মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

নিরপেক্ষ নির্বাচনই প্রত্যাশা-মুনিরা খান

আগামী ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীসহ মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এ ছাড়া কাউন্সিলর পদে ১৫৬ ও নারী কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন প্রার্থী রয়েছেন। গতবারের মেয়র নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনের কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। যেমন—এবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই প্রার্থী দিয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে নৌকা প্রতীক নিয়ে সেলিনা হায়াত আইভী ও বিএনপির পক্ষে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সুতরাং বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, এবার নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে প্রধানত দলীয় ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা হবে।

দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হওয়ার কারণে ভোটাররা প্রার্থীর চেয়ে প্রতীক দেখে ভোট দেবে বলেই অনেকে আশা করছেন। সাধারণত স্থানীয় নির্বাচনে যে ভোটারদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য থাকে না, তারা একটু অন্যভাবে চিন্তা করে। দলের প্রতি বাধ্য না থাকলে অন্য বিবেচনা থেকে প্রার্থী নির্বাচন করাটাই স্বাভাবিক। এই ভোটাররা চায় এলাকার উন্নয়ন। নাগরিক জীবনের সমস্যার সমাধান—বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, যাতায়াত, রাস্তাঘাট ইত্যাদির উন্নয়ন। এলাকার সমস্যা সমাধানে অতি দ্রুত নির্বাচিত প্রার্থীকে পাওয়া। অর্থাৎ সহজভাবে বললে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় অধিকারটুকুই পাওয়ার কথাই ভোটাররা বিশেষভাবে ভাবে। যেটা সাংবিধানিকভাবে নাগরিকদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সেই ন্যূনতম প্রত্যাশা পূরণ করার লক্ষ্য হিসেবে ভোটাররা স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন করে থাকে। তাই নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে কে কত ভালোভাবে তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে পারবেন সেদিকে।

এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনের মধ্যে সব সময়ই কিছু পার্থক্য থেকে যায়। ভোটাররা জানে এই নির্বাচনে সরকার বদল হবে না। তাই ভোটাররা চায় নির্বাচনের জন্য ম্যানিফেস্টো দেখে ভোট দিতে। দুই পক্ষের পার্টি অনুগত ভোটাররা তাদের পার্টির প্রার্থীকেই ভোট দেবে—সেখানে যেই জয়ী হোন না কেন। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনেও এবার এটা আশা করা যায়। এ ছাড়া নানা হিসাব-নিকাশ আছে; যেমন প্রার্থীদের নিজস্ব সুনাম, যোগ্যতা, দক্ষতা, ব্যক্তিগত সামর্থ্য ইত্যাদি।   সেলিনা হায়াত আইভী গতবারের নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। ফলে ভোটাররা হয়তো তাঁর আগের কাজের মূল্যায়ন করবেন। পারা না পারার একটা সমীকরণ টানবেন। আর বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে খুব বেশি পরিচিত নন। সুতরাং তাঁর নিজেকে পরিচিত করার জন্য ভোটারদের বেশি সময় দিতে হবে।

গতবার সেলিনা হায়াত আইভীর কোনো দলীয় প্রতীক না থাকায় সবাই তাঁকে নিজের দলের লোক বলে মনে করেছে। সে সময় নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের মধ্যে দলীয় বিভক্তি ছিল। ফলে অন্যান্য দলের সমর্থন আইভীর প্রতি ছিল। এবার আওয়ামী লীগের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি নেই। তাই এবার অন্যান্য পার্টির সমর্থন আইভীর প্রতি নেই। তাই দেখার বিষয় কোন দিকের সমর্থন বেশি পড়বে, কোন দিকে পাল্লা ভারী হবে!

কয়েক দিন আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মতবিনিময় হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রার্থীদের সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো প্রার্থীই নির্বাচন কমিশনের কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি। এর আগে বিএনপির দিক থেকে নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটা নাকচ করে দিয়েছে। সাধারণত আমরা দেখতে পাই, নির্বাচনে যে পক্ষ বিরোধী দলে থাকে তাদের দিক থেকেই দাবি থাকে সেনা মোতায়েন করার। গতবার আইভীও এই দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি এ দাবি নাকচ করছেন। আমরা নির্বাচন কমিশনকে এ দিকটির প্রতি বিশেষ নজর দিতে বলব যে নির্বাচনের আগেই যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সন্তোষজনক অবস্থা নজরে আসে। তারা যেন এখন থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে এবং নির্বাচনের আগেই সেটা নিশ্চিত করে।

নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই ‘মানি, মাসল ও ম্যানিপুলেশন’—এই তিন দিকে নজর রাখতে হবে। এবার কাউন্সিলর পদে ১৫৬ ও নারী কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন প্রার্থী রয়েছেন। কিন্তু কাউন্সিলর প্রার্থীদের কোনো দলীয় প্রতীক নেই। ফলে সেখানে অর্থ বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। নির্বাচনে অর্থের ব্যবহার রোধ করতে কমিশনকে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা তত্পরতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কাছে ১২৬টি নালিশ এসেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এসব নালিশের বিপরীতে কমিশন শুধু অর্থ জরিমানা করেছে। সব নালিশের শাস্তি কি জরিমানা? আমরা কমিশনের প্রতি আস্থাবান। তারা অপরাধীকে প্রকৃত শাস্তি দেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নির্বাচনের দিন ও এর আগের দিন বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে। কোনো রক্তপাত, প্রাণহানি কাম্য নয়। নারায়ণগঞ্জের এই নির্বাচন কমিশনের শেষ নির্বাচন, সেহেতু তারাও সচেষ্ট ও সক্রিয় থাকবে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার প্রতি। সরকারও কমিশনকে সর্বতো সহায়তা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, ফেমা (ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স)

Add Comment

Click here to post a comment