অন্যরকম খবর

পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি আরব কতটা শক্তিশালী দেশ?

মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি আরব। আর এশিয়া মহাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। দেশটির উত্তরে জর্দান ও ইরাক, পূর্বে পারস্য উপসাগরের কূল ঘেঁষে রয়েছে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ-পূর্বে ওমান ও দক্ষিণে ইয়েমেন। পশ্চিমে লোহিত সাগর, যার ওপারে রয়েছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসর ও সুদান। সৌদি আরব একমাত্র দেশ যার পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের উপকূল রয়েছে।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আরব ভূখণ্ডে সোয়া লাখ বছর আগে মানববসতি স্থাপিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আর আধুনিক মানুষের বসবাস তাও প্রায় ৭৫ হাজার বছর আগে থেকে। তবে আধুনিক সৌদি রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৩২ সালে। আবদুল আজিজ ইবনে সৌদি দীর্ঘ যুদ্ধের পর পিতৃপুরুষের হারানো ভূখণ্ড উদ্ধার করেন। ১৮৯০ সালে ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর থেকে তারা নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। রিয়াদ জয় করার আগ পর্যন্ত তারা নিজেদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত ছিলেন। বাইরে থেকে শক্তি সঞ্চয় করে ১৯০২ সালে ১৫ জানুয়ারি রিয়াদ আক্রমণ করেন এবং দখল করে নেন আবদুল আজিজ। এরপর পরবর্তী ত্রিশ বছরে ধীরে ধীরে একটির পর একটি অঞ্চল জয় করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের আনুকূল্য পান তিনি যার ফলে শাসন টিকিয়ে রাখা ও নতুন অঞ্চল জয় করা সহজ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলে হেজাজ জয়। মক্কা, মদিনা ও জেদ্দা এই অঞ্চলের অন্তুর্ভুক্ত।

১৯২৫ সালে হাশিমি গোত্রের শেষ শাসক শরিফ হোসাইনের কাছ থেকে মক্কা দখল করেন। ১৯২৬ সালে আবদুল আজিজকে বাদশাহ হিসেবে মেনে নেন হেজাজের নেতারা। ১৯৩২ সালে হেজাজ, নজদ, আল হাসা ও আসির অঞ্চল নিয়ে সৌদি আরব রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন আবদুল আজিজ। নিজেই হন নতুন রাজ্যর বাদশাহ। বিস্তীর্ণ ও বিক্ষিপ্ত একটি অঞ্চলকে একত্র করে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসার পেছনে আবদুল আজিজের দূরদর্শিতা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে প্রচণ্ড রকম সামরিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা ছিল তার। স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলের শাসকদের অনেকেই তার অধীনতা শিকার করেন। পশ্চিমারাও আবদুল আজিজকেই প্রাধান্য দিয়েছিল আরব ভূখণ্ডের নেতা হিসেবে।

শাসনব্যবস্থা
সৌদি আরবে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু আছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের বংশধররা পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করছেন। রাষ্ট্র, সরকার ও সশস্ত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা বাদশাহ। বর্তমান বাদশাহর নাম সালমান বিন আবদুল আজিজ। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব নেন। এ ছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও রাজপরিবারের সদস্য যেমন বাদশাহর ছেলে, ভাই, ভাতিজারা দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী উত্তরাধিকার হিসেবে একজন ক্রাউন প্রিন্স মনোনীত করা হয়। বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স বাদশাহরই ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান।

শাসনব্যবস্থার দিক থেকে সৌদি আরবে ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু। সব আইনের প্রধান উৎস কুরআন ও রাসূলের হাদিস। যেকোনো আইন প্রণয়ন হয় এর আলোকেই। কুরআনই দেশটির সংবিধান। ইসলামের বিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার, পরামর্শ ও সাম্য সরকার পরিচালনার মূলনীতি। বাদশাহ কর্তৃক নিয়োগকৃত ১৫০ সদস্যের মজলিশে সুরা আইন প্রণয়নের বিষয়ে বাদশাহ কাছে প্রস্তাব করে। বাদশাহ আইন পাস করার এক ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। আইন প্রণয়নে সহযোগিতা করে মন্ত্রিসভাও।

অর্থনীতি
সৌদি আরবের অর্থনীতির মূলত তেলনির্ভর। দেশটির জাতীয় বাজেটের ৭৫ শতাংশ এবং রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশ আসে তেল থেকে। সমগ্র বিশ্বের ভূগর্ভের অভ্যন্তরে খনিজ তেলের যে মজুদ রয়েছে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগই সৌদি আরবে, পরিমাণে যা ২৬ হাজার কোটি ব্যারেল। তেল ছাড়াও দেশটির রয়েছে গ্যাস ও স্বল্পপরিসরের স্বর্ণখনি। মাথাপিছু আয় ও মোট জাতীয় উৎপাদনের হিসেবে সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১১টি ধনী দেশের একটি। আর বৃহত্তর অর্থনীতির দেশগুলোর তালিকায় দেশটির অবস্থান ২০ নম্বরে। সৌদি শ্রমবাজার প্রায় পুরোটাই বিদেশীদের ওপর নির্ভরশীল। তেল ক্ষেত্রগুলোর ৮০ শতাংশ শ্রমিক বিদেশী। তেল ছাড়াও দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে কৃষি। কৃষির মধ্যে রয়েছে খেজুর চাষ ও পশুপালন। প্রতি বছর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে কৃষিকাজে নাগরিকদের উৎসাহিত করে সরকার। দেশটিতে প্রতি বছর হজ করতে আসেন ২০ লাখ মুসলিম যেটি একই সাথে সৌদি আরবের পর্যটন ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সামরিক শক্তি
সামরিক শক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের পরিসংখ্যানে সামরিক শক্তির দিক থেকে বিশ্বে সৌদি আরবের অবস্থান ২৪তম। অতীতে সৌদি আরব কোনো সামরিক দ্বন্দ্বে না জড়ালেও ধীরে ধীরে তারা এই নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বাইরে সামরিক পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে সৌদিকে। ইয়েমেনে হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ও সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অর্থ ও যুদ্ধসরঞ্জাম সহায়তা এই পদক্ষেপের বড় দু’টি প্রমাণ। কয়েক দশক ধরেই সৌদি আরবের শাসকদের কাছে সামরিক শক্তির বৃদ্ধির বিষয়টি খুব গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত তারা সমৃদ্ধ করছে অস্ত্রসহ যুদ্ধের নানান উপকরণ। নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা না থাকলেও আমদানি করে সমৃদ্ধ করছে অস্ত্র ভাণ্ডার। মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তির দিক থেকে সৌদি আরব শীর্ষস্থানীয়। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ সৌদি আরব অর্থনৈতিক সচ্ছলতার কারণে প্রচুর অস্ত্র কিনছে। প্রতি বছরই বাড়ছে এর পরিমাণ।

সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (এসআইপিআরআই) জানিয়েছে, বিশ্বে অস্ত্র কেনার হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে সৌদি আরব। ভারতের পরই সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কিনছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সৌদি আরব। গত মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরবে আসেন। এসয় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বিষয়ে ১১ হাজার কোটি টাকার একটি চুক্তি করে। প্রতিবেশী দেশ ইরানের সাথে সৌদি শাসকদের একটি অলিখিত প্রতিযোগিত চলছে কয়েক দশক ধরেই। ব্যবসায় বাণিজ্য ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এই প্রতিযোগিতার মূল বিষয় হলেও উভয় পক্ষই দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে। সৌদি আরবের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির আগ্রহকে ইরানের সাথে প্রতিযোগিতার কারণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

দেশটির সামরিক বাহিনীর মোট জনশক্তি চার লাখ ৭৮ হাজার। এর মধ্যে সৈন্য আড়াই লাখের বেশি। এ ছাড়া রিজার্ভ সৈন্য আছে আরো ২৫ হাজার। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী ছাড়াও দেশটির রয়েছে এয়ার ডিফেন্স, স্ট্র্যাটেজিক ফোর্স ও ন্যাশনাল গার্ড নামে পৃথক বাহিনী। বিশ্বের চারটি দেশে সৈন্য মোতায়েন আছে তাদের। আকাশপথে শত্রুর মোকাবেলার জন্য ফাইটারসহ হামলা চালাতে সক্ষম এমন বিমান রয়েছে চার শতাধিক। সামরিক হেলিকপ্টার ২২৭টি, প্রশিক্ষণ বিমান রয়েছ ২৪৩টি। স্থলযুদ্ধের জন্য আছে ১১৪২টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান আছে ৫ হাজার ৪৭২টি, অটোমেটিক ও সাধারণ কামান মিলে রয়েছে মোট ৯৫৪টি। এ ছাড়া রকেট প্রজেক্টর আছে ৩২২টি। সামরিক নৌযানের মধ্যে সৌদি আরবের রয়েছে ৭টি ফ্রিগেট, ৪টি কর্ভেটস, ১১টি টহল সামরিক জাহাজ ও ৩টি মাইন অপসারণ যান। সৌদি আরবের সর্বশেষ সামরিক বাজেট ৫ হাজার ৬৭২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার।

জীবনযাত্রা
নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান খুবই উন্নত। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সব কিছুই সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। মরুভূমির দেশ হওয়ার কারণে পানির স্বল্পতার রয়েছে দেশটিতে। প্রতিটি বাড়িতে পানি পৌঁছে দেয়া হয় সরকারি ব্যবস্থাপনায়। সামুদ্রিক পানি লবণমুক্ত করে ও ভূগর্ভ থেকে তুলে পানির চাহিদা মেটানো হয়। পারস্য উপসাগর থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের রিয়াদের পরিশোধন কেন্দ্রে পানি নেয়া হয় পাইপলাইনের মাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই উন্নত। শাসনব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগের কারণে নাগরিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি নির্ঝঞ্ঝাট। সব শিক্ষাব্যবস্থা বিনা মূল্যের। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার খুব গুরুত্ব দেয়া হয় আরবে। পুরুষদের ৯০ ও নারীদের মধ্যে ৮১ শতাংশ শিক্ষিত। বিলাসী জীবনযাপনের বদনামও রয়েছে সৌদি নাগরিকদের। নাগরিকদের ছোট্ট একটি অংশ আর্থিকভাবে অসচ্ছল বলে জানা যায়। তবে এ ব্যাপারে সরকারিভাবে কোনো তথ্য সরবরাহ হয় না।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেশটিতে নেই বললেই চলে। সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো সবই সরাসরি সরকার নিয়ন্ত্রিত। রাজপরিবারের সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বা অন্য কোনো শাসনব্যবস্থার পক্ষের মতগুলোকে কঠোরহস্তে দমন করা হয়। সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা উদ্বেগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে সৌদি আরবে।

ফুটবলে সৌদি আরব এশিয়ার অন্যতম শক্তি। প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই খেলার সুযোগ পায় দলটি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিকেট খেলাও শুরু হয়েছে। ক্রিকেটে অবশ্য উপমহাদেশের অভিবাসীদের আধিপত্য। শালীন সাংস্কৃতিক চর্চাও আছে দেশটিতে।