মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

ট্রাম্প কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চান?-হাসান তারিক চৌধুরী

চীনের বিরুদ্ধে মার্কিনের অব্যাহত কূটনৈতিক ও সামরিক তত্পরতা কোনো দিনই থেমে ছিল না। বরং প্রতিদিনই তীব্রতা বেড়ে চলেছে।

ফলে অশান্ত হয়ে উঠছে এশিয়া এবং এ অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্র। নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য চিরস্থায়ী করার জন্য এশিয়াজুড়ে মার্কিন প্রশাসন এক প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেছে। চীনের বিরুদ্ধে এখন সে প্রভাব বলয়কেই কাজে লাগাচ্ছে পেন্টাগন। তাদের এই কূটনৈতিক কৌশলে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে এক সময়ের এশিয়ার চার উদীয়মান বাঘের একটি বলে কথিত তাইওয়ানকে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, এ নোংরা কাজটি তারা গোপনে নয়। বরং বেশ ঘটা করেই করছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত ১৩ ডিসেম্বরের তথ্য মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাইওয়ানকে অস্ত্রসজ্জিত করতে চায়। মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী আব্রাহাম ডেনমার্কের বরাত দিয়ে রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এখনো পর্যন্ত ওবামা প্রশাসন ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে চলছে। তবে আগামী ২০ জানুয়ারি নয়া মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব হাতে নিলে চীনের বিষয়ে পরবর্তী ভূমিকা কি হবে সেটি এখন বলা যাচ্ছে না। মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট করেই বোঝা যায়, আগামী দিনে চীনের ব্যাপারে মার্কিন ভূমিকা মন্দ ছাড়া আর কিছু হবে না। এ জন্যই তারা নতুন করে প্রবলভাবে তাইওয়ানকে অস্ত্রসজ্জিত করতে চাইছে। এ কারণেই এত বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘এক চীন নীতি’র ন্যায্যতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, চীনের সঙ্গে ব্যবসা না করলে এ নীতি মানতে হবে কেন? গত ২ ডিসেম্বর ট্রাম্প কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে তাইওয়ানের রাষ্ট্রপতি মিস সাই ইং ওয়েনের সঙ্গে ফোনালাপ করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছেন। জাতিসংঘে গৃহীত ২৭৫৮ প্রস্তাব অনুযায়ী ‘এক চীন নীতি’কেই এর সব সদস্য রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর ভিতরে রয়েছে। সে অনুযায়ী তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে, চীনকে ডিঙিয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধান তাইওয়ানের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলাপ-সংলাপ চালাতে পারেন না। ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি এভাবে তাইওয়ানের সরকার প্রধানের সঙ্গে কথা বলে এরকম নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করল।এ কাজটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনের বিরুদ্ধে শুধু নেতিবাচক তত্পরতা হিসেবেই বিবেচিত হয়নি, বরং এক ধরনের সামরিক উস্কানি বলেই বিবেচিত হয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন থেকেই প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে আসছে। মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী আব্রাহাম ওয়াশিংটনে ‘প্রজেক্ট ২০৪৯ ফোরামের’ এক সভায় সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। এ বিক্রির পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। কিন্তু এ অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ কত হবে এবং কখন সেটি সম্পন্ন হবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। তবে আব্রাহাম স্পষ্ট করেই বলেছেন, মার্কিনের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘তাইওয়ান রিলেশন অ্যাক্ট’-এর বলেই যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পাশে থাকবে। অর্থাৎ প্রয়োজনে তাইওয়ানে মার্কিনের সামরিক উপস্থিতিও হতে পারে।

‘এক চীন নীতি’র লঙ্ঘন চীনের জন্য বেশ স্পর্শকাতর। বিষয়টি তাদের সার্বভৌমত্বের সঙ্গেও জড়িত। নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আজকের দুনিয়ার অন্যতম পারমাণবিক শক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগামী দেশ চীন নীরব বসে থাকবে না। তাইওয়ান কার্ডটি ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পথেই হাঁটছে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ প্রশাসন। তাহলে কি মার্কিনের সঙ্গে চীনের সামরিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়েছে? এরকম প্রশ্নই এখন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা তো গত ১৪ জানুয়ারি খোলামেলাভাবেই লিখেছে যে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে চীন-মার্কিন যুদ্ধের কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তা হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? আলোচ্য দুটো দেশই পারমাণবিক শক্তিধর এবং বিরাট অর্থবলের অধিকারী। খুব স্বাভাবিকভাবেই এ দুটো দেশের মধ্যকার যুদ্ধ শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে তাদের উভয়েরই প্রভাব বলয়ভুক্ত দেশগুলোর মাঝে। সঙ্গত কারণেই এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এরপর এশিয়ার অন্য দেশগুলো। এভাবেই জন্ম হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার।

গত ১২ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা লিখেছে, ‘এক চীন নীতি’কে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প চীনের সঙ্গে যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছেন। ’ এরই মাঝে গত ১৪ ডিসেম্বর তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সংলাপের আয়োজক ছিল, যৌথভাবে  তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি এবং জাপান ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ। এ সংলাপের আলোচ্য বিষয় ছিল, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা জোরদার এবং নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রভৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের এসব কূটনৈতিক তত্পরতা চীনকেও সক্রিয় করে তুলেছে। যার ফলে গত ১২ জানুয়ারি চীনা কর্তৃপক্ষ মার্কিনের প্রতি করা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। মার্কিন রাজনীতির হিসাব মতে তাইওয়ানকে আপাতত চীনের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এ হাতিয়ার নয়া মার্কিন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে যেকোনো মুহূর্তে ফস্কে যেতে পারে।

লেখক : সম্পাদক, বিশ্ব গণতান্ত্রিক আইনজীবী পরিষদ।

ই-মেইল :  [email protected]

Add Comment

Click here to post a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.