আন্তর্জাতিক

‘নরম’ বুকে কনুই, নিতম্বে ‘কঠিন’ চাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রকাশ্যে পুং হস্তমৈথুনের ঘটনার নিন্দায় ফেটে পড়েছে নেটিজেনরা। কিন্তু এমন চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স ছাড়াও প্রায় রোজই মহিলাদের ছোটখাট কিন্তু ঘৃন্য শ্লীলতাহানির মুখোমুখি হতে হয়। রাস্তায় চলতে গেলে হোঁচট খাওয়ার মতোই পথে-ঘাটে একটু আধটু ‘কনুই’ খেতেই হয়— মনে মনে মেনে নিয়েছি আমরা। অভ্যেস করে নিয়েছি আমরা মেয়েরা। প্রতিবাদ! ধুস্। বড়রাই ছোট থেকে শিখিয়ে দিয়েছেন, ও সব ঘটেই থাকে, ইগনোর করে যাও। বড় জোর বুকে ব্যাগ চেপে নিজেকে ডিফেন্ড করতে পার। প্রতিবাদ করে আলোয় আসার দরকার কি! লোকে বেহায়া বলবে।

কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ওই পুরুষের টার্গেটে সব ‘বুক’ থাকে না। ওরা খুঁজে নেয় ‘নরম’ মেয়ে। তাই ওদের শায়েস্তা করার অস্ত্র— মনের জোর। নরম হলে চলবে না। তা থেকেই আসবে কাঠিন্য। যেটা ওই ভিতুদের চোখে পড়বে। হাত নড়বে না।

বাসের মধ্যে হস্তমৈথুনের ঘটনা ফেসবুকের দৌলতে এখন সবারই জানা। প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রী ফেসবুকে সেদিন ভিডিওটি তুলে না ধরলে আর পাঁচ দিনের মতোই এই ঘটনাও সবার অগোচরে থেকে যেত। বাড়িতে এসে ছাত্রীটি ঘটনাটির কথা বললে মা-বাবার কাছে শুনতে হতো, ‘‘এই জন্য বলি একা যাতায়াত করিস না।’’ বা পাশের বাড়ির কাকিমা পরোক্ষ ভাবে শুনিয়ে দিতেন, ‘‘আজকাল মেয়েছেলেদের যা পোশাক হয়েছে, তাতেই এসব বাড়ছে।’’

ছাত্রীটি ফেসবুকে যে পোস্টটি করেছিলেন, তার কমেন্ট সেকশনে অনেক মহিলাই একই রকম অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। কেউ এতদিন লজ্জায় এড়িয়ে গিয়েছেন, কেউ প্রতিবাদ করেছেন, কেউ আবার প্রতিবাদ করার সময়ে পাশের কোনও যাত্রীকেই পাশে পাননি। কিন্তু তাতেও কি হেদুয়াকাণ্ডের রিপিট টেলিকাস্ট থামবে?

প্রশ্ন উঠছে, কেন পাবলিক প্লেসে ঘটছে এমন ঘটনা? নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেই কি এমন ঘটনা আটকানো সম্ভব? নাকি, সমস্যাটা অন্য কোথাও?

যে লোকটা ভিড় বাসে অনেক কষ্ট করে হলেও একবার নারীদেহ ছুঁয়েই কলার উঁচিয়ে নেয়, সে ফাঁকা বাসে কোনও মহিলাকে ধর্ষণ করে ফেলতে পারে, এমনটা ভাবাই যায়। অতএব বেশি রাতে, ফাঁকা বাসে, খালি রাস্তায় মহিলাদের যাতায়াত বন্ধ করতে হবে। কারণ, নিরাপত্তা দিয়ে কি মানসিকতা বদলানো যায়? যায় না। তাই মহিলাদের গলাতেই শোনা যায়, ‘‘ওই মেয়েটির পোশাকটিই প্রোভোকেটিভ ছিল, তাই ওর সঙ্গেই ওরম হয়েছে।’’

নাকি এদের মনের মধ্যে কেবলই ঘোরে সিনেমায় নায়িকাকে নায়কের ছেড়-ছাড়ের দৃশ্য। তাই সগৌরবে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে গান গাওয়াটা যেন অধিকার। আর সঙ্গে একটু ছুঁয়ে যাওয়াটা বোনাসের মধ্যে পড়ে। আর প্রতিবাদ করতে গেলে অবশ্য এরা সিনেমার কলার ওঠানো নায়ক নয়। তখন উদাহরণ হিসেবে টেনে আনে রাসলীলায় মেতে ওঠা কেষ্ট ঠাকুরকেও— ‘‘কেষ্ট করলে লীলা আর আমরা করলেই বিলা!’’

তাই সমাধান হাতড়াতে গেলে অনেক গোড়া থেকে সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে। কলকাতা পুলিশের তৎপরতায় হেদুয়াকাণ্ডের অভিযুক্ত অসিত রাইকে পাকড়াও করা গিয়েছে। কিন্তু এমন হাজারো অসিত রাই ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। কেউ কনুই দিয়ে, কেউ হাত দিয়ে, কেউ চোখ দিয়ে, কেউ আবার ভাবনা দিয়েই মৈথুন চালিয়ে যায়। রমণী মানেই তো রমণ। কিন্তু তারা সব সময়ে ধরা পড়ে না। বড়জোর দুটো চড়থাপ্পড় খেয়ে পরের দিন আবার ভিড় বাসের ‘নরম’ টার্গেট খোঁজে।

প্রাপ্তবয়স্ক মহিলারা ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর ফারাক বোঝেন। ভিড় বাসে কোন ধাক্কাটা ব্রেক মারার জন্য আর কোন ধাক্কাটা ‘ফ্যান্টাসি’ করার জন্য তা ভালই বোঝেন তাঁরা। কিন্তু যারা এখনও সেই ফারাক বোঝার বয়সে পৌঁছয়নি, তারা? কবে সেই ছোট্ট মেয়েরা ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর মধ্যে ফারাক বোঝে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে? তাছাড়া ফারাক বুঝতে পারলেও সবাই তো প্রতিবাদও করে উঠতে পারেন না লজ্জায়। যারা ভিড় বাস-ট্রেনে এমন কাণ্ড ঘটায়, তারাও সেটা ভালই জানে।

আবার পুরুষ মানেই অস্পৃষ্য ভাবাটাও মনে হয় ঠিক হবে না। সহযাত্রীটি পুরুষ মানেই হাত-পা-চোখ সবই নারী শরীরকামী, সকলের মনেই লকলকে লেহনকামী জিভ এমন ভাবলেও যে একঘরে হয়ে যাব আমরা মেয়েরা। তাই এলোমেলো প্রতিবাদ করে বিষয়টাকে লঘু করা অন্যায় হবে। আবার সত্যি ‘ব্যাড টাচ’-কে ইগনোর করাও হবে অন্যায়। ওখানে ‘ওরা’ থাকতে পারে ভেবে হাত পা গুটিয়ে নয়, ওদের মুখোমুখি হতে হবে। কনুইয়ের বদলে কনুই শক্ত করতেই হবে।

যতই ফেসবুক বিপ্লব হোক বা পুলিশের তৎপরতা থাকুক, অসিত রাইদের সংখ্যা কমাতে গেলে ঠিক কী কী করতে হবে, তার উত্তর অজানা। সঠিক উত্তর কোনও কালই বলতে পারেনি। তবে এটা ঠিক যে— নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব মেয়েদের নিজ হাতেই নিতে হবে। নিতেই হবে। বাবা-কাকা-দাদার ভরসায় থাকলে হবে না। আসলে অসিত রাইরাও তো কারও কাকা-বাবা-দাদা।

জুমবাংলানিউজ/পিএম