মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

ডিসেম্বর ১৯৭১-আলী যাকের

আজকের কলাম লিখতে বসে মন চলে যায় ১৯৭১-এ।

স্মৃতিতে ভাস্বর সেই দিনগুলোতে আমার ডায়েরির পাতার শরণাপন্ন হই।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। আমি আবার যুদ্ধক্ষেত্রের পথে পা বাড়ালাম। বেনাপোল পার হয়ে আমি বেশ কিছু গ্রামে আমার বরাদ্দকৃত কাজ শেষ করে যশোর রোডের ওপরে এসে দাঁড়িয়েছি। উদ্দেশ্য, ওই রাস্তা ধরে যশোরের দিকে যাব। স্থানটির নাম নাভারন। ১৫ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের অপরাহ্ন পর্যন্ত আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। তারপর ওই অপরাহ্নে প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে যশোর রোডের ওপরে টেপরেকর্ডার হাতে পুব দিকে হেঁটে চলেছি। উদ্দেশ্য, যশোর রোডে যদি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোনো গাড়ির দেখা মেলে, তাহলে সেটাতে চেপে যশোর যাওয়া যাবে। গত দুদিন ধরেই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশে নিয়োজিত পাকিস্তানি সেনাপ্রধান লে. জে. এ এ কে নিয়াজিকে একের পর এক বার্তা দিয়ে চলেছেন নানা সংবাদ মাধ্যমের মারফত এবং এ ছাড়াও ভারতীয় বিমানবাহিনী লিফলেট ছড়িয়েছে সারা বাংলাদেশের আকাশ থেকে। এ

ঘোষণাগুলোয় পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকা শহরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী। ঘোষণায় এও বলা হচ্ছে যে ঢাকা এখন ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের আওতার মধ্যে। পাকিস্তান বাহিনী যদি আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে ঢাকা শহরের ওপরে ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হবে। সেই সঙ্গে চলবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর অবিরাম বোমাবর্ষণ। এ ছাড়া যদি আমাদের দিকের পদাতিক বাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে, তখন ঢাকা শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ বেধে যাবে। তাতেও বিস্তর লোক মারা পড়বে। এসব ভাবছি আর মন আতঙ্কে ভরে যাচ্ছে। ওই শহরে বন্দি অবস্থায় রয়েছে আমার কত আপনজন। তাদের গিয়ে দেখতে পাব তো? নাকি গোলার আঘাতে ঢাকা বিধ্বস্ত নগরী হয়ে যাবে? স্বাধীনতা একেবারে দোরগোড়ায় এসে গেছে, এটা বুঝতে পারি। তবুও কী এক অজানা আশঙ্কায় মন ভরে যায় বিষাদে। এমন সময় ঠিক উল্টো দিক থেকে একটি সেনাবাহিনীর জিপ এলো। আমার কাছে এসে জিপটি গতি শ্লথ করল। চালক একজন ভারতীয় সেনা অফিসার। হাসতে হাসতে তিনি আমাকে বললেন, ‘এই মাত্র ওয়্যারলেসে খবর পেলাম ঢাকায় নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছে। Rejoice, You are free. বলেই জিপটি ভুশ করে বেরিয়ে গেল। Your are free! তোমরা স্বাধীন! কথাটি কানে ভাসতে লাগল। করোটির ভেতরে ঢুকে গেল যেন। আমি স্থাণুর মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। টেপরেকর্ডারটা আমার হাত থেকে খসে পড়ে গেল রাস্তার ওপরে। আমি শুয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। আমার দুটি হাতের তালু দিয়ে বাংলার মাটিকে সস্নেহে স্পর্শ করলাম। তারপর আস্তে আস্তে সেই মাটিতে শুয়ে পড়লাম। গড়াতে শুরু করলাম আমার বাংলার মাটিতে। গড়াতে গড়াতে কখন যে রাস্তা থেকে ঢাল বেয়ে নেমে গেছি ধানক্ষেতের মাঝে, লক্ষই করিনি। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বয়ে চলেছে আনন্দাশ্রু। আমি হাপুস নয়নে কাঁদছি। সেই অশ্রু গিয়ে মিশেছে বাংলার মাটিতে। মনে হলো এত গাঢ় নীল আকাশ কখনো দেখিনি। এমন টকটকে অস্তগামী সূর্য কখনো দেখিনি যেন আগে। এমন সুখের অপরাহ্ন কখনো আসেনি জীবনে। এখন সুখ আর সুখ চারপাশে। ঘাসের ওপর গজিয়ে ওরা বনফুল সুখের রসে টইটম্বুর, ঘাসের ডগায় সুখ শিশিরের বিন্দু, শালিকের-দোয়েলের-ময়নার মুখে সুখের কলকাকলি। হঠাৎ অবসাদে ছেয়ে গেল মন। আজ থেকে তবে আমার দায়িত্ব শেষ। নির্ধারিত কাজের সমাপ্তি। বড্ড ক্লান্ত মনে হলো নিজেকে। সদ্য স্বাধীন বাংলার শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছি আমি। টেপরেকর্ডার, ট্রানজিস্টর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে মহাসড়কে। এখন আর কী আসে যায়?

১৬ তারিখ রাতে যশোর রোডের ধারে একটা দোকানে বসে আমার রাজনৈতিক ধারাভাষ্য রেকর্ড করলাম। ইংরেজি ভাষায় সারা বিশ্বকে জানালাম আমরা স্বাধীন। তারপর সেই টেপটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে করে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে ওই ধারাভাষ্য প্রচারিত হলো। এরপর যশোর হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের উচ্ছ্বাস এবং সারা দেহ-মনে পরশ নিয়ে ফিরে এলাম কলকাতায়। তখনো শরণার্থীদের ঘরমুখী যাত্রা শুরু হয়নি। সাধারণ মানুষ তখনো বুঝে উঠতে পারেনি কী করবে? ভারত কিংবা বাংলাদেশ সরকার তখনো কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি এ ব্যাপারে। বাংলাদেশের সর্বত্র পরিস্থিতি তখনো সম্পূর্ণ স্থিতাবস্থায় পৌঁছেনি। কিছু কিছু স্থানে, যেমন—ঢাকার মিরপুর, রংপুরের সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট, খুলনার খালিশপুর—এসব এলাকায় যেখানে অবাঙালিদের সংখ্যাধিক্য ছিল,  সেখানে পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের পরও অস্থিরতা বিরাজ করছিল। বাংলাদেশের অবাঙালি অধ্যুষিত এসব এলাকায় যারা পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে বাঙালিদের হত্যা কিংবা নির্যাতন করেছিল, তারা তখনো মুক্ত বাংলাদেশের অনিবার্যতাকে কিছুতেই গ্রহণ করতে পারছিল না। সে কারণে বাংলাদেশের সর্বত্র নিরাপদে যাওয়া-আসা করা একধরনের সমস্যা ছিল বৈকি। স্মর্তব্য যে আমাদের বিজয়ের কিছুদিনের মধ্যে জানুয়ারির ৩০ তারিখে জহির রায়হান ঢাকার মিরপুরে পুলিশ পাহারায় প্রবেশ করেছিলেন তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারের খোঁজে। তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশের একজন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারও ছিলেন। কিন্তু নানা রকম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অবাঙালি কিছু বাংলাদেশবিরোধী এবং তাদের সঙ্গে ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের গুলিতে এঁরা সবাই শহীদ হন।

মনে পড়ে, ডিসেম্বরের ২২ কি ২৩ তারিখে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য ইংরেজিতে একটি রাজনৈতিক ধারাভাষ্য লিখি, যার শিরোনাম ছিল, ‘তুমি আজ কোথায়, পিতা?’ অত্যন্ত ভাবাবেগ আক্রান্ত এই ধারাভাষ্যে আমি লিখেছিলাম যে ‘যখন বাংলার আকাশ-বাতাস, বনভূমি এবং জলা বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা, তখনো কোন অদৃশ্য শঙ্কায় আমাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। কেননা তুমি এখনো আমাদের মাঝে নেই, পিতা!’ ক্রমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজ ক্ষীণ হতে হতে বন্ধ হয়ে গেল। তত দিনে বাংলাদেশের ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত বেতার কেন্দ্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমার কাজ শেষ। আমি কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। কিন্তু আমার যাওয়ার উপায় নেই। কেননা আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব তখনো শেষ হয়নি। আমার এখানে থাকতে ভালো লাগছিল না আর। ঢাকা শহর দেখার জন্য মন আকুল হয়ে উঠেছিল। দেখতে দেখতে জানুয়ারি মাস চলে এলো। আমার বিদায়ের দিনও এলো ঘনিয়ে। ৮ জানুয়ারি আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলাম যথাযথ কর্তৃপক্ষকে। এবার বাড়ি ফেরার পালা।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব



Add Comment

Click here to post a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.