অপরাধ/দুর্নীতি জাতীয়

নগরজুড়ে নিশিকন্যাদের একি কন্ড

কর্মব্যস্ত রাজধানীতে গভীর রাত হলেও যেন ব্যস্ততার শেষ নেই। রাত যখন গভীর তখন নগরীর সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত, সর্বত্রই হিজড়া এবং ভাসমান যৌনকর্মীরা ভিড় করেন নানা জায়গায়। এসব যৌনকর্মীদের খদ্দেরের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। কিন্তু ‘নিশিকন্যাদের’ এই রুপের ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাত ১১ টার পর থেকে গুলিস্থান পার্ক, ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউসনের সামনের ফুটপাত, কাকরাইল মধুমিতা হল, ফার্মগেট পার্ক, বিজয় সরণি ও পুরাতন এয়ারপোর্টের মাঝা-মাঝি সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে মুখে অতিরিক্ত মেকআপ এবং ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে এসব দেহপসারিনীরা খদ্দেরদের জন্য ফাঁদ পেতে বসেন। অভিযোগ রয়েছে, রুপের ফাঁদে সাধারণ মানুষকে অসামাজিক কাজে প্রলুব্ধ করে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছেন নিশিকন্যারা।

বিজয় সরণির রঙ্গমঞ্চ

বিজয় সরণি এবং পুরাতন এয়ারপোর্টের মাঝা-মাঝি সড়কে জ্বলন্ত সিগারেট হাতে ঘুরাফেরা করছে কয়েকজন হিজড়া। ঝোপের মধ্যে পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ঘর। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি রিকশা, ভ্যানগাড়ি ও সিএনজি অটোরিকশা। এসব যানবাহনের চালকদের নজর হিজড়াদের দিকে। কেউ কেউ আসছে এবং হিজড়াদের সাথে কথা বলে বিশেষ ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। পাশের অংশটিতে বসে আছে ৮-১০ জন নারী যৌনকর্মী। এখানেও রয়েছে পলিথিনের তৈরি তিনটি বিশেষ ঘর। এসব যৌনকর্মীর চারপাশে বেশ কিছু যুবকের ভিড়। এছাড়া যুবকরা মগ্ন দেদার গাঁজা সেবনে। রাত ১টার চিত্র এটি।

কয়েক গজ সামনেই পুলিশ ভ্যানে ঘুমে বিভোর কাফরুল থানার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। এ প্রসঙ্গে সাব ইন্সপেক্টর(এসআই) বিদ্যুত বলেন, ‘আমরা প্রায় সময় এদের ধাওয়া দেই কিন্তু এরা পুণরায় চলে আসে।’ তিনি দাবি করেন, ‘তিনি বড় সন্ত্রাসীকে ভয় পান না তবে হিজড়াদের ভয় পান।’

রাত ১ টা ৪০। এখানে হিজড়াদের স্পটে গিয়ে দেখা গেল একজন যুবক ঘাসের উপর পড়ে আছে। তিনি জানান, তার নাম হাসান। এই পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হিজড়ারা তাকে মারধোর করে টাকা পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিনা হিজড়া বলেন, ‘খালি পেটে আকাম করছে তাই এই অবস্থা। তাকে মারধোর করা হয়নি।’

শাহবাগের ঝুপড়ি ঘর

খানিকটা পর পর ফুটপাতের দুই পাশে পলিথিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। সেজেগুজে রাস্তার একপাশে ফকফকা আলোর নিচে কয়েকজন এবং অপরপাশে অন্ধকারে কয়েকজন যৌনকর্মী বসে আছেন। ঝুপড়ি ঘরের পাশেই কখনো থামছে ট্রাক আবার কখনো থামছে মিনি বাস। সুযোগ বুঝে চালক- হেল্পাররা ঢুকে যাচ্ছে ঝুপড়ি ঘরের অন্ধকার জগতে। ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউসনের সামনে রাত ২ টা ৩০ এর চিত্র এটি।

অফিসারস ক্লাবের ওয়েটার মোঃ সোহেল বলেন, ‘প্রায় দিনই কাজ শেষে এখান দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় যৌনকর্মীরা ডাকাডাকি করে।’ ফুটপাতের দোকান পাহারাদার মোঃ খোকন বলেন, ‘রাত ৯টা থেকে শুরু করে ফজরের আযান পর্যন্ত এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। পুলিশ ও এলাকার পোলাপান এসে প্রায় সময়ই এদের ধাওয়া দিলে তারা কিছুক্ষণ পর আবার চলে আসে।’

স্থানীয় সুত্র জানায়, এই স্পটের পতিতারা দিনের বেলায় রমনা পার্কে ও রাতের বেলায় রাস্তার উপর অসামাজিক কার্যকলাপ করে। বেবি, আসমা, সালমা, রুনা, ইয়াসমীন, কালিসহ অন্তত ১৫ জন যৌনকর্মী এই স্পটে সক্রির। ঘটনাস্থলের পাশেই শাহবাগ থানার টহলটিম দাঁড়িয়ে থাকলেও এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

ফার্মগেটের হোম সার্ভিস

রাজধানীর ফার্মগেট পার্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন সিনেমা হলের ভাসমান পতিতারা সন্ধ্যা হলেই ভিড় করেন এখানে। বোরখা পড়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থেকে চোখের ইশারায় খদ্দেরকে কাছে ডেকে চুক্তি করে খদ্দেরের বাসায় চলে যান। পার্কেরই এক যৌনকর্মী জানালেন, মাঝে মাঝে কম বয়সী চাকরিজীবী এবং ছাত্রদের ডাকও পড়ে। তিনি বলেন, ‘সবাই তো আর কম বয়সে বিয়ে করে না। চাকরি পেতেই অনেকের বয়স বেড়ে যায়। আবার রিকশাচালকরা দেখা যায় ঢাকায় একাই থাকে। এদের কি চাহিদা নাই? আমরা না থাকলে রাস্তাঘাটে মেয়েদের আর হাঁটার সুযোগ থাকবে না।’

ভয়ঙ্কর ওভারব্রিজ

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান পতিতাদের দখলে চলে গিয়ে রাজধানীর ওভারব্রিজগুলো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। জানা গেছে, যৌনকর্ম করতে গিয়ে অনেকেই ওভারব্রিজে ছিনতাইয়ের শিকার হন। অনেক সময় ব্ল্যাকমেইল করে সর্বস্ব লুটে নেয়া হয়। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে রাতের ওভারব্রিজ সম্পর্কে নানা তথ্য। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট। রাতে আশপাশেই থাকে পুলিশের টহল টিম। দিনের বেলা ফার্মগেটের ওভারব্রিজ থাকে ভিক্ষুক ও হকারদের নিয়ন্ত্রণে। রাত ১০টার পর বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট।

ওভারব্রিজের আশপাশে আশ্রয় নেয় ভাসমান পতিতা ও তাদের দালালরা। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিনতাই ও ব্ল্যাকমেইলে জড়িত। গত শুক্রবার রাত ২টার দিকে এ রকম একটি চক্রের ফাঁদে পড়েছিলেন আরাফাত নামের এক যুবক। গ্রামের বাড়ি থেকে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। গাড়ি থেকে নেমে বাসার উদ্দেশে ওভারব্রিজ পার হতে গিয়েই ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘সেজান পয়েন্ট থেকে ওভারব্রিজে উঠে আমি হাটতে থাকি। ওই সময় এক তরুণী আমার পথ আগলে দাঁড়ায়। আমি এড়িয়ে যেতে চাইলে তিন যুবক আমাকে আটক করে ব্রিজে জোর করে বসিয়ে রাখে। অস্ত্র দেখিয়ে আমাকে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নেয়। এ সময় আমাকে তারা হুমকি দেয় যে, নিচে তাদের লোক আছে , এ বিষয়ে কোনো শব্দ করলে মেয়েকে (ভাসমান পতিতা) নির্যাতন করা হয়েছে বলে গণধোলাই দেবে।’

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, পরীবাগ ওভারব্রিজে রাতে হিজড়াদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরীবাগে ওভারব্রিজ হিজড়া ও ভাসমান পতিতাদের দখলে থাকে রাত ১২টার পর। ভুক্তভোগীরা জানান, রাতে এই ওভারব্রিজ ব্যবহার করা দুষ্কর হয়ে পড়ে।