খেলা-ধুলা

ফিল্ডিংয়ের দৃষ্টিকটু প্রদর্শনী

নবাবদের শহরে নবাবি স্টাইলের ফিল্ডিং! প্রায় ১৭ বছর পর ভারতের আতিথ্য গ্রহণ করা বাংলাদেশ যেন মেহমানদারি করার জন্য উঠেপড়ে লাগল। মুশফিকুর-মুমিনুলরা একের পর এক ক্যাচ ছাড়লেন।

রানআউটের সহজতম সুযোগ নষ্ট করলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। ভারতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের প্রথমদিনে অতিথিদের জঘন্য ফিল্ডিংয়ের দৃষ্টিকটু প্রদর্শনী চলল একটানা। অথচ, দিনটা শুরু হয়েছিল কী দারুণভাবে। প্রথম ওভারেই লোকেশ রাহুলকে বোল্ড করেছিলেন তাসকিন আহমেদ। রবি শাস্ত্রীর মতে, এই একমাত্র টেস্টে যিনি বাংলাদেশের বোলিংয়ের প্রাণপুরুষ। টস হারার পর ফিল্ডিংয়ে নামা বাংলাদেশ চতুর্থ বলেই সাফল্য পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তাসকিন ও কামরুল ইসলাম রাব্বির প্রথম আট ওভারে চাপে রাখে স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের। কিন্তু শুরুতেই রাহুলকে হারানোর ধাক্কা ভারত সামলে ওঠে ওপেনার মুরলি বিজয় ও চেতেশ্বর পূজারার দৃঢ়তায় এবং বাংলাদেশের ফিল্ডারদের বদান্যতায়। বৃহস্পতিবার হায়দরাবাদের রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে এরপর শো হয়েছে দুটি। একটি কমেডি শো। যেটির মুখ্য কলাকুশলী বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। আরেকটি তিন ভারতীয়র ব্যাটিং শো। ৩৫-এ ‘জীবন’ পাওয়া ওপেনার মুরলি বিজয় এবং তার অধিনায়ক বিরাট কোহলি অতিথিদের শায়েস্তা করেছেন শতক হাঁকিয়ে। ১১ রানে রক্ষা পাওয়া পূজারা ফিরেছেন সেঞ্চুরির মুখ থেকে। এই ত্রয়ীর ব্যাটিং-বৈভবে ভারত দিনটা শেষ করল ৩৫৬/৩-এ। বিজয় ১০৮-এ পরাজিত হলেও কোহলি ১১১-তে অপরাজিত। বিজয় ও পূজারার ১৭৮ রানের জুটি স্বাগতিকদের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই ভিত আরও মজবুত করে কোহলির শতক। চা-বিরতির ৩০ মিনিট আগে ক্রিজে আসা কোহলি প্রথম তিন বলেই দুটি চার মারেন। ৭৩তম ওভারে তিনি ফিফটি পেয়ে যান, ৭০ বলে। ৬০ বলে তার পরের ৫০। এই শতক দিয়ে একটি বৃত্ত পূর্ণ করলেন ভারত অধিনায়ক। এ পর্যন্ত যাদের সঙ্গে খেলেছেন তাদের প্রত্যেকের বিপক্ষে শতরান হল তার। কোহলি এখন পর্যন্ত শুধু পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেননি।
ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে টসে জিতে বিরাট কোহলি কেন, যে কোনো অধিনায়কই ব্যাট নিতেন। দিনের প্রথম ঘণ্টা পিচ পেসারদের ঈষৎ প্রলুব্ধ করলেও বাকিটা সময় বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় ব্যাটসম্যানদের দিকে। এমন প্রতিকূল উইকেটে ফিল্ডিং করা দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘হাফ চান্স’-কে ‘ফুল চান্স’-এ রূপান্তরিত করা। ভারতের মাটিতে প্রথম টেস্টের প্রথমদিন সেই কাজটিই করতে চরম ব্যর্থ মুশফিকুর রহিমরা। বাংলাদেশের ফিল্ডারদের উদারতার সবচেয়ে দৃষ্টিকটু দৃষ্টান্ত একেবারে সহজ সুযোগ পেয়েও মুরলি বিজয়কে মেহেদি হাসানের রানআউট করতে না পারা। এক রান নিতে গিয়ে বিজয় প্রায় স্ট্রাইক এন্ডে চলে গিয়েছিলেন। চেতেশ্বর ও বিজয় তখন একই প্রান্তে। রাব্বি যখন বলটা ছোড়েন বিজয় তখন অর্ধেক ক্রিজে। কিন্তু বোলার মেহেদি হাসান বলটা ধরে লাগাতেই পারলেন না উইকেটে। বিজয় অভাবনীয় ‘জীবন’ পেয়ে শতক স্পর্শ করেন। ভিভিএস লক্ষণ বললেন, বিজয়ের রানআউট হওয়ার ১০০ নয়, ২০০ ভাগ সুযোগ ছিল। এটা কমেডি শো ছাড়া আর কী! আর একটিমাত্র শব্দে রবি শাস্ত্রীর ব্যাখ্যা, ‘প্যানিক’। কোনো সন্দেহ নেই, মধ্যাহ্নভোজের সময় বাংলাদেশের সাজঘরে এ নিয়ে যথেষ্ট কাটাছেঁড়া হয়ে থাকতে পারে। এমন সহজ সুযোগ হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার পর মুশফিকুর কটমট করে তাকিয়েছিলেন রাব্বির দিকে। তার দৃষ্টি বলছিল, এটা কোনো থ্রো হল? কিন্তু মেহেদি যে এত ক্যাজুয়াল ছিলেন তার কী হবে? সারা দিনের আক্ষেপ হয়ে রইল সেই সহজতম সুযোগ ফসকানো। তার আগে মিরাজের দ্বিতীয় ওভারে পূজারাকে আউট করার দুটি হাফ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি সাকিব। বৃহস্পতিবার প্রথমদিনের খেলা দেখতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসেছিল। বাংলাদেশের ফিল্ডিং ছিল শিক্ষানবিশদের মতো। বিজয়কে রানআউট করার সুযোগ হাতছাড়া হতে দেখে প্রথম স্লিপে দাঁড়ানো সাকিব আল হাসান হতাশায় উল্টে পড়ে যান। তার আগেই আউট হতে পারতেন পূজারা। কামরুল ইসলাম রাব্বির অফ-স্টাম্পের বাইরের বলে পূজারার খোঁচা নিশ্চিতরূপে মুশফিকুরের ক্যাচ হতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশ অধিনায়ক কোনো চেষ্টাই করেননি। সাকিব বলটা থামান বটে কিন্তু ক্যাচে পরিণত করতে পারেননি। স্বাগতিকরা মধ্যাহ্নভোজে যায় ৮৬/১-এ। রবি শাস্ত্রী বলে দেন, ‘লাঞ্চের পর এ উইকেটে ব্যাট করা একেবারে সহজ। এখন একটাই কাজ পেটাও।’ টেস্ট ক্রিকেটে পেটাও কাজটাই কোহলিরা করলেন অনায়াসে। শুরুতে গুটিয়ে থাকা স্বাগতিক ব্যাটসম্যানরা ক্রমশ নিজেদের মেলে ধরেন সফরকারী ফিল্ডারদের শৈথিল্যের সুযোগ নিয়ে। ক্যাচ মিসের মহড়ায় সাকিব, মুমিনুল, মুশফিকরা যোগ দিয়েছেন ‘অনায়াস দক্ষতায়’। আগেই বলা হয়েছে, দিনের সবচেয়ে সহজতম সুযোগ নষ্ট করেন মিরাজ ঠিকমতো বলটা ধরতে না পেরে। সুযোগ কাজে লাগাতে কার্পণ্য করেননি ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে এমন সহজ সুযোগ মিস হতে দেখে তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে রান করার দিকে মনোযোগী হন। দিনের দ্বিতীয় সেশনে ১২০ রান ওঠে ৩১ ওভারে। ৫১তম ওভারে পূজারা মিরাজকে চার মেরে ভারতের প্রথম শ্রেণীর ঘরোয়া মৌসুমে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড ভেঙে দেন। ১৯৬৪-৬৫-তে চান্দু বোর্দের ১৬০৪ রান টপকে যান পূজারা। পরের বলেই অবশ্য মিরাজের শিকারে পরিণত হন তিনি। ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা আজিংকা রাহানে ৬০ বলে ৪৫* করার পথে ১২২ রানের জুটি গড়েন কোহলির সঙ্গে। মিরাজ ও তাইজুল ভালো বোলিং করেছেন। দু’জনে সমান ২০ ওভার বল করে নিয়েছেন একটি করে উইকেট।
প্রথম দু’দিন ব্যাটিং সহায়ক পিচে তৃতীয় দিন থেকে স্পিন ধরবে। হায়দরাবাদে বাংলাদেশের জন্য কী অপেক্ষা করছে তা সহজেই অনুমেয়।

Add Comment

Click here to post a comment