বিভাগীয় সংবাদ সিলেট

বদলে যাচ্ছে সব হিসাব

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে সিলেট-১ আসন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ হিসেবেই স্বীকৃত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে অনুষ্ঠিত সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করেছে সে দলই সরকার গঠন করেছে। এই ঐতিহাসিক মিথের কারণেই এ আসনটিতে বাড়তি নজর রাখে দেশের সব রাজনৈতিক দল। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মর্যাদাপূর্ণ আসনটিতে জয়ে চোখ রেখে তৎপরতা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আসনটিতে দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে একাধিক নেতা মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে এই দুই দলের বাইরে নতুন করে দুই নেতার নাম যুক্ত হওয়ায় এ আসনে সব হিসাব-নিকাশ বদলে যাচ্ছে।

সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত ১০টি সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ চারবার এবং বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দুইবার করে বিজয়ী হয়েছে। এ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে প্রয়াত সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে এ আসনের সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিতও আছেন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই ‘ভিআইপি’ আসন নিয়ে আওয়ামী লীগে কিছুটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। গেল জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর এই দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে সিটি নির্বাচনের ভুল জাতীয় নির্বাচনে হবে না।

একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। বেশ কয়েকবার ‘না’ করলেও সর্বশেষ আবারও নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে তিনি একাধিকবার গণমাধ্যমে তার পরিবর্তে তার ভাই জাতিসংঘের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আবদুল মোমেন নির্বাচন করার কথা বলেছিলেন। নির্বাচন করতে গত বছরখানেক ধরে বেশ তৎপর ড. মোমেন।

নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সব অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন তিনি। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচিতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন। দলের নেতা-কর্মীরা মনে করেন, এখনো সিলেট-১ আসনে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী প্রার্থী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হলে তার কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি সিলেট-১ আসন নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে এ আসনটিতে জয় পেতে মরিয়া বিএনপি। এজন্য খালেদা জিয়াকে এ আসনে প্রার্থী করার চিন্তাভাবনা বিএনপিতে আছে বলে দলটির শীর্ষ সূত্রে জানা গেছে। আইনি জটিলতা কাটিয়ে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে না পারলে মর্যাদাপূর্ণ এ আসনে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবায়দা রহমান প্রার্থী হতে পারেন এমন গুঞ্জনও আছে দলটির নেতা-কর্মীদের মাঝে। তবে এখন পর্যন্ত মাঠের প্রার্থী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ হতে মুক্তাদির নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয় আছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সিলেটে দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। তবে গেল সিটি নির্বাচনের পর থেকে সিলেট-১ আসনে নির্বাচন করার জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরীও।

এদিকে, সম্প্রতি সিলেট-১ আসন নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। গুঞ্জন রয়েছে-জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে গেলে এ আসনে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর প্রার্থী হতে পারেন। একসময় সিলেটের জনপ্রিয় এ নেতা সিলেট-১ আসনে প্রার্থী হলে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল। তবে এখনই নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না সুলতান মনসুর। তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতির মানুষ, আপাতত রাজনীতি নিয়ে ভাবছি। নির্বাচন হচ্ছে রাজনীতির একটি অংশ। আগে দেশে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হোক, তারপর চিন্তা করব প্রার্থী হওয়া নিয়ে। সিলেটের মানুষ যদি চায় তবেই নির্বাচনের কথা ভাবব।’

এ ছাড়া অবসর ভেঙে সাবেক বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরী বিকল্পধারায় যোগ দেওয়ায় তাকে নিয়েও সিলেট-১ আসনে আলোচনা চলছে। বিকল্পধারা থেকে তিনি সিলেট-১ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে সুর উঠেছে। নির্বাচনের আগে শমসের মবিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিলেট বিএনপির কয়েকজন নেতা বিকল্পধারায় যোগ দেওয়ারও কানাঘুষা চলছে সিলেটে।

এদিকে, সিলেট-১ আসনে গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। গত সেপ্টেম্বরে তাকে প্রার্থী ঘোষণার পর তিনি গণসংযোগও করছেন। এ ছাড়া দু-তিনটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলও এ আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেসব প্রার্থীর কাউকেই মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

শাহ্ দিদার আলম নবেল
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি