মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

টেনাশিনাস থেকে এফটিপিও-চিন্ময় মুত্সুদ্দী

১৫ ডিসেম্বর টিভি চ্যানেলগুলোকে দেওয়া আলটিমেটাম শেষ হয়েছে। দাবি মানা না হলে চ্যানেলগুলোর সামনে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন টিভি প্রফেশনালরা।

অবস্থান নেওয়ার কর্মসূচি কবে শুরু হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। টেলিভিশনের অভিনেতা, অভিনেত্রী ও কলাকুশলীরা পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে রাজপথে নেমেছেন। শহীদ মিনারে সমাবেশ করেছেন ৩০ নভেম্বর। সেখান থেকেই তাঁরা তাঁদের দাবিনামা তুলে ধরেন। তাঁরা নতুন করে একটি সংগঠনও করেছেন। নাম দিয়েছেন ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অর্গানাইজেশন (এফটিপিও)। শিল্পী ও কলাকুশলীদের ১৩টি সংগঠন মিলে এই সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে। ডাবিং করা বিদেশি সিরিয়াল বন্ধ করতে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয় এফটিপিও। এই সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে চ্যানেলগুলোর সামনে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে টেলিভিশন শিল্পী ও কলাকুশলীদের সব দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে সংগঠনটি।

তাদের আন্দোলনের ধরনটা একটু আলাদা। সমাবেশে, মিছিলে উন্মাদনা নেই। নিজেদের বক্তব্য শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বলাটাই ছিল তাদের কর্মসূচি। আর চেষ্টা ছিল তিন রঙের পোশাক পরে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। শেষ পর্যন্ত সেটা আর পুরোপুরি হয়ে ওঠেনি বাস্তব কারণেই। পথচারীরা আকৃষ্ট হয়েছে। টিভির পর্দায় পরিচিত অনেক মুখ বাস্তবে একসঙ্গে এতজনকে দেখে টিভি দর্শকরা খুশি। তবে পাঁচ দফা নিয়ে তারা তেমন কৌতূহলী হতে পারেনি।

কী আছে ওই পাঁচ দফায়? পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে দেশের বেসরকারি চ্যানেলে বাংলায় ডাব করা বিদেশি সিরিয়াল ও অনুষ্ঠান বন্ধ করা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, ক্রয় ও প্রচারে ক্লায়েন্ট বা এজেন্সি বাদে চ্যানেলের অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া, টেলিভিশনশিল্পের সর্বক্ষেত্রে আগাম আয়কর বা এআইটি পুনর্নির্ধারণ, টেলিভিশনশিল্পে বিদেশি শিল্পী ও কলাকুশলীদের অবৈধভাবে কাজ করতে না দেওয়া এবং ডাউনলিংক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশি চ্যানেলে দেশি বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করা।

টিভির অভিনেতা, অভিনেত্রী ও অন্য কুশলীদের সংগঠন এটাই প্রথম নয়। প্রাইভেট টিভি হওয়ার পর আরো কয়েকটি সংগঠন হয়েছিল এবং নানা সময় টুকটাক দাবি-দাওয়া নিয়ে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তবে কখনোই মূল দাবি আদায় করা যায়নি। তাঁদের প্রথম সংগঠন টেনাশিনাস। তখন অবশ্য টিভিকেন্দ্র ছিল একটাই, বিটিভি। সেটিতে নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ছিলেন। এফটিপিওর আহ্বায়ক মামুনুর রশীদ টেনাশিনাস এবং পরের আরো কয়েকটি এ ধরনের সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন। সিনিয়র অভিনয়শিল্পী আবুল হায়াত, ড. ইনামুল হক, সৈয়দ হাসান ইমাম, এ টি এম শামসুজ্জামান, ডলি জহুর এখন রয়েছেন তাঁর সঙ্গে। আছেন তাঁদের পরের জেনারেশনের জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, তৌকীর আহমেদ, বিপাশা হায়াত, সাজু খাদেম, গাজী রাকায়েত প্রমুখ। সিনিয়র অভিনয়শিল্পীরা টেনাশিনাসে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবারও তাঁরা নেতৃত্বে আছেন বলে অনেকে আশাবাদী তাঁদের দাবি-দাওয়ার যৌক্তিক সমাধান হবে বলে।

টেনাশিনাস আমলের তুলনায় এবারের আন্দোলনকারীদের অবস্থান একটু ভিন্ন। প্রফেশনালস বলা হলেও পরিচালক ও অভিনেতা, অভিনেত্রীদের প্রায় সবাই একই সঙ্গে ব্যবসায়ী। তাঁরা নাটক ও অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেন, নির্মাণ করেন। ১০ বছর আগেও যখন প্রডাকশন হাউস বেশি ছিল না তখন একই নাটক একাধিক চ্যানেলে প্রচার করে প্রচুর মুনাফা করেছেন অনেকে। দর্শক ও ক্ষেত্রবিশেষে চ্যানেল মালিকরা এক ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অভিনেতা, অভিনেত্রীদের কেউ কেউ এমনটি করেছেন। চ্যানেল চালু রেখে বিজ্ঞাপনদাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষ শিল্পী-পরিচালক প্রভাবিত প্রডাকশন হাউসের কাছে অনেকটা আটকা ছিল। এখন সে পরিস্থিতি নেই। প্রডাকশন হাউস বেড়েছে, চ্যানেল মালিকরাও প্রডাকশনে চলে গেছেন। চ্যানেল বাড়লেও তাঁদের তাই জিম্মি করা যাচ্ছে না। এ সুযোগে কয়েকটি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নির্মাতাদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করে থাকে। অনেকটা বদলা নেওয়ার মতো।

একটি দাবি এরই মধ্যে পূরণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে ডাউনলিংক করা বিদেশি চ্যানেলে দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিল্প উপদেষ্টা সালমান রহমান। এফটিপিও থেকে পরে আরো সাতটি নতুন দাবি এসেছে, যেমন কপিরাইট প্রথা বাতিল, যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে প্রিভিউ কমিটি গঠন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ভুল টিআরপি ব্যবস্থা চালু, এফটিপিওকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া, ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল চালু ও দুই দেশে ডাউনলিংক ফির যে অসমতা রয়েছে তা অপসারণ করা।

মালিকরা ভাবছেন তাঁদের মুনাফার কথা। শিল্পী-কুশলীরা ভাবছেন তাঁদের স্বার্থের কথা। কিন্তু দর্শকদের কথা কেউ ভাবছেন না। দর্শকরা জিম্মি হয়ে আছে এ দুই পক্ষের স্বার্থের বেড়াজালে। মালিকদের মধ্যেও অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এটা অনেকটা শত্রুতার মতো। একজন অন্যজনকে ‘মানহানিকর’ বাক্য ছুড়ে দিচ্ছেন। এ কারণে এক মালিককে মামলা করতে হচ্ছে অন্য মালিকের বিরুদ্ধে।

ব্যবসা এখন দেশকেন্দ্রিক নয়, আন্তর্জাতিক। স্টার প্লাসে প্রাণ-আরএফএল বিজ্ঞাপন দিলে ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের টার্গেট করা যায় গ্রাহক হিসেবে। ব্যবসায়ীরা কেন এ সুযোগ নেবেন না? এ ক্ষেত্রে সেসব চ্যানেলের ডাউনলিংক ফি বাড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পণ্য নির্মাতা কোথায় বিজ্ঞাপন দেবেন সে স্বাধীনতা তাঁর থাকা প্রয়োজন। সরকার দেশের স্বার্থ রক্ষা করে নিয়মনীতি তৈরি করতে পারে। নিয়ম না মেনে অপরাধ করা হলে শাস্তির বিধান থাকবে। বন্ধ করা, নিয়ন্ত্রণ করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

টিভি নাটকের যে অবস্থা, দর্শক বিদেশি চ্যানেলের দিকে ঝুঁকবে না কেন? একটি কার্টুনে ঢাকা টিভির নাটকের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে, ‘পরিচালক দুই অভিনেতাকে বলছেন—শোনো, আধঘণ্টার নাটকে ১৫ মিনিট বিজ্ঞাপন। ১০ মিনিট তোমরা হাঁটতে হাঁটতে যা ইচ্ছা বলো। ততক্ষণে আমি ভাবি, বাকি পাঁচ মিনিট কী দেখাব!’ এই তো এখনকার বেশির ভাগ নাটক। আর এসব নাটকের হোতা কিছু এজেন্সি, যারা বিজ্ঞাপনদাতাদের এজেন্ট। এরা বিজ্ঞাপনদাতা ও নিজের স্বার্থ দেখতে গিয়ে টিভি নাটকের পুরো অবস্থানটি নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিদেশি সিরিয়ালমুখী না হয়ে দর্শক কী করবে? নাটকের বাজেট নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তার সমাধান করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে। ক্যাপিটাল ইকোনমির ফ্রি মার্কেটে পণ্যের দর ওঠানামা করবে, ক্রেতা চাইবেন কম দিতে, বিক্রেতা চাইবেন বেশি নিতে। সমঝোতা হবে একটা পর্যায়ে। চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই বেশি হলে দাম তো কমে যাবেই। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কাছে কম দামে নাটক-অনুষ্ঠান বিক্রি করে শিল্পী-কুশলীদের কেউ কেউ পরিস্থিতি নিজেদের বিপক্ষে নিয়ে গেছেন।

বিদেশি সিরিয়াল বন্ধ করার দাবিটি যৌক্তিক নয়। বাংলায় ডাব করা বিদেশি সিরিয়ালের সময় বেঁধে দেওয়া যায়। আলোচনার মাধ্যমে সপ্তাহে কত ঘণ্টা তা চালানো যাবে, নির্ধারণ করে সরকারি সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু প্রচার নিষিদ্ধ করা যায় না। এটা অনেকটা দরজা-জানালা বন্ধ করে কুয়োর মধ্যে বসবাস করার মতো। তাহলে তো বিদেশি ভাষার বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা যাবে না। শিল্পী-কুশলীদের অনুরোধ করব, নিজেদের পেশাগত ও ব্যবসার স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দর্শকদের জিম্মি করবেন না। নাটকের মান উন্নত করুন এবং অভিনয়ে আন্তরিক হন। সুবর্ণা মুস্তাফা বলেছেন, অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, চর্বিতচর্বণ গল্প দর্শকদের টিভিবিমুখ করেছে। তাঁর কথা অনেক মতামতের প্রতিধ্বনি। এফটিপিও যদি শিল্পী-কুশলীদের এজেন্সিনির্ভর নাটকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বিরত করতে পারে, তাহলে চ্যানেলগুলো সরাসরি নাটক নির্মাণে ফিরে আসবে। সে ক্ষেত্রে বাজেট বাড়বে এবং টিভি নাটক নির্মাণে মনোযোগ দেবেন নির্মাতারা।

এজেন্সিনির্ভর নাটক বিজ্ঞাপনদাতা, কমিশনপ্রাপ্ত এজেন্সি ও চ্যানেলের মুনাফা নিশ্চিত করছে। শিল্পী-কুশলীদের নানাভাবে বঞ্চিত করছে। ১৯৬৫ সালের পর তখনকার পাকিস্তানে ভারতের চলচ্চিত্র প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। তবে অন্য দেশের চলচ্চিত্র তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে দেখানো হতো সিনেমা হলে। ঢাকার নাজ সিনেমায় বিদেশের সদ্য মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র নিয়মিত দেখা যেত। বস্তুত এ হলে কেবল বিদেশের চলচ্চিত্রই চলত। এখন সাম্প্রতিক বিদেশি চলচ্চিত্র খুব বেশি পাওয়া যায় না। ঢাকার সিনেপ্লেক্সে কেবল আসে, তা-ও গড়পড়তার চেয়ে নিম্নমানের চলচ্চিত্র। এ ব্যবস্থায় ঢাকার চলচ্চিত্র বিষয় ও আঙ্গিকে ‘অসাধারণ’ হয়ে ওঠেনি। অন্য দেশের সাম্প্রতিক শিল্পচর্চার সঙ্গে পরিচয় থাকা নিজেদের সমৃদ্ধির জন্যই প্রয়োজন।

মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু কাদা ছোড়াছুড়ি হবে কেন?  দেখা যাচ্ছে মিডিয়া ইউনিটি করতে গিয়ে মিডিয়া ব্রেকিং হচ্ছে। কারো কোনো বক্তব্য পছন্দ না হলে পাল্টা বক্তব্য দেওয়া যায়। যে মিডিয়া অন্যের চরিত্র হননে দ্বিধা করে না, তারা দায়িত্বশীল মিডিয়া হতে পারে না। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক উভয় ক্ষেত্রে এ দায়িত্বহীনতা ক্রমেই বাড়ছে। সরকার বিদেশি সিরিয়ালের সময়সীমা নির্ধারণ করুক, নির্মাতারা কম মূল্যে নাটক না ছাড়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হোন, মালিকরা অবশ্যই সমঝোতায় আসবেন। তবে নাটকটি বিষয় ও আঙ্গিকে ‘নাটক’ হতে হবে। কার্টুনের নাটকের মতো হলে চলবে না।

আবুল হায়াত, আফজাল হোসেন, রেদওয়ান রণি, অমিতাভ রেজা, এস এ হক অলিক, আরিফ খান ও অন্য কয়েকজন পরিচালকের নাটক নিয়ে চ্যানেল আগ্রহ দেখায়, ঈদে তাঁরাই অনুরোধ পান চ্যানেল থেকে। সমস্যা আসলে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হওয়া। নতুন এমন অনেকেই নাটক নির্মাণে এসেছেন যাঁদের ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। তাঁদের অনেকেই আবার এজেন্সির পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন। সংকটটা এখানেই।

টিভি দেখতে লাইসেন্স ফি দিতে হয় না। একসময় বিটিভি দেখার জন্য লাইসেন্স লাগত, এখন লাগে না। তবে কেবল অপারেটরদের মাসিক ফি দিতে হয় দর্শকদের। যেহেতু দর্শকরা টিভি কর্তৃপক্ষকে কোনো ফি দেয় না, তাই তাদের প্রতি টিভি কর্তৃপক্ষ তেমন দায়িত্ব অনুভব করে না। সে কারণেই অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রচারে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। তাদের আয়ের পথ এটাই। প্রাইভেট কেবল টিভি পেইড টিভি হলে দর্শকবান্ধব নির্দিষ্ট নীতিমালা পালন বাধ্যতামূলক হবে। চ্যানেল মালিককেও বিজ্ঞাপনের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হতে হবে না। দর্শকরাও আয়ের উৎস হবে। কোন চ্যানেলের কত দর্শক তা সহজেই জানা যাবে। এতে ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা বাড়বে।

লেখক : সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক

Add Comment

Click here to post a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.