আন্তর্জাতিক

তুরস্কে বন্দুকধারীর গুলিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত নিহতের ঘটনায় বিশ্বজুরে নিন্দা

তুরস্কের আঙ্কারায় গুলিবিদ্ধ রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ মারা গেছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, সিরিয়ার আলেপ্পোয় রাশিয়া জড়িত হওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে রাষ্ট্রদূতের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সমর্থন করায় এ হত্যাকাণ্ডের আগের দিন রাশিয়াবিরোধী বিক্ষোভ হয় তুরস্কে।

সোমবার আঙ্কারায় একটি ফটো গ্যালারি পরিদর্শনের সময় তুর্কি পুলিশের এক সদস্য কারলভকে গুলি করেন। হামলাকারী এই পুলিশ সদস্যের নাম মেভলুত মেরত আইদিনতাস (২২)। তিনি আঙ্কারায় দাঙ্গা পুলিশের সদস্য। হামলার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। তার সঙ্গে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর যোগাযোগ আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে এ হামলা চালানো হয়েছে।

ঘটনার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এরদোয়ান। এ ছাড়া এক ভিডিও বার্তায় কথোপকথনে দুই নেতা এ ঘটনাকে ‘প্ররোচনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এরদোয়ান আরো বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক যারা নষ্ট করতে চায়, তারা সফল হবে না।

পুতিন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরুদ্ধে ও সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটি উসকানিমূলক কাজ।

পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদূত নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে একটি প্রতিনিধিদল তুরস্কে যাবে।

রাষ্ট্রদূত কারলভকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ নিন্দা জানিয়েছে এবং ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন এই সন্ত্রাসী হামলায়’ গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন মহাসচিব বান কি মুন।

আলেপ্পো পরিস্থিতির জন্য তুরস্কে সম্প্রতি কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ হচ্ছে। এর মধ্যে আলেপ্পোয় যুদ্ধবিরতি কার্যকরে রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তুরস্ক ও রাশিয়া সরকার। সিরিয়া ইস্যুতে মঙ্গলবার মস্কোয় রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ এখন জনগণের ঘৃণা-প্রতিঘৃণায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রদূতকে গুলি করে হত্যা করার পর এর বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে বিশ্বজুড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এই জঘন্য হামলার নিন্দা করে তদন্তে পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের হামলা কূটনীতিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

russia

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন এই হত্যাকাণ্ডকে ‘কাপুরুষোচিত ঘটনা’ অভিহিত করে রাষ্ট্রদূত কারলভের শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এ ছাড়া জার্মানি ও ফ্রান্সও নিন্দা জানিয়েছে।

হামলাকারীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত তুরস্কের ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনও এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। জুলাই মাসে তুরস্কে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের জন্য দায়ী করা হয় তাকে।

সোমবার ‘তুর্কিদের চোখে রাশিয়া’ শিরোনামে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অতিথি ছিলেন কারলভ। সেখানে অন্যান্য অতিথি ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতির মধ্যে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তার ওপর গুলি চালানো হয়। পরপর আটটি গুলি ছোড়ার শব্দ শোনা যায়। এ সময় স্যুট-টাই পরা সুসজ্জিত হামলাকারী পিস্তল নাড়িয়ে আরবি ও তুর্কি ভাষায় চিৎকার করছিলেন।

হামলাকারীকে বলতে শোনা যায়, ‘আলেপ্পোর কথা ভুলে যেয়ো না, সিরিয়ার কথা ভুলে যেয়ো না।’ তিনি উচ্চৈস্বরে ‘আল্লাহু আকবর’ বলছিলেন।

তুর্কি পুলিশ জানিয়েছে, নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে হামলাকারী নিহত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

গুলিবিদ্ধ কারলভকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার মৃত্যু নিশ্চিত করে বিবৃতি দেয়।

কারলভ (৬২) বিদগ্ধ একজন কূটনীতিক। সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) কূটনীতিক হিসেবে তিনি উত্তর কোরিয়ায় ১৯৮০-এর দশকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হয় এবং আবার তাকে উত্তর কোরিয়ায় পাঠানো হয়।

 

২০১৩ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে তুরস্কে পাঠানো হয় কারলভকে। গত বছর সিরিয়া সীমান্তে রাশিয়ার একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়, যা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কারলভ।

Add Comment

Click here to post a comment