slider বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বাংলাদেশে হচ্ছে এই প্রযুক্তি শহর

সিলেটে বড় পরিসরে তৈরি হচ্ছে ইলেকট্রনিক সিটি। সফটওয়্যার, কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি নামিদামি ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক বা প্রযুক্তিপণ্য উত্পাদন হবে এখানেই। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হবে বিদেশেও। সিলেট প্রকল্প ঘুরে এসে জানাচ্ছেন হাবিব তারেক
সিলেট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এ এলাকার শত শত একর জমি অনাবাদি। মানুষজনও অসচ্ছল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল সড়কে চুরি-ছিনতাইও বেড়ে যেত। সম্প্রতি এ অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যার খাতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র গড়ে উঠছে এখানেই। প্রকল্পের কর্মীদের রাত-দিন উপস্থিতিতে জায়গাটি এখন আর আগের মতো নীরব-নিস্তব্ধ নেই। স্থানীয় অনেকেরই কাজ মিলেছে এ প্রকল্পে।

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক

মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘ইলেকট্রনিক সিটি সামনে রেখে কোম্পানীগঞ্জের রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করা হবে। জায়গাটি একসময় শহরে রূপ নেবে। যখন এখানে ৫০ হাজার লোকের কাজের সুযোগ হবে, তাদের পরিবাররাও আসবে, তখন এখানকার অর্থনীতি সচল হবে।

ইলেকট্রনিক হাবের পাশাপাশি বহুমুখী চিন্তাভাবনা নিয়ে আমরা এগোচ্ছি। ’
সিলেটের ইলেকট্রনিক সিটির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় তথ্য-প্রযুক্তি প্রকল্পের কাজ চলছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কাজের পরিধি বা গুরুত্ব বুঝে প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন নাম ঠিক করা হয়েছে—

হাইটেক পার্ক বা সিটি, ইলেকট্রনিক সিটি, আইটি পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক (এসটিপি) ও ইনকিউবেশন সেন্টার।

সিলেট ইলেকট্রনিক সিটি

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে ১৬২ একর জায়গাজুড়ে তৈরি হচ্ছে ইলেকট্রনিক সিটি। এখানে ইলেকট্রনিক সিটি প্রকল্পে তিন ধরনের সুবিধা থাকবে—প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আইসিটি পার্ক এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক প্রকল্প।

সিলেট ইলেকট্রনিক সিটির প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেন, ‘ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যার উত্পাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিই আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। ’ তিনি জানান, প্রকল্পের মৌলিক কাঠামোর কাজ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। প্রকল্প এলাকায় দুটি অংশ থাকবে। একটি অংশে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার। অন্যটিতে আবাসন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিং সেন্টার ইত্যাদি থাকবে।

প্রকল্পের ম্যাপে সব মিলিয়ে ৪০টি স্থাপনা, সেবাপ্রতিষ্ঠান ও সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘সিলেট ইলেকট্রনিক সিটিতে ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানই এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হায়ার ১৩৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ’

প্রকল্পের হাল-অবস্থা

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার খলিতাজুরি বিলেরপাড় এলাকায় প্রকল্প। মূল সড়কের পাশের ছোট খাল পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনিক ভবনের কাজ চলছে। ভবনটির ফ্লোরের আয়তন ৩১০৭৭ বর্গফুট। সাইট অফিসের কাজ শেষ। পুরো প্রকল্প বিলের ওপর হওয়ায় মাটি ভরাট করতে হচ্ছে। নির্মাণকাজ করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস। কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক অবকাঠামোর কাজ শেষ করে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কাজ হবে।

কোথায় কী

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাহফুজুল কবির বলেন, ‘সিলেট ইলেকট্রনিক সিটিসহ মোট ৪০টি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে ১১টি বেসরকারি। ’

বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য-প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোর মধ্যে কোথায় কী কী কার্যক্রম চলবে—

হাইটেক পার্ক বা সিটি, ইলেকট্রনিক সিটি : বড় পরিসরে আইটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে হবে হাইটেক পার্ক বা সিটি ও ইলেকট্রনিক সিটি। এ ধরনের প্রকল্প কোনো বিশেষ এলাকাকে কেন্দ্র করে করা হয়। এখানে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার বা ইলেকট্রনিক পণ্য উত্পাদন হবে। মোটকথা আইটি বা ইলেকট্রনিক শিল্পের সব কিছুই এখানে থাকবে।

আইটি পার্ক বা ভিলেজ : ছোট পরিসরের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস উত্পাদন হবে আইটি পার্ক বা ভিলেজে। সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার—দুটোরই কাজ হবে এখানে।

সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক (এসটিপি) : এক বা একাধিক ভবনেই হবে এ ধরনের পার্ক। এখানে কেবল সফটওয়্যার নিয়ে কাজ হবে।

ইনকিউবেশন সেন্টার : প্রশিক্ষণ দিয়ে আইটি কিংবা সফটওয়্যার টেকনোলজির ওপর দক্ষ মানবসম্পদ এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে ইনকিউবেশন সেন্টারে।
প্রযুক্তি শহর

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী

জুনাইদ আহেমদ বললেন

জাপান ও কোরিয়া হাইটেক ইন্ডাস্ট্রির কার্যক্রম ৩০ বছর আগেই শুরু করেছে। আর এখন বিশ্বে এ সেক্টরে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার সফটওয়্যার খাতে ভারত ও মালয়েশিয়া মোটামুটি এগিয়ে গিয়েছে। একই রকমভাবে সেবা খাতে ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কা এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সফটওয়্যার খাত যে কোনো এক সময় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে, তা কেউ কল্পনা করেনি সাড়ে আট বছর আগে।

বাংলাদেশের তরুণদের মেধাশক্তি কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। একই উদ্দেশ্যে আমরা সিলেটে ইলেকট্রনিক সিটি গড়ে তুলছি। সিলেটে যেহেতু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, এখানকার অনেক প্রবাসী ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাস করছে, তাদের মধ্যে অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীও আছেন। তাঁরা বৈচিত্র্যময় ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন। সে কারণে আমরা সিলেটকে বেছে নিয়েছি। আমরা এখানে ১৬২ একর জায়গা পেয়েছি। আরো প্রায় ৪৫০ একর অনাবাদি জায়গা খালি পড়ে আছে। এসব অনাবাদি জায়গা কিভাবে ব্যবহার করা যায় সে জন্য আমরা এখানে ইলেকট্রনিক সিটির কাজ হাতে নিয়েছি। মূলত আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে—দেশে ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক পণ্যের যে চাহিদা আছে তা পূরণ করা। দেশে ১০ কোটি মোবাইল ফোন, সাড়ে তিন কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার হচ্ছে, ২০ লাখ রেফ্রিজারেটর বিক্রি হয় প্রতিবছর; বছরে প্রায় তিন কোটি মোবাইল ও পাঁচ লাখ ল্যাপটপ আমদানি হয়। এখানে যে বিপুলসংখ্যক ক্রেতা বা ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে, এর চাহিদা পূরণে সিলেটে ইলেকট্রনিক সিটি গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে এখানে বড় বড় ইলেকট্রনিক বা হার্ডওয়্যার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এ ছাড়া এখানে আইটি বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কও গড়ে তোলা হবে। সঙ্গে একটি ইনকিউবেশন সেন্টার হবে, যাতে সিলেটের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মেধাবী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সিলেটেই করা যায়।

দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শেষ হবে এবং পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সিলেটসহ দেশ-বিদেশের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এভাবেই আমরা দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিভিন্ন সেক্টরে প্রায় ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছি।
সৌজন্যেঃ কালেরকন্ঠ

Advertisements