জাতীয়

বজ্জাত পুলিশগুলো খালি খায় আর ঘুমায়

‘এই বজ্জাত পুলিশগুলো খালি খায় আর ঘুমায়। একেকটার ভুঁড়ি দেখলে মনে হয়, যত শয়তানি বুদ্ধি ঐ ভুঁড়ির মধ্যে থাকে। আস্ত একেকটা শয়তানের হাড্ডি। অফিসারগুলো আরও পাজি। পারে শুধু ভাব মারতে, কাজের বেলায় ঠনঠনাঠন। আমার আত্মীয়কে খুন করে তার ২৫/৩০ লাখ টাকা গায়েব করা হল। লাশটাও পাওয়া গেল না। চেঁচায়া গলা ফাটাচ্ছি অথচ ওসির কানে কথা ঢোকেই না। আরেকজন কি জানি সার্কেল না ফার্কেল, সে তো দেমাগে কথাই কয় না। যদি ছানোয়ারকে খুঁজে না পাই তাহলে মজা দেখাবো।’

এতক্ষণে বুঝলাম নিখোঁজ ব্যক্তির নাম ছানোয়ার। একটু খোলাসা করেই বলি। গত ১২/০৫/১৮ তারিখ বেড়া মডেল থানার ওসি সাহেব ফোন করে উৎকণ্ঠার সাথে জানালেন সর্বনাশ হয়ে গেছে স্যার, একটু থানায় আসতে হবে। সারাদিন রাজনৈতিক কোন্দল আর মারামারি ঠেকিয়ে সন্ধ্যার পর একটু দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলাম। শেষ না করেই ছুটলাম থানায়। ঢুকতেই উল্লেখিত ছড়া-কাব্য শুনতে হল। ওসি সাহেব জানালেন, ছানোয়ার নামের এক ধনাঢ্য ব্যক্তি ২০/৩০ লক্ষ টাকা নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ী ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছেন। পরিবারের দাবি, নিশ্চিত খুন করে গুম করা হয়েছে। সর্বশেষ যার সাথে কথা হয়েছিল তার নাম মিন্টু, তাকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। আমি বললাম তার কি দোষ? ওসি সাহেব বললেন, পরিবারের দাবি, ঐ লোকই মেরে ফেলেছে ছানোয়ারকে। বললাম তবে লাশ কই, প্রমাণ কি? ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশেষে মনে হল লোকটার কোথাও ধার-দেনা নাই তো! এর জন্যও তো অনেক মানুষ আত্মগোপন করে। স্বজনেরা বললেন, অসম্ভব, কোন ধারদেনা নাই। তাছাড়া, ছানোয়ার যে বংশের লোক তাতে তার মত মানুষ এমন কাজ করতেই পারে না। এরই মধ্যে একজন জোর করেই আমাদের কথার মাঝে ঢুকতে চাইলেন। জানালেন তিনি সরকারী কোন এক সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্য। বললাম, ভাই একটু পরে আসেন, আমরা ব্যাপারটা দেখছি। এতে তিনি চটে গেলেন। আমরা নাকি আসামী পেয়েও কোন কাজ করছি না। তার পরামর্শ শুনতে হবে।

একদিকে নিখোঁজের স্বজনের চাপাচাপি, ওদিকে সাংবাদিক ভাইদের প্রশ্ন; আর সর্বোপরি সারাদিনের ক্ষুধার জ্বালা। তার উপর ওসি সাহেবের উদ্বিগ্ন মুখটা দেখে মাথাটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মনে হল সময় নষ্ট করে লাভ কি, যাকে ধরে এনেছে ওর কি খবর জানা দরকার। ওসি সাহেব বললেন ইন্সপেক্টর (তদন্ত) খাইরুল সাহেব আর এসআই সুব্রত জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এইবার একটু আশ্বস্ত হলাম। কারণ এই দুইটা লোক এমন বিচ্ছু যে, জোঁকের মত লেগে থাকে। বিশেষ করে সুব্রত। থানার উপর যদি পারমাণবিক বোমাও পড়ে ও এমনভাবে বলবে যেন, সাইকেলের টায়ার ফাটার মত ঘটনা, এটা কোন ব্যাপারই না। তবে কেন বোমা ফাটলো এটা না জেনে ছাড়বে না। আর খাইরুল সাহেব হচ্ছে সুব্রত এর যোগ্য অভিভাবক। তার কথা হল তুই বাবা চালাইয়া যা, আমি আছি তোর সাথে। যাক সে কথা, এবার সবাই মিলে মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলাম। দিব্যি কেটে বলছি, একটা ফুলের টোকাও কেউ মারেনি লোকটাকে। তবে যতবারই জিজ্ঞেস করা হয়, তার একই কথা ‍‍আমি দুপুর ১২টার দিকে ঘুমিয়েছি বিকেল ৩টার দিকে উঠেছি। নিখোঁজ ছানোয়ার ফোন দিয়েছিল। ডাক বাংলো মোড়ে দেখা হয় তারপর বলল, আমার দোকানে হালখাতা যাবেন না? এরপর চলে যায় আর কিছুই জানি না।

ইতোমধ্যে বারবার ছানোয়ারের ফোনে কল করা হচ্ছে। বন্ধ। আশেপাশের খাল, বিল, ঝোঁপঝাড়ে লোক নামানো হয়েছে। কোথাও নেই লাশ। রাত প্রায় ২টা বাজতে চলল। মাননীয় পুলিশ সুপার জনাব জিহাদুল কবির পিপিএম মহোদয় ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম স্যার বারবার ফোন দিয়েই চলেছেন আপডেট জানতে। সবারই কি উৎকণ্ঠা।

এর মধ্যে ওসি সাহেব লোক পাঠিয়ে ঘুম থেকে তুলে এনেছেন যে হোটেলের সামনে ধৃত ব্যক্তি মিন্টু আর নিখোঁজ ছানোয়ারের সাক্ষাৎ হয়েছিল তাকে। বেচারার কাঁচা ঘুম নষ্ট হয়েছে, মহাবিরক্ত। সে এক নিঃশ্বাসে বলে গেল। তার দোকানে মিন্টু একটা ব্যাগ রেখেছিল। খালি ব্যাগ। একটু পরে ছানোয়ার আসলে ব্যাগটা মিন্টু ছানোয়ারকে দেয়। কোন কথা হয়নি। কেউ কিছু খায়ওনি। এর বেশি সে জানে না। মহাযন্ত্রণায় পড়ে গেলাম। হঠাৎ অতিরিক্ত ডিআইজি তৌফিক মাহবুব চৌধুরী স্যারের কথা মাথায় আসলো। ওসি সাহেবের সাথে পরামর্শ করে তার টেকনিট এ্যাপ্লাই করা হল। একটা সাদা কাগজে মিন্টুকে লিখতে বলা হল তার সারাদিনের কার্যক্রম। মিন্টু একটু করে লেখে আর ঘামে। এক লাইন লেখে আর পাঁচবার ভাবে। অবশেষে দেড় ঘন্টায় দেড় পাতা লিখলো সে। সব লিখল, শুধু ব্যাগের বিষয়টা বেমালুম চেপে গেল। এবার ইন্সপেক্টর খাইরুল সাহেব আর সুব্রত-এর নজর পড়ল বিষয়টার উপর। বোঝা গেল মিন্টু কিছু একটা লুকাচ্ছে। ওসি সাহেব মিন্টুকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে লাগলেন। ব্যাগের কথা বলতেই মিন্টু ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তারপর বলল, স্যার ছানোয়ার ২/৩ দিন আগে আমাকে সাথে নিয়ে বাচ্চাদের স্কুলব্যাগের মত একটা ব্যাগ কিনে আমাকে বলে ডাক বাংলো মোড়ের দর্জির দোকানে রাখতে। আমি ওই ব্যাগটা নিখোঁজের দিন সে চাইলে এনে ফেরত দেই। এরপর আর জানি না। ওসি সাহেব নাছোড়বান্দা। দর্জিকে ভোর রাতে উঠিয়ে আনলেন। জানা গেল, ঘটনা সত্য। কিন্তু এ কথা পরিবার কি বিশ্বাস করবে? আর আসলেই লোকটা গেল কোথায়, সেটাও একটা প্রশ্ন?

লেগে থাকলে ফল আসে। সকালে মিন্টুর ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে একটা কল আসে। ওপার থেকে বলে, আমি ছানোয়ার ভাল আছি। অপূর্ব হোটেল, গাবতলীতে আছি। কিছুদিন পর ফিরব। বাসা খুঁজছি। এখনও পাইনি। না হলে চট্টগ্রাম চলে যাব। বিষয়টা ওসি সাহেব আমাকে জানালেন। পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী মিন্টুকে সাথে নিয়ে গাবতলীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন সুব্রত আর খাইরুল সাহেব। এদিকে নিখোঁজের পরিবারকে কিছুই বলা হ্য়নি। জানালে হৈ হুল্লোড়ে সব প্ল্যান নষ্ট করে ফেলবে। আবার মিন্টু ডায়াবেটিকস পেশেন্ট, হার্টের অসুখ তার। টেনশনে লোকটা মারা গেলে নিশ্চয় পুলিশকে কেউ ছেড়ে কথা বলবে না। সব রিস্ক মাথায় নিয়ে সাগরে সুঁচ খুজতে নামে দুই অফিসার। তাদের সব আয়োজন করে দেয় ওসি বেড়া মোজাফফর সাহেব। তার একটাই কথা হাল ছাড়া চলবে না। এমন সময় মাঝে মাঝে নিখোঁজের ফোন খোলা পাওয়া যায়, মাঝে মাঝে বন্ধ। তড়িৎ গতিতে ঢাকায় পৌঁছে যায় বেড়া থানার টিম। গাবতলী, দারুসসালাম, শ্যামলী, কল্যানপুরের হোটেলগুলোর রেজিস্টার দেখতে থাকে। সহায়তায় পাশে ছিলেন এসি মিরপুর ও দারুসসালাম। বরাবরের মতই সহায়তা দিয়েছেন এলআইসি শাখা, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও বিকাশ সাপোর্ট টিম। কিন্তু, কোন লাভ হল না। কোন ফাঁদেই পা দিল না টার্গেট। শেষে সব প্রযুক্তি বাদ দিয়ে গলিতে গলিতে হাঁটতে শুরু করল সুব্রত আর খাইরুল সাহেব। দুই দিন দুই রাতের হাড় ভাংগা খাঁটুনির শেষে পা আর চলছিল না। একটা সময় হতাশ হয়ে ফিরে আসতে উদ্যোগ নিচ্ছিলেন তারা। এবার বিধাতা সদয় হলেন। হঠাৎ করেই ভোজবাজির মত বাবাজির দেখা মেলে শ্যামলীর রাস্তায়।

অতঃপর, তাকে আনা হল বেড়া থানায়। সে স্কুল ব্যাগটি বাচ্চাদের মত ঘাড় থেকে নামাচ্ছিলই না। অবশেষে পরিবারের সদস্যদের সামনে খোলান হল ব্যাগ। পুলিশের কোন সদস্য একবারের জন্যও হাত লাগায়নি তাতে। পাওয়া গেল বাণ্ডিল বাণ্ডিল টাকা। গুনে দেখা গেল দশ লক্ষ সাতান্ন হাজার দুইশত টাকা রয়েছে ব্যাগে । সে জানাল তার মোট ঋণ ৪৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। সে এটা পরিবারের কাউকে জানায়নি। পুরোটাই গোপন রেখেছে। পাওনাদারেরা তাগাদা দিলে বাঁচার তাগিদে তার এই নাটক।
এরপর কেউ আর পুলিশকে ধন্যবাদ দেয়নি। কেউ বলেনি কোথায় পেলে গাড়ী ভাড়ার টাকা, চলতি পথে কিছু খেয়েছিলে কি না? কিংবা Bravo, You did a great job.আসলে ধন্যবাদটা দামি শব্দ, এটা আমাদের জন্য নয়।

লেখক: আশীষ বিন হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বেড়া সার্কেল, পাবনা।
(পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি