জাতীয়

নেটওয়ার্ক রেলওয়ের, টাকা লুপাটে ব্যস্ত গ্রামীণফোন

ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক রেলওয়ের। অথচ অবৈধভাবে সেই নেটওয়ার্ক ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। তাদের সঙ্গে রেলওয়ের চুক্তি অনুযায়ী নিজেরা ব্যবহার করা ছাড়া এই ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক কারো কাছে তারা ভাড়া দিতে পারবে না। অথচ বহু প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি ভাড়া দিচ্ছে গ্রামীণফোন। গত ৭ বছর ধরে মামলার ফাঁদে ফেলে রেলওয়েকেও কোন টাকা পরিশোধ করছে না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, তাদের পাওনা ৩শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জানা গেছে, চুক্তির অজুহাতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প ইনফো সরকারেও সংযোগ দিতে বাধা দিচ্ছে গ্রামীণফোন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালের ২৬ জুন গ্রামীণফোনকে একটা চিঠি দেয় রেলওয়ে। সেখানে তারা গ্রামীণফোনের কাছে বর্ধিত চার্জ বাবাদ ৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করে। এরপর ২৪ জুলাই আদালতে মামলা করে গ্রামীণফোন। সেই থেকে কোন টাকাই রেলওয়েকে দিচ্ছে না গ্রামীণফোন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত রেলওয়ে এক হিসাব করে দেখিয়েছে, তাদের পাওনা ৯৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের শেষে সব মিলিয়ে রেলওয়ের পাওনা ৩শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এখন গ্রামীণফোনের কাছ থেকে কোন টাকাই পাচ্ছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ২০ বছর আগে রেলওয়ের সঙ্গে একটা চুক্তি করে গ্রামীণফোন। সেই চুক্তির আলোকে রেলওয়ের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক তারা ব্যবহার করছে। এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করছে তারা। তাদের এই চুক্তির মেয়াদ ২৬ বছর। গ্রামীণফোন যখন রেলওয়ের সঙ্গে চুক্তি করে তখন দেশে কোনো এনটিটিএন (ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) লাইসেন্স ছিল না। সরকার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এনটিটিএন লাইসেন্স দিয়েছে। এগুলো হলো ফাইবার অ্যাট হোম, সামিট কমিউনিকেশন, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ লি.) ও বিটিসিএল (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লি.)।

বাংলাদেশ রেলওয়ে এনটিটিএন লাইসেন্স পাওয়ার পর অন্য যে কেউ তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে পারবে। কিন্তু রেলওয়ের সঙ্গে গ্রামীণফোনের অসম চুক্তির ফলে রেলওয়ে অন্য কাউকে এই সেবা দিতে পারছে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প ইনফো সরকারের সংযোগ দিতে দিচ্ছে না গ্রামীণফোন। বিটিআরসি বলছে, রেলওয়ে যখন লাইসেন্স পেয়েছে তখন গ্রামীণফোনের সঙ্গে তাদের চুক্তি আপনাআপনি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা হয়নি। প্রতি মিটার ফাইবার অপটিকের সরকার অনুমোদিত লিজ রেট যেখানে দুই টাকা, সেখানে গ্রামীণফোন রেলওয়েকে ফাইবার অপটিক লিজ বাবদ দিচ্ছে মাত্র ৬৮ পয়সা। এটাই চলছে বছরের পর বছর।

চুক্তি অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোনো অপারেটরের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা, ভাড়া ও লিজ দেওয়া কিংবা সংস্কার করা গুরুতর অপরাধ। এই আইন লঙ্ঘন করলে ৩০০ কোটি টাকা জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। অথচ গ্রামীণফোন লাইসেন্স ছাড়াই বহু প্রতিষ্ঠানের কাছে এই নেটওয়ার্ক ভাড়া দিয়েছে।

একটি এনটিটিএনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকার ইতিমধ্যে পাঁচটি অপারেটরকে এনটিটিএন লাইসেন্স দিয়েছে। তারা এরই মধ্যে এই খাতে বিপুল অংকের টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছে। তিন কোটি টাকা লাইসেন্স ফিসহ ১০ কোটি টাকা সরকারের ফান্ডে জমা রেখেছে। এই অবস্থায় লাইসেন্স ছাড়াই একটি কোম্পানি কীভাবে তাদের ট্রান্সমিশন অন্যের কাছে ভাড়া দিচ্ছে? এটা তো অপরাধই। এদিকে বিটিআরসির নজর দেওয়া দরকার।

তবে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রেলওয়ের সঙ্গে তাদের সব লেনদেন আইনসঙ্গতভাবেই হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে গ্রামীণফোনকে প্রাথমিকভাবে ২০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। পরে এক সংশোধনীর মাধ্যমে লিজের মেয়াদ আরো ১০ বছর বাড়ানো হয়। লিজ চুক্তির অংশ হিসেবে গ্রামীণফোন এরই মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার ফাইবার নতুনভাবে স্থাপন করেছে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ নেই।

সূত্র জানায়, গ্রামীণফোনের চেয়ে আরো বেশি দামে রবিসহ বেশ কয়েকটি টেলিকম অপারেটর রেলওয়ের এ নেটওয়ার্ক ভাড়া নিতে চেয়েছিল। কিন্তু চুক্তির অজুহাতে অন্য কাউকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ফাইবার লে আউটের বিধান লঙ্ঘন করেছে গ্রামীণফোন। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়াই গ্রামীণফোন রেলওয়ের ছয় কোরের ফাইবার ফেলে দিয়ে ৪৮ কোরের ফাইবার লে আউট করেছে। সেখান থেকে তারা তৃতীয় পক্ষের কাছে ফাইবারের ক্যাপাসিটি বিক্রি করছে। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ।

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য-

গতকাল প্রকাশিত ‘গ্রামীণফোনের গ্রাহকসেবা এখন তলানিতে’ শীর্ষক সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, গ্রামীণফোন তার গ্রাহকদের মানসম্পন্ন সেবা দেয়ার জন্য নিয়মিত নেটওয়ার্ক উন্নয়নে বিনিয়োগ করে থাকে। অন্য অপারেটরদের বাদ দিয়ে শুধু গ্রামীণফোন নিয়ে এ ধরনের প্রতিবেদন দুরভিসন্ধিমূলক। এছাড়া অপ্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে সম্পাদকীয় প্রকাশ খুবই দুঃখজনক এবং অনৈতিকতার পরিচায়ক।

প্রতিবেদকের বক্তব্য: গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য উপাত্ত নিয়েই প্রতিবেদন করা হয়েছে।
সূত্র: ইত্তেফাক

জুমবাংলানিউজ/এসওআর