অর্থনীতি-ব্যবসা জাতীয়

বাংলাদেশে ‘রাইড শেয়ারিং’ প্রতারণা

[better-ads type='banner' banner='1187323' ]

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে: যাত্রাপথে নিজের যানবাহনের খালি আসনে একই যাত্রাপথের অন্য যাত্রীকে পরিবহন করে নিয়ে যাওয়াই রাইড শেয়ারিং৷ কিন্তু বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং সেবার নামে যা চলছে, সেটি বিশুদ্ধ ব্যবসা৷ বাংলাদেশের জন্য নতুন, তাই দেখা দিচ্ছে জটিলতা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বজুড়ে জ্বালানী সংকট বেশ প্রকট হয়ে দেখা দেয়৷ আর তখনই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রাইড শেয়ারিং-এর ধারণা৷ কোনো কোনো দেশে এটি কারপুলিং, কস্ট শেয়ারিং নামেও পরিচিত৷ জ্বালানী, সময়, অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি কমানোও হয়ে ওঠে এর জনপ্রিয়তার কারণ৷

কোনো কোনো দেশে রাইড শেয়ারিংকে সরকারিভাবে সহায়তা করার চেষ্টা চলেছে দীর্ঘদিন ধরে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে কারপুলিং-এর জন্য আলাদা সড়ক করে দেয়া হয়েছিল৷ এমন অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছে আরো নানা দেশ৷

পরিবেশের কথা বাদই দিলাম৷ অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও গণপরিবহন ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক৷ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন গুগল ম্যাপই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার রুট, বাস, ট্রাম বা অন্য সব ধরনের বিকল্প আপনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানিয়ে দেয়৷ বাংলাদেশে কখন, কোথায়, কোন বাস যায়, তা হয়তো চালকেরাও ঠিকমতো বলতে পারেন না৷

নৈরাজ্য তো আছেই৷ বিদেশি বাদ দিলাম, অন্য শহর থেকে ঢাকায় নতুন আসা কারো পক্ষেও গণপরিবহনের রুট, সময়সূচি, ভাড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া অসম্ভব৷

বিকল্প ব্যবস্থায় যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তারা গাড়ি কিনছেন৷ এমন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার আছে, যাদের সামর্থ্য না থাকলেও প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি থেকে বাঁচতে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে হলেও কিনছেন ব্যক্তিগত গাড়ি৷

দরকারের সময়ে সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি, রিকশা, কোনোকিছুই হাতের নাগালে পাওয়া ঢাকা শহরে সম্ভব না৷ আর বৃষ্টি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সমাবেশ, বা বড় কোনো পরীক্ষা থাকলে ঢাকা শহরের যাত্রীদের অবস্থা হয় পাগলের মতো৷

এই অবস্থায় যাত্রীদের আশীর্ব্বাদ হয়ে আসে উবার৷ এরপরই পাঠাও এবং পরে আরো বেশ কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান গণপরিবহনের নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে সে জায়গা দখল করে৷ হাতের নাগালে অ্যাপ৷ বাসায় বসে অনুরোধ পাঠালে গাড়ি এসে হাজির হয়৷ কোনো দামদর করতে হয় না৷ নিশ্চিন্তে পৌঁছে যাওয়া যায় গন্তব্যে৷

পাঠাও নিয়ে এলো যানজটের সমাধানও৷ শুরু হলো কারপুলিং-এর আদলে মোটরসাইকেলপুলিং৷

কিন্তু রাইড শেয়ারিং নাম দিলেও, রাইড কি শেয়ার করছেন এই সেবা দানকারী চালকেরা? না, অন্তত ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই না৷ কোনো যাত্রী নিজে কোথাও যাচ্ছেন, এমন ক্ষেত্রে সে পথের কাউকে নেয়া হলো শেয়ারিং৷ কিন্তু এখন পাঠাও-উবার যা করছে, তা কোনোভাবেই শেয়ারিং না৷ বরং কথ্য বাংলায় যাকে ‘খ্যাপ’ বলা হয় যাকে, মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের জন্য সেই বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে এরা৷

নানা সুবিধার কারণে পাঠাও-এর মোটরসাইকেল আমার কাছেও বেশ প্রিয় ছিল৷ সে সূত্রেই চালকদের কাছ থেকে জানা, পাঠাও জনপ্রিয় হওয়ার পর হঠাৎ করেই ঢাকা শহরে বিভিন্ন শোরুমগুলোতে বেড়ে গেছে মোটরসাইকেল বিক্রি, সড়কে প্রতিদিনই নামছে নতুন নতুন যান৷

একবার একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যিনি মাত্র আগের দিন ঢাকায় এসেছেন৷ নিজের মোটরসাইকেল তো নেইই, ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই৷ যা আছে, তা হলো পরিচিত এক বড় ভাই যিনি কাজ করেন পুলিশে৷ ফলে দিব্যি মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে একদিনেই তিনি কয়েকশ টাকা কামিয়েছেন, যাত্রাপথের দিকও চিনে নিয়েছেন যাত্রীর কাছ থেকেই৷

গাড়িতেও একই যন্ত্রণা৷ গাড়ি কিনলে পাওয়া যাচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ৷ ফলে অনেকে গাড়ি কিনে সেটা নিবন্ধন করছেন উবার-পাঠাওয়ে৷ ফলে যানজট কমার বদলে, তাতে আরো নতুন যন্ত্রণা যোগ হচ্ছে৷

এসব গাড়ি বা মোটর সাইকেলে নেই কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ৷ একটা নীতিমালা হলেও অন্য সব খাতের মতো এটিও অকার্যকর৷

নিরাপত্তা, জবাবদিহিতাসহ নানা বিষয়ে যাত্রীদেরও রয়েছে অভিযোগ৷

ফেসবুকে বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম রাইড শেয়ারিং নিয়ে তাঁদের মন্তব্য৷ অনেকে খুঁত থাকা সত্ত্বেও এসব সেবাকে স্বাগত জানিয়েছেন৷ কেউ কেউ তুলে ধরেছেন নিজেদের অভিজ্ঞতা৷

বেলাল হাসান নিসার গতি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরবাইক চালকেরা নামেমাত্র হেলমেট দেন যাত্রীদের৷

নূসরাত হক প্রশ্ন তুলেছেন চালকের ব্যবহার নিয়ে৷ একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক ওবায়দুর মাসুম এক কথায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘‘সবগুলো অবৈধভাবে চলছে৷” সৈকত সাদিক রাস্তায় চালকদের কোনো আইন না মানার বিষয়টিকে বড় সমস্যা বলে মনে করছেন৷

রিফাত লোপা ভাড়া নির্ধারণে সেবাগুলোর স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন৷ ‘‘রাইড শেয়ারিং এর কারণে কিছুটা ভোগান্তি মধ্যবিত্তের কমেছে” মানছেন জান্নাতুল ফেরদৌস৷ কিন্তু পাশাপাশি বলছেন, ‘‘যেসব কারণে সিএনজিতে চড়া বন্ধ করছিলাম, এখন উবার পাঠাও তা শুরু করছে। ঈদে ভাড়া ৪ গুণ! আবার মোড়ে দাঁড়িয়ে বাইকগুলো চুক্তিতে যেতে চায়!”

কারপুলিং বা রাইড শেয়ারিং-এ কোনোভাবেই একজন চালকের মুনাফা করার কথা না৷ শুধু যাত্রাপথে জ্বালানির খরচের এক অংশ দেয়ার কথা সহযাত্রীর৷ কিন্তু বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং-এর নামে রীতিমতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন চালকেরা৷ শুধু চালক নন, একটা অ্যাপ বানিয়ে আর কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই কামাচ্ছেন নগদ টাকা৷

আমার মন্তব্যে মনে হতে পারে আমাকে ‘সুখে থাকলে ভূতে’ কিলাচ্ছে৷ কিন্তু একটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় এমন নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে সে দেশ কখনও উন্নত হতে পারে না৷

যদি রাইড শেয়ার করতে হয়, সেটা অবশ্যই দারুণ উদ্যোগ৷ আর যদি এখন যা চলছে তাই চলতে দিতে হয়, তাহলে শেয়ারিং-এর মুখোশ ছেড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই তাদের নিবন্ধন করতে হবে৷ একদিকে শেয়ারিং-এর নামে দু’পয়সা বাড়তি কামিয়ে ট্যাক্স ফাঁকি, অন্যদিকে জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যাচ্ছেতাই করার সুযোগ ব্যবসায়ীরা চিরদিনই নিয়ে এসেছেন, সে চেষ্টা তারা চালিয়েও যাবেন৷

সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের পক্ষ নিয়ে সবকিছুকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা৷ এক্ষেত্রে অবশ্য তথাকথিত রাইড শেয়ারিং সেবায় হাত দেয়ার আগে গণপরিবহনে হাত দেয়ার পক্ষেই থাকবো আমি। সূত্র: ডয়চে ভেলে

জুমবাংলানিউজ/একেএ