জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ স্লাইডার

‘বাংলাদেশের পক্ষে আর শরণার্থী নেয়া সম্ভব নয়’

সালেহ নোমান, চট্টগ্রাম ব্যুরো: প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে কয়েকশ জাতিগত রাখাইন, খুমি ও ব্রো জাতিগোষ্টির সদস্য বাংলাদেশের অনুপ্রবেশের জন্য সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থান করলেও সরকার  আর কোনও শরণার্থীকে আশ্রয় দিবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সীমান্তের কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি জিরো লাইনে অপেক্ষমাণ মিয়ানমারের নাগরিকদের সেই দেশে ফেরত যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন ও দক্ষিণ চিন প্রদেশের সশস্ত্র গোষ্টি আরাকান আর্মির সাথে গত নভেম্বর থেকে একের পর এক সংঘাতের ঘটনায় সেই দেশে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যূত হওয়ার খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। সেখানকার বাস্তুচ্যূত কয়েক’শ মানুষ গত সপ্তাহে বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার পালং সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বিজিবি ও স্থানীয় প্রাশসন মিয়ানমারের এসব নাগরিকদের সীমান্তের জিরো লাইনে আটকে দেয়। বর্তমানে প্রায় দুইশ মিয়ানমারের নাগরিক জিরো লাইনে অবস্থান করছে। সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনও ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে সেই জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।

বিজিবি’র রামু রিজিওনের পরিচালক (অপারেশান) কর্নেল  সরকার মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধরনের আনুপ্রবেশ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরাদারের পাশাপাশি পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। সীমান্ত অতিক্রম করে রোহিঙ্গাসহ অন্য কাউকে এখন আর আসতে দেয়া হচ্ছে না।

বান্দরবানের রুমা উপজেলার পালং সীমান্ত দিয়ে যারা আসার চেষ্টা করছে তাদেরকে সীমানার ওপারে জিরো লা্ইনে আটকে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে জিরো লাইনে বাসবাসকারী এসব মিয়ানমারের নাগরিকদের সেই দেশে ফেরত যেতে বলা হয়েছে বলেও জানান কর্ণেল মোস্তাফিজুর রহমান।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী পালং সীমান্তের জিরো লাইনে আটেকে থাকা ১৪০ জন মিয়ানমারের নাগরিকরা সেই দেশের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দক্ষিণ চিন প্রদেশের পালটুয়া এলাকার বাসিন্দা। নিজদের গ্রামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার গানশিপ নিয়ে হামলা চালানোর পর প্রাণভয়ে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। এদের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন শিশু রয়েছে।

মানবিক দিক বিবেচনা করে সীমান্তে আটকে পড়া মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য, পানি ও ওষুধের মতো জরুরী সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্নেল সরকার মুস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা দিয়ে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে, যার পরিমাণ ২৭১ কিলোমিটার।

কর্নেল রহমান আরও জানান, অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়া সত্বেও রুমা উপজেলার আশপাশসহ সমগ্র বান্দরবান জেলার সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি বিজিবির বাড়তি সদস্য মোতায়ন করা হয়েছে। একই সাথে কক্সবাজার জেলার সাথে বিদ্যমান সীমান্তেও নজরদারির পাশাপাশি রোহিঙ্গাসহ অন্য কাউকে এখন আর বাংলাদেশে আসতে দেয়া হচ্ছে না।

গত নভেম্বর থেকে দক্ষিণ চিন প্রদেশ ও সংলগ্ন রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

সীমান্ত এলাকায় এই ধরনের কোনও অভিযানের সময় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও বিভাগকে অবহিত করতে হয়। কিন্তু মিয়ানমার তাদের চলমান এই অভিযান সম্পর্কে এখনও বাংলাদেশকে কিছু জানায়নি বলে জানান বিজিবির কর্মকর্তা সরকার মোস্তাফিজুর রহমান।

২০১৬ ও ২০১৭ সালে রাখাইন প্রদেশে আরাকান ন্যাশনাল স্যালভেশান আর্মি আরসা’র সাথে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সংঘাতের পর থেকে দুই দফায় প্রাণভয়ে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে পৃথিবীর ইতিহাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মানবিক সংকট হিসেবে অভিহিত করেছিলো জাতিসংঘ।

বাংলাদেশে এখন সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। কক্সবাজার জেলার ৩১টি শরণার্থী ক্যাম্পে তারা বসবাস করছে। এরমধ্যে কক্সবাজারের কুতুপালং-বালুখালি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী ক্যাম্প, যার বাসিন্দা ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট মোকাবেলায় ২০১৮ সালে আর্ন্তজাতিক দাতারা প্রায় ৬ শত ৫৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিলো, যা চাহিদার ৬৯ শতাংশ। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন ছিলো ৯ শত ৫২ মিলয়ন মার্কিন ডলার।

সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর রাখাইন ও দক্ষিণ চিন প্রদেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যূত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহবান জানিয়েছিলো।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম জুমবাংলাকে বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও মানবিক দিক বিবেচনায় মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় দেয়া হয়েছিলো। এরজন্য শরণার্থীদের বাসবাস করা এলাকাগুলোতে জনগণ ও প্রশাসনকে নানা ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এই সমস্যা আর বাড়তে দেয়া যাবে না।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুমা সীমান্তের জিরো পয়েন্টের মিয়ানমারের নাগরিকদের জানানো হয়েছে, তাদেরকে আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়, তাদেরকে নিজ দেশে ফিরে যেতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম।

 

জুমবাংলানিউজ/একেএ