অন্যরকম খবর

দস্যু হলেও সকলের কাছে যিনি মায়াদেবী!

রেহেনা আক্তার রেখা: নাম তার ফুলন দেবীদস্যুরানী হিসেবে তিনি সকলের কাছে পরিচিত,দস্যু বলতে  আমরা যা বুঝি তার বাইরে এমন কিছু ব্যাতিক্রম দস্যু আছে যারা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন অন্যভাবে। তাদেরই একজন ফুলন দেবী। ভারতের নিচু বর্ণ হিসেবে পরিচিত এক পরিবারে জন্ম নিলেও পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ত্রাসের নাম।ফুলনদেবী সাধারণ নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের কাছে ‘মায়ারানী’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন।এরপরও কেবল প্রতিশোধেরনেশায় একের পর এক মানুষ হত্যা দস্যুরাণী ফুলনদেবীকে ইতিহাসের অন্যতম খুনি হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

ভারতের উত্তর প্রদেশের জালৌন জেলার ঘোড়াকা পুরয়া নামক স্থানে এক নিচুজাতের মাল্লার ঘরে ১৯৬৩ সালে জন্ম ফুলনের। ছোটবেলা থেকেই জীবনযুদ্ধে বড় হওয়া ফুলন বার বার মুখোমুখি হয়েছেন কঠিন বাস্তবতা ও  নির্মমতার। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর অবহেলা-অবজ্ঞায় এক সময় ফুলন হয়ে উঠেন প্রতিবাদী এক ভয়াবহ দস্যু।

মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবার বয়সী পুট্রিলাল নামক এক লোকের সঙ্গে বিয়ে হয় ফুলনের। বিয়ের পর স্বামী বলপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও শারীরিক অত্যাচার চালতো ফুলনের ওপর। এসব সহ্য করতে না পেরে এক সময় স্থায়ীভাবে পিতৃগৃহে ফিরে আসেন তিনি।

ফুলনের গ্রাম ও আশপাশের একাধিক গ্রামে ঠাকুর বংশের জমিদারী ছিল। ফুলনের বয়স তখন সতের- জমিদারের লোকেরা প্রায়ই গ্রামের দরিদ্র গ্রামবাসীর কাছ থেকে ফসল নিয়ে যেত এবং নির্যাতন চালাত। ফুলন এসবের প্রতিবাদ জানিয়ে দখলকারীদের নেতা মায়াদীনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। এ অপমানের প্রতিশোধ নিতে ঠাকুরের লোকেরা তাকে ধরে নিয়ে যায় বেমাই নামে প্রত্যন্ত এক গ্রামে। সেখানে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। প্রতি রাতেই ঠাকুর ও তার লোকেরা জ্ঞান না হারানো পযর্ন্ত ধর্ষণ করতো ফুলনকে।

১৬তম রাতে মৃতপ্রায় ফুলন সেখান থেকে পালিয়ে যান। তখন ফুলন ছিলেন মাত্র সতের বছর বয়সী। এরপর আলাদা বাহিনী গঠন করেন ফুলন। ফুলনের দস্যুদলের আবাস ছিল চম্বলের বনভূমিতে। ধনী জমিদারদের মুক্তিপণের জন্য অপহরণও করত তারা। প্রতিটি ডাকাতির আগেই ফুলন দেবী দুর্গার পূজো দিতো। আলাদা বাহিনী নিয়ে প্রথম হামলা চালান তার সাবেক স্বামীর গ্রামে। নিজ হাতে ছুরিকাঘাতে তার স্বামীকে খুন করে রাস্তায় ফেলে রাখেন।

এরই মধ্যে একদিন ধনী ঠাকুর বংশের ছেলের বিয়েতে সদলবলে ডাকাতি করতে যান তার দস্যুবাহিনী। সেখানে খুঁজে পান এমন ‍দুজনকে যারা তাকে ধর্ষণ করেছিল। ক্রোধে উন্মত্ত ফুলন দেবী তাদের আদেশ করলেন বাকি ধর্ষণকারীদের ধরে আনার। বাকিদের পাওয়া না যাওয়ায় লাইন ধরে ঠাকুর বংশের ২২ জনকে ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলে ফুলনের ডাকাত দল।

বেমাইয়ের এ গণহত্যা ভারতবর্ষে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ফুলন দেবীকে গ্রেপ্তারের জন্য স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠন করেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু ততদিনে দস্যুরানীর নাম দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ভারতবর্ষে। তার পক্ষে আন্দোলনও শুরু হয়ে গেছে। পূজোর সময় দূর্গার মূর্তির চেহারাও তৈরি হতে থাকে ফুলনের মুখের আদলে। এভাবে চলে প্রায় দু’বছর। ফুলনের দস্যুদলের কেউ কেউ ধরা পড়ে। অনেকে মারা যায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুযুদ্ধে। অসাধারণ কৌশল আর লোকপ্রিয়তার কারণে পুলিশের কাছে অধরাই থেকে যায় ফুলন।

১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার ফুলনের সঙ্গে সন্ধি করার আগ্রহ জানায়। ফুলনও তা মেনে নেন। তবে তিনি সন্ধির জন্য অনেকগুলো শর্ত বেঁধে দেন। যার মধ্যে অন্যতম হল- তাকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়া। পুলিশের কাছে নয়, তিনি কেবলই মহাত্না গান্ধী এবং দুর্গা দেবীর কাছে অস্ত্র সমর্পন করবেন। সরকার শর্ত মেনে নিলে ১০ হাজার মানুষ আর ৩০০ পুলিশের সামনে ফুলন দেবী অস্ত্র জমা দেন গান্ধী ও দুর্গার ছবির সামনে। সেসময় ফুলনের পরণে ছিল একটি খাকি পোশাক, একটি ছিল লাল চাদর, মাথায় লাল পট্টি, কাঁধে বন্দুক।

১১ বছর কারাভোগের পর ফুলন সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ এবং ৯৯ সালে পরপর দু’বার বিহার থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২৫ জুলাই লোকসভার অধিবেশনে যোগ দিয়ে দিল্লির অশোকা রোডের বাড়িতে ঢোকার মুখেই বাড়ির সামনে তিনজন মুখোশধারী এলোপাতাড়ি গুলি করে ফুলন দেবীকে হত্যা করে। শের সিং রানা , ধীরাজ রানা এবং রাজবীর নামে এই তিনজন খুনী পরে স্বীকার করে তারা ঠাকুর বংশের সন্তান এবং তাদের বিধবা মায়েদের অশ্রু মোছানোর জন্যই তারা ফুলনকে হত্যা করে।

যেভাবে নৃশংসতার মধ্যে দিয়ে ১১ বছর বয়সী ফুলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক নাটকীয়তার পর তা থেমে গেল মাত্র ৪২ বছর বয়সে। দস্যুতার পাশাপাশি মমতা দিয়েও অনেকের মন জয় করেছিলেন কিংবদন্তীর  দস্যুরানী।

ফুলন দেবীকে নিয়ে ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় চলচ্চিত্র ‘বেণ্ডিত কুইন’। অসমের ভ্রাম্যমান থিয়েটার অপ্সরা থিয়েটার ফুলন দেবীর আত্মসমর্পনের পর দস্যুরাণী ফুলন দেবী নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। কোনো তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াই নাটকটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সাম্প্রতিক বিষয়-বস্তুর উপর রচিত এইটিই ছিল ভ্রাম্যমান থিয়েটারের জনপ্রিয় নাটক। ‘আই ফুলন দেবী : দা অটোবায়োগ্রাফী অফ ইণ্ডিয়াস বেণ্ডিত কুই’ তার অন্যতম আত্নজীবনী।