকে এসে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন মা শাহানা বেগম ও ৪০ বছর বয়সী ছেলে নজরুল হাসান। মায়ের ১২ শতাংশ ও নজরুলের শরীরের ৮২ শতাংশ পুড়েছে। মা গ্রিন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন আর ছেলে আইসিইউতে ভর্তি। একই আইসিইউতে ভর্তি গ্যাসের আগুনে দগ্ধ দেড় বছর বয়সী মেয়ে আয়শা। মা রিপা আক্তারও নিজেও দগ্ধ, গ্যাস বিস্ফোরণে স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে হারিয়েছেন। একটাই আকুতি, স্বামীর বংশের একমাত্র বাতি মেয়েটা যেন বেঁচে যায়।

বেঙ্গল এলপিজি লিমিটেডের হেড অব অপারেশন প্রকৌশলী হোসনি মোবারক জানান, সিলিন্ডারে মূলত ২০ মি.মি. এবং ২২ মি.মি. এই দুই ধরনের ভাল্ব ব্যবহার করা হয়। ব্যবহারকারীরাও অনেক সময় ২০ মি.মি. রেগুলেটরের জায়গায় ২২ মি.মি. এর রেগুলেটর ব্যবহার করে থাকে। এর ফলেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক  ম. তামিম বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস যেগুলো লাইনের গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। সেই গ্যাসটা হালকা সহজে বাতাসের সাথে মিশে যায়। ফলে পাইপ লাইনের গ্যাস যদি লিক হয় তাহলে রান্নাঘরের দরজা জানলা খুলে দিলে গ্যাস চলে যায়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে না। কিন্তু সিলিন্ডারে যে গ্যাসটা থাকে সেটা বাতাসের থেকে ভারি। এটা নিচে পড়ে থাকে। ঘরের দরজা জানলা খুলে দিলেও সহজে বাইরে যায় না। প্রচুর বাতাস দিতে হয় এবং সময় দিতে হয়। তবে যদি সিলিন্ডারের বিষ্ফোরণ ঘটে তাহলে সেটা প্রস্তুতকারক কোম্পানির দোষ। এর দায়ভার নিয়ন্ত্রক কোম্পানিকেই নিতে হবে ।

তিনি আরও বলেন, সিলিন্ডার গ্যাস যে পাইপের মাধ্যমে যায়, সেটা প্লাস্টিকের পাইপ। চুলার চারপাশে গ্যাসের পাইপ লাইন জড়িয়ে রাখা হয়। চুলা থেকে পাইপের দুরত্ব রাখতে হবে। সেটা যদি না হয় তাহলে চুলার তাপে পাইপ গলে। গ্যাস লিক হতে পারে। এইভাবে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বাংলাদেশ বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক সামসুল আলম বলেন, সরকার ৫৫টি কোম্পানিকে ডিক্যান্টিং বা ক্রস ফিলিংয়ের অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু ১৬টির বেশি কোম্পানি তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে না। লোকাল মার্কেটে যেসব চুলা তৈরি করা হয়, সেগুলো তেমন মানসম্মত নয়। কিছুদিন ব্যবহার করার ফলে এসব চুলা থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। এর ফলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তাই  গ্যাস ব্যবহারকারীদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।

জুমবাংলানিউজ/এইচএমজেড