মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

প্রথমবার নিজের পুরো নাম লেখেননি নিয়াজি

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার সময় পাকিস্তানি সেনা অধিনায়ক এ এ কে নিয়াজি প্রথমবার তাঁর পুরো নামটি লেখেননি। নিজের নাম তিনি লিখেছিলেন ‘নিয়া’। তাঁকে দিয়ে আবার পুরো নামটি লেখানো হয়েছিল। এই বিবরণ উঠে এসেছে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক ভাইস অ্যাডমিরাল এন কৃষ্ণানের স্মৃতিচারণামূলক বই নো ওয়ে বাট সারেন্ডার–এ:

আমরা বেলা দুইটার সময় অ্যাভরো বিমানে চড়ে দমদম থেকে আগরতলার উদ্দেশে উড়াল দিলাম। সেখানে অপেক্ষমাণ হেলিকপ্টারে চড়ে বসলাম। চারটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারে চড়ে বসলেন তিন বাহিনীর প্রধানেরা এবং লে. জেনারেল সগত সিং। অন্যদিকে পাঁচটি এমআই-ফাইভ হেলিকপ্টারে উঠে বসলেন বিপুলসংখ্যক ভারতীয় ও বিদেশি সংবাদ প্রতিনিধি ও ক্যামেরাম্যান। নৌবাহিনীর প্রতিনিধিদের মধ্যে কলকাতার দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আর পি খান্না ও আমার ফ্ল্যাগ লেফটেন্যান্ট জে এস কারপে ছিলেন।

বিকেল চারটার দিকে আমরা তেজগাঁও বিমানবন্দরে নামলাম। সেখানে লে. জেনারেল নিয়াজি, মে. জেনারেল ফরমান আলি খান ও রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ আমাদের অভ্যথর্না জানালেন। শরিফ ছিলেন সাবেক ডাফেরিন ক্যাডেট, যিনি ছিলেন আবার একজন দূরপাল্লা যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি পূর্ব পাকিস্তান নৌবাহিনীর ফ্লাগ অফিসার কমান্ডিং ছিলেন। ভারতীয় (পূর্বাঞ্চলের) সেনা কমান্ডারের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব ইতিমধ্যে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। তিনি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি দেখাশোনা করছিলেন।

উড়ে এসে দেখলাম, ঢাকায় যুদ্ধের তেমন চিহ্ন নেই, এতে আমি বেশ খুশিই হলাম। ভাবলাম, নিয়াজি যদি বোকার মতো যুদ্ধ চালিয়েই যেতেন, তাহলে এই শহরে কী ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটে যেত। তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়েতে বেশ কটি গোলা পড়েছিল, তাতে সেখানে গর্ত সৃষ্টি হয়, ফলে আমাদের হেলিকপ্টারে করেই আসতে হয়।

আমরা সেখান থেকে সরাসরি শোভাযাত্রাসহকারে রেসকোর্স ময়দানে চলে যাই। পথে বিপুলসংখ্যক যানবাহনের কারণে আমাদের যাত্রা ব্যাহত হয়, সে বাহনগুলো মানুষে একদম ঠাসা ছিল। সবাই সেই ঐতিহাসিক স্থানের দিকে যাত্রা করছিল। আমাদের গাড়িটি চালাচ্ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন নাবিক, যেখানে রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. শরিফও ছিলেন। আমাদের ফ্ল্যাগ লেফটেন্যান্টরাও সঙ্গে ছিলেন।

ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে এই আত্মসমপর্ণ অনুষ্ঠান হয়, যেখানে নয় মাস আগে শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। ময়দানে তখন উৎফুল্ল জনতা গিজগিজ করছে, তারা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে চারদিক কাঁপিয়ে তুলছিল। একই সঙ্গে তারা ‘জয় ইন্দিরা’ ধ্বনিও তুলছিল। জেনারেল অরোরা ভারতীয় ও পাকিস্তানি সেনাদের সৃষ্ট গার্ড পরীক্ষা করে দেখছিলেন। আমরা যেন মানবসমুদ্রে ডুবে গেলাম। আমি তখন পাকিস্তানি অ্যাডমিরালের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকৃত অর্থেই শঙ্কিত হয়ে উঠি, যাঁর নিরাপত্তার ভার আমার ওপরই ন্যস্ত ছিল। সৌভাগ্যবশত, তিনি কালো পোশাক পরিহিত ছিলেন, ফলে তাঁকে সহজে চেনা যাচ্ছিল না, যদিও আমার সাদা উর্দি সহজেই চিহ্নিত করা যাচ্ছিল। আমরা এ ব্যাপারে মনোযোগী ছিলাম। তবে ভিড়ের মধ্য দিয়ে ঠেলে অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়ার পথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপার ঘটেনি। ময়দানের মাঝখানে একটি ছোট টেবিল ও দুটি চেয়ার রাখা হয়েছিল। বসে থাকা দুই প্রতিপক্ষের পেছনে আমরা দুজন—দেওয়ান [পূর্বাঞ্চলীয় বিমানবাহিনী প্রধান] ও আমি। সামনে শত শত সংবাদকর্মী ও ক্যামেরা, আর চারদিকে হাজার হাজার মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর মধ্যেই সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ উপস্থিত। মোটা সাদা কাগজে দলিলের ছয় কপি প্রস্তুত করা হয়েছিল, যেখানে পাকিস্তানের সকল সেনা ও নৌবাহিনী এবং আধা সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক পুলিশ বাহিনীর আত্মসমর্পণের শর্তাবলিও লেখা ছিল। তাদের যে যেখানে আছে, সেখানে জেনারেল অরোরার বাহিনীর কাছে অস্ত্র নামিয়ে আত্মসমপর্ণ করতে হবে।

প্রথম কপিটি স্বাক্ষর করা হলো। প্রথমে অরোরা, তারপর নিয়াজি। আবেগের বশেই হোক বা ইচ্ছাকৃত, নিয়াজি স্বাক্ষরে পুরো নাম লিখলেন না। তিনি লিখলেন ‘এ. এ. কে. নিয়া’। আমি জেনারেল অরোরাকে বিষয়টি জানালে তিনি নিয়াজির সঙ্গে কথা বলেন।

নিয়াজি পুরো স্বাক্ষর করেন আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক দানবীয় নিপীড়কের হাত থেকে মুক্ত হয়, যে দানব লুটপাট ও ধর্ষণ চালিয়েছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, লাখ লাখ গরিব, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। এসব চিন্তা যখন আমার মনে ভিড় করছিল, তখন জেনারেল নিয়াজি বাষ্পরুদ্ধ হয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলেন আর কাঁধের এপোলেট খুলে রিভলবারের গুলি বের করে অরোরার হাতে দিলেন। এরপর পূর্ণ আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে তিনি জেনারেলকে অভিবাদন জানালেন। এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হলো।

বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার আগে আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ হলো। পূর্ব পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ আমার কাছে এসে বললেন, ‘অ্যাডমিরাল কৃষ্ণান, স্যার, শিগগিরই আমাকে নিরস্ত্র করা হবে। আপনাদের নৌবাহিনী দারুণ লড়াই করে আমাদের সর্বত্র কোণঠাসা করে ফেলেছিল, তাই আমি ইস্টার্ন ফ্লিটের সি-অ্যান্ড-সির কাছে অস্ত্রসমপর্ণ করতে চাই।’ এরপর তিনি হোলস্টার খুলে চীনের তৈরি রিভলবার ও গোলাবারুদের একটি ক্লিপ আমার কাছে জমা দিলেন।

এদিকে যখন রেসকোর্সে বড় নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছিল, তখন বাড়িতে আমার স্ত্রী জানতেন না যে এত বড় পটপরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার সচিব যখন তাঁকে বিকেলের দিকে বললেন, আমি ঢাকা গেছি, তখন তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এই আত্মসমপর্ণ একটি লোক দেখানো চাতুরী, আর বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে এনে কতল করবে। আমি তাঁর মর্মবেদনা কল্পনা করতে পারি। পরবর্তীকালে তিনি আমাকে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন লোকসভায় ঘোষণা দিলেন, আত্মসমর্পণের দলিল সই হয়েছে, সেই মুহূর্তটি ছিল তাঁর জীবনের সেরা মুহূর্ত।

ভিডিওঃ শিক্ষকের সঙ্গে মা ও মেয়ের অবৈধ সম্পর্ক! (ভিডিও)

Add Comment

Click here to post a comment