অপরাধ-দুর্নীতি চট্টগ্রাম জাতীয় স্লাইডার

নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার যে লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন নুর ও শাহাদাত

জুমবাংলা ডেস্ক:  ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

গত রবিবার রাতে এ দুই আসামি ফেনীর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। কারা, কোথায় হত্যার পরিকল্পনা করে, কীভাবে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয় এবং পুরো ঘটনায় কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে, সেসবের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে তাদের জবানবন্দিতে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষে আন্দোলন করতে ও নুসরাতের শরীরে ছদ্মবেশে আগুন দিতে বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদ আলম নুর উদ্দিন ও শাহাদাতকে ১০ হাজার টাকা দেন। মাদ্রাসার এক শিক্ষক দেন পাঁচ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার টাকা নেয় নুর উদ্দিন। তিনটি বোরকা কেনার জন্য শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে কামরুন নাহার মণিকে দেওয়া হয় দুই হাজার টাকা। ৬ এপ্রিল সকাল ৮টার দিকে শাহাদাত সোনাগাজী বাজারে যায়। তখন ওই মেয়ে তাকে দুটি নতুন ও একটি পুরনো বোরকা দিয়ে যায়। শাহাদাত পলিথিনে করে এক লিটার কেরোসিন কেনে।

নুর উদ্দিন ও শাহাদাত আদালতে স্বীকার করেছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল সকাল সোয়া ৯টার দিকে শাহাদাত, জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ও কামরুন নাহার মণি বোরকা পরে ছাদে অবস্থান নেয়। উম্মে সুলতানা পপি অবস্থান নেয় মাদ্রাসা চত্বরে। পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট আগে নুসরাতকে পপি জানায়, ছাদে নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। নুসরাতের ওপর যৌন নির্যাতনের সাক্ষী ছিল নিশাত। এ খবর শুনে নুসরাত ছুটে যান ছাদে। পপিও তার পেছনে ছাদে উঠে আসে। ছাদে নিশাতকে খোঁজাখুঁজি করেন নুসরাত। না পেয়ে ছাদে দাঁড়ান। এ সময় উম্মে সুলতানা পপি এবং ছাদে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া অন্যরা নুসরাতকে ঘিরে ধরে। তাকে মামলা তুলে নিতে বলে পপি। এরপর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে মণিও একই কথা বলে নুসরাতকে। নুসরাত জবাবে বলেছিলেন, তিনি মামলা তুলবেন না। তার গায়ে অধ্যক্ষ কেন হাত দিয়েছিল। ওস্তাদ তো ওস্তাদ। তিনি এর শেষ দেখেই ছাড়বেন বলে তাদের জানিয়েছিলেন। তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদে শাহাদাত জানিয়েছে, মামলা তুলতে রাজি না হওয়ায় সে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরে এবং অপর হাত দিয়ে একটি হাত ধরে। শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে শরীর চেপে ধরে। পপি ধরে নুসরাতের পা। এরপরই তারা নুসরাতকে ছাদে চিত করে শুইয়ে ফেলে। এ সময় কৌশলে উম্মে সুলতানা পপিকে তারা শম্পা বলে ডাক দেয়। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করেন নুসরাত। চিৎকারও করেন তিনি। নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলে জোবায়ের। এরপরই জাবেদ তার গলা থেকে পা পর্যন্ত এক লিটার কেরোসিন ঢেলে দেয়। পলিথিনে করে এই কেরোসিন আনা হয়েছিল। এরপর দেশলাই বের করে কাঠি জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় নুসরাতের পায়ের দিকে। তার শরীরে আগুন জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে ওই পাঁচজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। নামার সময় শাহাদাত, জোবায়ের ও জাবেদ বোরকা খুলে ফেলে। পপিসহ দুই তরুণী মাদ্রাসায়ই তাদের পরীক্ষার কক্ষে চলে যায়। তারা নামার সময়ও নুসরাতের আর্তনাদ শুনতে পায় তারা। তার পা ও হাতের বাঁধন আগুনে পুড়ে খুলে যায়। নুসরাতের মুখ শাহাদাত চেপে ধরে থাকায় সেখানে কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি। আগুন দেওয়ার আগে তারা প্রত্যেকে হাতে-পায়ে মোজা লাগিয়ে নিয়েছিল।

জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন ও শাহাদাত পৃথকভাবে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। নুসরাতকে ২০১৭ সালে প্রেমের প্রস্তাব দেয় নুর উদ্দিন। প্রত্যাখ্যান করায় সে সময় মাদ্রাসা থেকে বাসায় ফেরার পথে নুসরাতের চোখেমুখে চুন ছুড়ে মারে সে। শাহাদাতও প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল নুসরাতকে। তার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে নুসরাত। এ কারণে তারা দু’জনই নুসরাতের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।

পিবিআইর পরিদর্শক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানান, নূর উদ্দিন ও শাহাদাতের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সিরাজের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ও নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পর যারা ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে ও ঘটনা ধামাচাপা দিতে অর্থের জোগান দেয়, তাদের নাম-ঠিকানা পিবিআইর হাতে রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জুমবাংলানিউজ/এইচএম