জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

ঢাকায় হকি উৎসব-ইকরামউজ্জমান

আমাদের এই পরিচিত ঢাকা নগরীতে ৩২ বছর পর আবার এশিয়া কাপ হকি মহাযজ্ঞ শুরু হচ্ছে আজ। ১৯৮৫ সালে ছিল চোখ ধাঁধানো হকির দ্বিতীয় আসর আর এবার দশম উৎসব।

প্রথমবার ছিল ১০টি দেশ, এবার আটটি। সবুজ টার্ফের পরিবর্তে এবার অ্যাস্ট্রোটার্ফে মধুময় লড়াই। অনেক স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম থেকে মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়াম। এবারের টুর্নামেন্ট ‘হিরো এশিয়া কাপ ২০১৭’। পুরোপুরি ভিন্ন পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপটে দশম হকির বর্ণাঢ্য খেলা। টুর্নামেন্ট ঘিরে হকি অনুরাগীদের প্রশ্ন, এশিয়া চত্বরেও কি উপমহাদেশের হকি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন! পুরনো দিনের দর্শক ও আমার মতো যাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বৃহৎ খেলার উৎসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের জন্য পুরো বিষয়টি স্মৃতিকাতর, আবেগঘন ও রোমন্থনে ভরপুর। তিন দশকেরও বেশি আগের সেই দিনগুলো, খেলা ও বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতির আয়নটা এখনো ঝকঝকে! টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে ঢাকা নগরী পরিণত হয়েছিল হকি নগরীতে। খেলার প্রতি সাধারণ মহলের উৎসাহের অনেক প্রশ্নের সহজ জবাব মিলেছে! একটি সফল আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট দেশজুড়ে খেলার চর্চা বৃদ্ধি, নতুন জাগরণ সৃষ্টি, খেলার প্রতি সর্বমহলে কিভাবে প্রচণ্ড আগ্রহ ও উৎসাহের জন্ম দিতে পারে সেটা দেখেছি এশিয়া কাপের পরের দিনগুলোতে।

ঢাকায় টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যখন সম্মতি জানানো হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুস সাদেক।

কৃতী সাবেক হকি খেলোয়াড়। তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় দেশে জাতীয় দলে খেলেছেন। আবদুস সাদেকের আগে প্রথম বাঙালি খেলোয়াড় বশীর আহমদ শুধু পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে খেলেছেন। স্পেনের বার্সেলোনায় বিশ্বকাপ হকিতে পাকিস্তান স্কোয়াডে ছিলেন ইব্রাহীম সাবের ও আবদুস সাদেক। খেলার সুযোগ হয়নি!

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় দল নিয়ে সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক টুনার্মেন্ট অর্গানাইজিং ও টুনামেন্ট সেক্রেটারি মাহমুদুর রহমান মোমিন। একসময়ের কৃতী খেলোয়াড়, পরীক্ষিত সংগঠক ও আন্তর্জাতিক হকি আম্পায়ার। মাহমুদুর রহমান মোমিন বর্তমানে অসুস্থ হয়ে অনেকটা গৃহবন্দির মতো! মোমিন সাহেবের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রথম আন্তর্জাতিক হকি আম্পায়ার হওয়ার সম্মান অর্জন করেন আলমগীর মো. আদেল ।

হকি আমাদের বাংলার অন্যতম একটি প্রাচীন খেলা। খেলাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুমহান অতীত ও ঐতিহ্য। আছে ঢাকাবাসীর গর্ব ও ভালোবাসা। ঢাকায় স্থানীয়দের হকি খেলা শুরু হয়েছে এখন থেকে ১১০ বছর আগে। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০৭ সালে প্রথম নিজে কলকাতার স্পোর্টস গুডসের দোকান থেকে হকিস্টিক ও বল কিনে নিয়ে এসে নবাববাড়ির কিশোর, তরুণ ও যুবকদের মধ্যে বিতরণ করে এই খেলা শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা মনে করতেন, এটা তাঁদের পারিবারিক খেলা। অবসরে নবাববাড়ির সদস্যদের হাতে থাকত হকিস্টিক আর বল। এই খেলা খেলে তাঁরা গর্ববোধ করতেন। ফুটবল তাঁরা আগে থেকেই খেলতেন, তবে হকি শুরু হওয়ার পর এই খেলার দিকে সবাই বেশি ঝুঁকে পড়েন। নবাববাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে একসময় হকি খেলা হতো তিনটি গ্রাউন্ডে। এর মধ্যে একটি ছিল ‘সিমেন্টেড’। অলিম্পিকে হকি শুরুর আগ থেকেই ঢাকার নবাববাড়ির সদস্যরা হকি খেলতে শুরু করেন।

১৯০১ সালে নবাববাড়ির প্রথম ক্লাব—‘নবাব ইউনিয়ন ক্লাব’ স্থাপিত হয়। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। তবে ক্লাব পরিচালনা করতেন তাঁর সহোদর নবাব খাজা আতিকুল্লাহ। এই খাজা আতিকুল্লাহর নামেই ১৯১২-১৩ সালে ‘আতিকুল্লাহ কাপ হকি প্রতিযোগিতা’ শুরু হয় ঢাকার মাঠে। ব্রিটিশ রাজত্বে ও পাকিস্তান আমলে নিয়মিতভাবে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯১৭ সালে ‘নবাব ইউনিয়ন ক্লাব’ নাম পরিবর্তন করে ‘ব্যাচেলর্স ইউনিয়ন ক্লাব’ নাম নিয়ে কলকাতায় প্রথমবারের মতো ‘বেটন কাপ হকি’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তখন ঢাকার নবাববাড়ি ও বাইরের কয়েকজন খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত হয় সে দল। এই দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন খাজা নুরুদ্দিন। ঢাকার ব্যাচেলর্স ইউনিয়ন ক্লাব বেটন কাপে প্রথম থেকেই একটির পর একটি দলকে পরাজিত করে শেষ পর্যন্ত ফাইনালে কলকাতা রেঞ্জার্স ক্লাবের কাছে পরাজিত হয়ে বেটন কাপে রানার্স আপ হয়। বেটন কাপে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঢাকায় হকির প্রচার ও প্রসারে সহায়তা করেছিল। নবাববাড়ির চৌহদ্দির বাইরে হকির বিষয়ে উৎসাহ বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশি। খাজা সুলায়মান কদর, খাজা মহম্মদ আলিম, খাজা নুরউদ্দিন, আরমানিটোলার আবদুস সাত্তার প্রমুখ খেলোয়াড় তাদের স্টিকওয়ার্কের মাধ্যমে কলকাতার দর্শকদের নজর কাড়েন।

ঢাকায় হকি লিগের খেলা শুরু হয়েছে সেই বিশ দশকেরও আগে থেকে। খেলা হতো প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের লিগ। এ ছাড়া আতিকউল্লাহ কাপ, নাথান কাপ, হেয়ার কাপ, ডুরনো শিল্ডসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এতে ক্লাবগুলো ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি স্কুল দলও অংশ নিয়েছে পর পর।

১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ ঘিরে ঢাকা নগরীতে একটি পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারি ঘেঁষে সবুজ টার্ফে এশিয়ার হকি তারকাদের চোখ জুড়ানো স্টিকওয়ার্ক, মোহনীয় ড্রিবলিং, সহযোগীকে দিয়ে গোল করানোর দৃশ্য, সর্বোপরি হকিশিল্পীদের স্কিলের অনন্য প্রদর্শনী এখনো অনেকের চোখে লেগে আছে।

দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে, দেশের জন্য ভালো খেলার সংকল্প নিয়ে শাহাবুদ্দিন চাকলাদারের নেতৃত্বে (ম্যানেজার ছিলেন স্বনামধন্য জনপ্রিয় হকি তারকা সাব্বির ইউসুফ) বাংলাদেশ দলের সেই আত্মবিশ্বাসী প্রত্যয়দীপ্ত লড়াই। মাঠে খেলোয়াড়দের মধ্যে দেশ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় চরিত্র খুঁজে পাওয়ায়ই দর্শকরা জ্বলে উঠেছে। প্রথম খেলায় ইরানের বিপক্ষে জুম্মন লুসাইয়ের হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে ৩-১ গোলে জয়লাভ। এরপরের ম্যাচে জাপানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র। তৃতীয় ম্যাচে চীনের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও অসাধারণ লড়ে শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র। এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে সাহসী ও স্মরণীয় লড়াই। খেলোয়াড়রা নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিয়ে লড়েছেন। সম্মিলিতভাবে দলের মধ্যে একটি চিন্তাই কাজ করেছে—পাকিস্তানিদের বুঝিয়ে দিতে হবে বাঙালিরা ভালো হকি খেলতে পারে। সেদিন মাঠে পুরো বাংলাদেশ উপস্থিত হয়েছিল। খেলা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে গোল করেন হাসান সরদার। পাকিস্তান জয়লাভ করে ১-০ গোলে। ১৯৭০ সালে এই মাঠে অলিম্পিক ও এশিয়া বিজয়ী পাকিস্তান জাতীয় দলের বিপক্ষে প্রদর্শনী ম্যাচে শেষ মুহূর্তে তানভীর দারের পেনাল্টি কর্নার শটে পূর্ব পাকিস্তান দল ০-১ গোলে পরাজিত হয়। ১৯৮৫ সালে এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ০-৩ গোলে পরাজিত হয়ে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে। উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে পাকিস্তান ভারতকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল সময়ে আবার ঢাকায় এশিয়া হকি উৎসবের আয়োজন। দেশে হকির সার্বিক অবস্থা, বিরাজমান পরিবেশ, আন্তর্জাতিক হকিতে অবস্থান, ঘরে সংগঠকদের মধ্যে হকিকে ঘিরে ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থ উদ্ধারের লড়াই, সম্ভাবনাময় খেলাটি যেভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত সেটি হতে দিচ্ছে না। এগিয়ে যাওয়া ও আবার পিছিয়ে পড়ার মধ্য দিয়েই চলছে হকি। হকি চলছে অনেক আঁধারের মধ্য দিয়ে। হকি চত্বরে বিরাজ করছে বিভাজন ও অস্থিরতা। হকিতে প্রয়োজন দেশের স্বার্থে সংগঠকদের মধ্যে সম্মিলিত ঐক্য। হকি অবশ্যই দাঁড়াতে পারবে—এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সংগঠন। হকি উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি।

রাসেল মাহমুদ জিমির নেতৃত্বে এশিয়া কাপে লড়বে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। পুরো দেশ খেলোয়াড়দের পেছনে শুভ কামনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮৫ সালের মতো এটি আবার একটি সুযোগ হকি চত্বরকে জাগিয়ে তোলার। আর এটা পারেন দেশের জন্য খেলে একমাত্র খেলোয়াড়রা। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশ লড়বে পাকিস্তান, ভারত ও জাপানের বিপক্ষে। উদ্বোধনী দিনেই পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা। ১৯৮৫ সালের আত্মবিশ্বাস, লড়াই কিন্তু সব সময় অনুপ্রেরণা।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক