মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

নাসিক নির্বাচন ও রাজনীতির সুবাতাস-এ কে এম শাহনাওয়াজ

দেশের মানুষের সচেতন অংশের দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আসন্ন নির্বাচনের দিকে। এ দেশের রাজনীতিতে বিশেষ করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নারায়ণগঞ্জের বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।

নিকট অতীতে দেশের নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে কোনো কোনো মহল বিতর্ক তুলেছে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা কথা উঠছে। ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন থেকেই বিরোধী দল নানা রকম শঙ্কা প্রকাশ করছে। এমন একটি অবস্থায় নাসিক নির্বাচনের আয়োজন হয়েছে। এই নির্বাচনকে বিএনপি টেস্ট কেস হিসেবে দেখার কথা ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগও নিজের অবস্থা পরখ করতে চাইছে। গত নাসিক নির্বাচন টান টান উত্তেজনায় কেটেছিল। সাধারণ গণমানুষের সমর্থন সন্ধান না করে আওয়ামী লীগ সেবার শামীম ওসমানকে তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ায় নারায়ণগঞ্জবাসী অনেকটাই অবাক হয়েছিল। সেলিনা হায়াত আইভী আওয়ামী লীগ ঘরানার মানুষ। অন্তত মেয়র নির্বাচনে তিনি দলীয় সমর্থন পাবেন—এমন আশা অনেকেই করেছিল। নির্বাচনের মাঠে শামীম ওসমানও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁকে এমপি নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত রেখে আইভীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়াটা স্বাভাবিক হিসাব হতো বলে তখন ধারণা প্রকাশ করেছিল অধিকাংশ মানুষ। শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে আইভীকে নাগরিকসমাজের পক্ষ থেকে দাঁড়াতে হয়েছিল।

এসব কারণে গত নির্বাচনটি টান টান উত্তেজনার ছিল। বিএনপির প্রার্থী প্রবীণ রাজনীতিক তৈমূর আলম খন্দকার আওয়ামী লীগ ঘরানার দুই বড় নেতার লড়াইয়ের ভেতর থেকে তেমন সুবিধা আদায় করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরে আসতে হয়। গত নির্বাচনে সেলিনা হায়াত আইভীর বিপুল ভোটে বিজয় ছিল সরল অঙ্কের স্বাভাবিক ফল।

এবার একই ভুল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, বিশেষ করে শেখ হাসিনা করেননি। তবে একটা ভুল হয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের—যাদের আজকাল তৃণমূল বলা হয়, তাদের মধ্য থেকে। তারা আইভীকে বাদ দিয়ে যেভাবে নামের তালিকা পাঠিয়েছিল, তা সুবিবেচনার হয়নি। ফলে তালিকাটি দলীয় সভানেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যৌক্তিক ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে অনেকের অভিমত। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের মধ্যে এই বিভাজন অনেক পুরনো। আমাদের দেশে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির ঘরানা পুরনো বিষয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের পরিবার নিজস্ব বলয় ভেঙে গণসম্পৃক্ত হওয়ার মতো যে আধুনিক চিন্তায় সম্পৃক্ত হওয়ার কথা, তেমন আধুনিক ও স্মার্ট হতে পারেনি অনেকেই। পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতিতে যে কারণে সংকীর্ণ আন্তবিরোধ থেকে যাচ্ছে। যা কারো জন্যই মঙ্গলের নয়।

এসব বিচারে এবার নাসিক নির্বাচনে সেলিনা হায়াত আইভী নৌকা মার্কা নিয়ে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। ফলে গতবারের মতো উত্তেজনা নেই। তবে এই দুশ্চিন্তা শুরু থেকে ছিল যে আওয়ামী লীগের আন্তবিরোধের কুপ্রভাব নির্বাচনে পড়ে কি না।

অনেকে মনে করে, কিছুকাল ধরে নিজস্ব রাজনৈতিক অঙ্গনের দুর্বলতার কারণে আত্মবিশ্বাস হারানো বিএনপি ক্রমাগত নির্বাচন বর্জন বা নির্বাচনের মাঠে থেকেও মাঝপর্বে সরে আসাটা একরকম রেওয়াজে পরিণত করেছিল। এসব কারণে প্রতিপক্ষ হিসেবে যেভাবে বিএনপিকে নিয়ে হিসাব কষার কথা ছিল, সেদিকে এখন সাধারণ মানুষের মনোযোগ তেমন একটা নেই। নেতৃত্বের ভুলে নির্বাচনের মাঠে বিএনপি এখন অনেকটা সাইডলাইনে দাঁড়ানো দল।

এসবের পরও নাসিক নির্বাচনে এবার বিএনপির অচলায়তন ভেঙে সাড়ম্বরে অংশগ্রহণ করাটা মানুষ ইতিবাচকভাবেই দেখছে। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপি নেতৃত্ব একটি সাহসী ভূমিকাই নিয়েছে বলে মনে হয়। সেলিনা হায়াত আইভীর বিপরীতে রাজনীতির মাঠে প্রায় অপরিচিত অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়াটা একটি চমক কি না তা এখনো বলা যাবে না। তবে এ ধরনের মনোনয়নে স্থানীয় রাজনীতিতে নিবেদিত রাজনীতিক ও কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। কোন্দলের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অবশ্য নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ক্ষেত্রে তেমনটি চোখে পড়ার মতো করে হয়নি। সম্ভবত জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির ছন্নছাড়া দশার কারণে অনেক বিএনপি নেতাই অর্থ ও শ্রমের অপচয় করতে চাননি। তবে যতটুকু জানা যায়, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত  রাজনীতিতে তেমনভাবে সম্পৃক্ত না থাকায় এখনো ব্যক্তি ইমেজে কালিমা জড়ায়নি। সে কারণে বিএনপির টিকিটে এলেও রাজনীতির মাঠে তিনি ততটা অপাঙক্তেয় নন। এ জন্য নির্বাচনের মাঠে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীই ভাবতে হবে।

নারায়ণগঞ্জে ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের ভিত মজবুত। তবে এখানকার আওয়ামী লীগ নেতারা যদি দাম্ভিকতার অচলায়তন ভেঙে গণমুখী হতে পারতেন, তবে আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেক বেশি সাবলীল হতো। ব্যক্তিগত অহমিকা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব কমিয়ে এনে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে এবং বিশেষ করে ভিন্ন ঘরানার রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য একটি অনুকরণীয় অঞ্চল হতে পারত নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জ থেকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি কমিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতৃত্বের সদিচ্ছাই যথেষ্ট বলে অনেকে মনে করে। এবার নির্বাচনের মাঠে এ প্রশ্নগুলো অনেকটাই সামনে চলে এসেছে।

নাসিক নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নির্বাচনী এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান। শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পার বন্দর এবং পশ্চিম পার নারায়ণগঞ্জ শহর নিয়ে সিটি করপোরেশনের এলাকা। আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ নির্বাচনী এলাকাটিও বন্দর ও নারায়ণগঞ্জ শহরের অনেকটা সীমারেখা নিয়ে। এই নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির সেলিম ওসমান। নিজ নিজ কর্মগুণে এমপি ও মেয়র উভয়েই দুই পারের সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর জন্য একটু অস্বস্তি হচ্ছে, নিকট অতীতে বিএনপির কেউ মেয়র বা সংসদ সদস্য না থাকায় সাফল্য প্রদর্শন করার সুযোগ পাননি। এমন ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন প্রতিপক্ষের ক্ষমতায় থাকার সময়ের ব্যর্থতা নির্বাচনে ব্যবহার করা যেত। সেই সুযোগ  অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের তেমন নেই। এ কারণে নির্বাচনী প্রচারে তিনি কেবল বলে যাচ্ছেন, ‘মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। ’

আমি নারায়ণগঞ্জের ছেলে। নাসিক নির্বাচন নিয়ে কিছু লেখার আগে কাছে থেকে অনুভব করার জন্য নারায়ণগঞ্জে গিয়েছিলাম। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের অবস্থা বিএনপির নেতাকর্মীদের মুখ থেকে শোনার ইচ্ছা ছিল। হয়তো আমার সময়ের স্বল্পতার কারণেই হবে, তেমন কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সেলিনা হায়াত আইভীর কর্মী ও সাধারণ পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাতে অধিকাংশের সাধারণ হিসাব, বন্দর অঞ্চলের ৮০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পাবেন আইভী। নারায়ণগঞ্জে সমর্থন পাবেন অন্তত ৬০ শতাংশের। নিশ্চয়ই বিএনপি ঘরানার কাউকে পেলে এ হিসাব হয়তো ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হতো।

তবে শুধু একান্ত আইভীর সমর্থক নয়, আওয়ামী লীগের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, নিজেদের ব্যক্তিগত দূরত্ব ভুলে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্ব যদি দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশমতো আইভীর পক্ষে কাজ করে, তবে আইভীর পক্ষে ভোটের হিসাব আরো বেড়ে যাবে। আইভীর সঙ্গে যতই বিরোধ থাকুক না কেন, দলীয় নির্দেশ—বিশেষ করে শেখ হাসিনার নির্দেশের বাইরে যাওয়ার কথা নয়। দেখলাম, অনেকের মধ্যে বেশ দ্বিধা কাজ করছিল। সাধারণ মানুষের এই মনোভাব আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অগোচরে ছিল না। যেসব কারণেই হোক, শামীম ওসমান রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে এদিন বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি স্পষ্ট করেন আইভীর পক্ষে নিজের অবস্থান।

আমি যতটুকু খবর পেয়েছি, এই সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমানের বক্তব্য নতুন উদ্যমের সৃষ্টি করেছে নেতাকর্মীদের ভেতরে। কেউ কেউ বলছে শামীম ওসমানের এই অবস্থান বিএনপিকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরিয়েছে। আমি অবশ্য এভাবে দেখতে চাই না। এই নির্বাচনকে বিএনপির দৃঢ়তার সঙ্গে নেওয়া উচিত। নির্বাচন বর্জন এবং মাঝপথে নির্বাচন থেকে সরে আসার যে সংস্কৃতি বিএনপি চালু করেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী যুদ্ধে টিকে থাকতে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়াই করা বিএনপির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

এই নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা নির্বাচনের পরই বোঝা যাবে, তবে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে একটি ইতিবাচক দিক বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। গত পর্বে মেয়রের দায়িত্ব পালনের সময়ে আইভী রাস্তাঘাট নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে লক্ষণীয় সাফল্য দেখাতে পেরেছেন। এ কারণে একটি বড় জনসমর্থন তৈরি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছেন এমপি সেলিম ওসমান। জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের জোটবন্ধু। সেলিম ওসমানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত। শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। এর ইতিবাচক ফল শুধু নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগকেই দৃঢ় করবে না, নারায়ণগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।

নারায়ণগঞ্জের নাগরিকসমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে ত্বকী হত্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ কোনো কোনো ইস্যুতে দূরত্ব তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে। নাগরিকসমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীদের সবাই ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে শক্তিশালী অভিযাত্রী। ন্যায় ও সত্য রক্ষায় সেলিম ওসমান এমপি, শামীম ওসমান এমপি ও সেলিনা হায়াত আইভীসহ সংবেদনশীল সবাই যদি সততা ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নিতে পারেন এবং অন্যায়ের প্রতিবিধানের জন্য এগিয়ে আসতে পারেন, তবে এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা মনে করি, নাসিক নির্বাচনের উপলক্ষকে গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সুবাতাস বয়ে যাওয়ার একটি ভালো প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

Add Comment

Click here to post a comment