মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

তোকেই খুঁজছি বলে ব্রাশফায়ার

গ্রামের নাম তালবাড়িয়া। এই গ্রামের শেষ প্রান্তে কালীদাসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। বিদ্যালয়ের মাঠে তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট একটি মঞ্চ। এই মঞ্চেই সন্ত্রাসবিরোধী জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং দৌলতপুর থানা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সেই গ্রামটি সন্ত্রাসকবলিত এলাকা। সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ ছিল সন্ত্রাসীদের কারণে। সন্ত্রাসবিরোধী বক্তব্য রাখবেন জাসদ সভাপতি মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখবেন কুষ্টিয়া জেলার জাসদ নেতারা। জাসদের এই নেতারা সভা নিয়ে নানা ধরনের খবর পাচ্ছেন। কিন্তু আমলে নেননি। তারা জানতেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এমন সভার আয়োজনে হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।
এর পরেও তারা প্রস্তুত সভা করতে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিচ্ছেন তারা। কোনোভাবেই এই অপারেশন ফেল করা যাবে না। নইলে নিজেদের অস্তিত্ব তো দূরের কথা, প্রাণ বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়বে। ঘণ্টাখানেক সময় ধরে অপারেশনের ছক তৈরি করা হলো। কে কোন স্থানে অবস্থান নেবে, কার কী ভূমিকা হবে, তা নিয়ে আলোচনা শেষ। অস্ত্রশস্ত্র চলে এলো। তাদের মজুদে এখন নাইন এমএম, স্টেনগান, এসএমজি, কাটা রাইফেল, বন্দুক, পিস্তল আর শাটারগান। গুলি আছে হাজার রাউন্ডের ওপর। পরদিনের অপারেশন নিয়ে দলের প্রত্যেকেই ভীষণ উত্তেজনায়। ১৫/২০ জনের এই দুর্ধর্ষ দলের সদস্যরা পাল্টা হামলা মোকাবিলা করতেও প্রস্তুত। যে কোনো পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার মতো ক্ষমতা তাদের রয়েছে। পরদিন দুপুরের পরপরই তারা অপারেশনস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। দুজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসে দলকে রিপোর্ট দেয়। দলের নেতার মাথায় একটি লাল কাপড় বাঁধা। তার নেতৃত্বেই শুরু হবে অপারেশন। দলের সদস্যরা তার নির্দেশ ছাড়া এক পাও এগোয় না। ঘটনাস্থলের চারপাশে কলাগাছের ঝোপ। মাটির ঢাল নেমে গেছে ধানখেতের দিকে। আরেক পাশে হলুদ খেত। তবে ঝোপঝাড় বেশি। লাল কাপড় বাঁধা নেতার কথা মতো ৩/৪ জন গ্রুপ গ্রুপ করে ঝোপের আড়ালে অবস্থান নেয়। কোনো কোনো গ্রুপ আবার ধান আর হলুদ খেতে। শুয়ে বসে থেকে নিজেদের আড়াল করে রেখেছে। তাদের অপেক্ষার পালা শুরু। তাদের নিশানায় কালীদাসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। সেই মাঠেই তাদের অপারেশন। মাঠে তৈরি করা ছোট্ট মঞ্চে যাদের বক্তব্য দেওয়ার কথা, সেই কাজী আরেফসহ নেতারাই মূলত তাদের অস্ত্রের নিশানায়। মঞ্চে অনুষ্ঠান শুরুর অপেক্ষায় অস্ত্রধারীরা। এর পরের ইতিহাস ভয়ঙ্কর। রক্তাক্ত হয় তালবাড়িয়ার মাটি। লাশ পড়ে কাজী আরেফসহ পাঁচজনের। ঘটনাটি ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারির।

১৭ ফেব্রুয়ারি। জনসভাস্থলে লোকজন আসতে শুরু করে। বিকালেই শুরু হয়ে যায় জনসভা। তত্কালীন সরকারের অংশীদার জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা কাজী আরেফ ছিলেন ওই জনসভার প্রধান অতিথি। জেলা নেতারাসহ স্থানীয় নেতারা ছিলেন বিকালের ওই জনসভায়। পাঁচজনের বক্তব্য শেষে ডায়াসে উঠে দাঁড়িয়েছেন কাজী আরেফ। তিনি বক্তৃতার শুরুতেই বলেন, ‘সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে’। ঠিক ওই সময় পূর্ব দিকের তালবাড়িয়া এলাকা থেকে সশস্ত্র ঘাতক দল অস্ত্র উঁচিয়ে সভা মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসে। ১২/১৫ জন সশস্ত্র ক্যাডার সভামঞ্চ ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্য থেকে সাত-আটজন অস্ত্র হাতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। তারা ছিল সবাই লাল্টু বাহিনীর সদস্য। সভা পরিচালনা করছিলেন তত্কালীন ছাত্রলীগ নেতা খোরশেদ আলম। হামলাকারীদের মধ্যে রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু, আনোয়ার হোসেন, সাফায়েত হোসেন হাবিব ছিল।

মাথায় লাল গামছা বাঁধা কিলিং মিশনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি উচ্চস্বরে বলেন, ‘কেউ নড়াচড়া করবি না’। জনসভার সব মানুষ অস্ত্র দেখে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মঞ্চে থাকা আড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আজিবর রহমান দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে বন্দুকধারীরা তাকে গুলি করে, তিনি এতে আহত হন।

ফাঁকা গুলিবর্ষণে আতঙ্ক সৃষ্টি করে হামলাকারীরা মঞ্চের কাছে গিয়ে সবার নাম জানতে চায়। তালবাড়িয়া গ্রামের শমসের মণ্ডল মঞ্চ থেকে চলে যেতে চাইলে প্রথমেই তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর জাসদ নেতা লোকমান হোসেন, ইয়াকুব আলী ও ইসরাইল হোসেনকে হত্যা করা হয়।

এ সময় ডায়াসে দাঁড়ানো কাজী আরেফ অস্ত্রধারীদের বলছিলেন, ‘আমার লোকদের এভাবে হত্যা কর না। আমরা কী দোষ করেছি? তোমরা বললে, আমরা না হয় এখানে রাজনীতি করব না। এভাবে মেরে কী লাভ তোমাদের?’ তখন অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি কাজী আরেফের কাছে গিয়ে বলেন, “তোর নাম কী?” কাজী আরেফ নিজের নাম বললে ওই ব্যক্তি বলেন, “তোকেই তো খুঁজছি। ” এরপর অন্য দুজন গুলি চালালে মঞ্চের ওপরেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন কাজী আরেফ।

ঝন্টুর জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা : এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ ছাড়া গোয়েন্দা তদন্তেও বেরিয়ে আসে সেসব তথ্য। গোয়েন্দারা জানায়, ঘটনার ১৪/১৫ দিন আগে চুয়াডাঙ্গা জেলার আঠারোখাদা গ্রামের একটি বাড়িতে একটি বৈঠক হয়, তাতে লাল্টু, মান্নান মোল্লাসহ কয়েকজন ছিলেন ওই বৈঠকে। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঝন্টু কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোলতাডাঙ্গা গ্রামে যায়। সেখানে লাল্টু বাহিনীর দুই সদস্য তার হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেয়। চিঠিতে লেখা ছিল— ‘পত্রবাহকের সঙ্গে যাবেন এবং ছোট্ট একটা অপারেশন করে আসবেন। ’ এরপর অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে তালবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে উঠেন ঝন্টু। পরদিন বিকাল ৪টার দিকে কালীদাসপুরে জনসভা মাঠের উদ্দেশে রওনা হন তারা। প্রথমে সভাস্থল লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছুড়লে অনেকে ভয়ে পালিয়ে যায়। এরপর তারা মঞ্চে উঠে কাজী আরেফসহ পাঁচজনকে হত্যা করে চুয়াডাঙ্গার আঠারোখাদা গ্রামে ফিরে যান।

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র : কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে ঝন্টুর হাতে ছিল এসএমজি, আনোয়ারের হাতে ছিল কাটা রাইফেল, হাবিবের হাতে ছিল বন্দুক, নজরুলের হাতে ছিল বন্দুক, এলাচের হাতে ছিল পিস্তল, জাহান ও বাশারের হাতে ছিল রাইফেল। হত্যার সময় তিনটি নাইন এমএম স্টেনগান, ১টি দোনলা বন্দুক, ৩টি কাটা রাইফেল, ১টি মাকফোর রাইফেল ও ২টি শাটার গানও ব্যবহার হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সভামঞ্চের অদূরে মান্নান মোল্লা ওয়াকিটকি ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। বিকাল প্রায় ৫টা।

মামলার বৃত্তান্ত : কাজী আরেফসহ পাঁচজনকে হত্যার পরদিন দৌলতপুর থানার তত্কালীন এসআই মো. ইসহাক আলী বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। আলোচিত এ মামলার রায়ে ২০০৪ সালের ৩০ অগাস্ট কুষ্টিয়া জেলা জজ আদালত ১০ জনের ফাঁসি এবং ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো ইলিয়াস, রাশেদুল ইসলাম ওরফে ঝন্টু, সাফায়েত হোসেন (হাবিব), আনোয়ার হোসেন, সাহির হোসেন, মান্নান মোল্লা, বাকের, রওশন, জাহান ও জালাল। এ ছাড়া রাফাত ওরফে রাফা, গারেস, তাসিরুদ্দিন, আসগর জোয়ারদার, নজরুল ইসলাম, ওয়ালিউর রহমান, একুব্বার, টিক্কা ওরফে জাব্বার, লাবলু, ফিরোজ ওরফে ফরু, লাল্টু ওরফে নুরুজ্জামানকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

ফাঁসি কার্যকর : কাজী আরেফ আহমেদসহ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) পাঁচ নেতা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির ফাঁসি গত বছর ৮ জানুয়ারি রাতে কার্যকর করা হয়। রাত ১১টার পর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পর্যায়ক্রমে তিনজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে যে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তারা হলেন কুষ্টিয়ার মিরপুরের রাজনগর গ্রামের হাবিবুর রহমান, কুর্শা গ্রামের আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম।

সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন