চট্টগ্রাম জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ

ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রতিনিধিদের আরও মনযোগ প্রত্যাশা উপকূলবাসীর

সালেহ নোমান, সন্দ্বীপ থেকে ফিরে: বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে সবচেয়ে বেশি হুমকীতে থাকা ১৫টি দেশের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এই হুমকী মোকাবেলায় যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তার কাঙ্খিত সুফল পাচ্ছে না উপকূলের ভূক্তভোগীরা।

সরজমিনে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে ভাঙ্গণ এবং সামুদ্রিক জোয়ারের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতিকে এখনো অবধারিত নিয়তি বলে বিবেচনা করা হচ্ছে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে। এই অবস্থার অবসান চান উপকূলবাসীরা। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই বিষয়ে আরো মনোযোগী হবে না বলেও আশা করছেন তারা।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে বর্তমান উপকূলীয় এলাকার ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার হয়েছেন। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পানি, মাটি ও ফসলের ওপর৷ উপকূলীয় মানুষ হারাচ্ছে বাসস্থান, বাড়ছে পানীয় জলের সংকটও৷

সরজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে কাছের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের সমুদ্রের ভাঙ্গন ও জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার জন্য আড়াইশ কোটি টাকা ব্যায়ে ৪০ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

দ্বীপটির পশ্চিম উপকূলের পৌরসভার এলাকার বাসিন্দা দিনমজুর নুর উদ্দিন (৩৫) এই প্রতিবেদককে জানান, জীবনে চারবার সমুদ্রের ভাঙ্গনে ঘরবাড়ী হারিয়েছেন, বর্তমানে স্বাভাবিক জীবন যাপনে সংকট এত বেশি যে ওই এলাকায় মৃতদের জন্য কবরের জায়গাও জুটছেনা।

নুর উদ্দিন বলেন, আমরা ঘুরে ফিরে বেড়ি বাঁধের আশপাশে থেকে গেছি, আর কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য নেই। সমুদ্র তীরে এটা ওটা করে জীবিকা নির্বাহ করি।জোয়ার- ভাটা ভাঙ্গন এসব আমাদের কপালের লিখন।

“নতুন বেড়ি বাঁধের কারণে ভাঙ্গন কমবে, বাধেঁর ভিতরে জোয়ার- ভাটার প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু এলাকায় রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ কালভার্ট সব কিছুর অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে বসবাসের সবচেয়ে বেশি সংকট কবরস্থানের। কেউ একজন মারা গেলে কবর দেওয়ার জায়গা পাওয়া যায়না। অনেক দূর দুরান্তে নিয়ে যেতে হয়, উল্লেখ করেন তিনি।

নুর উদ্দিন জানান, বর্তমানে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য আছেন, এর আগে বিএনপির সংসদ সদস্যও ছিলেন, তখনও তাকে বলা হয়েছিলো, কিন্তু সমাধান এখনও হয়নি।

জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীরা উপকূলের দূর্গম এলাকাগুলোতেও যান ভোটের জন্য, দিয়ে আসেন নানা রকম প্রতিশ্রুতিও। কিন্তু শেষ পযন্ত দৃষ্টির বাইরে থেকে যান উপকূলের হতভাগ্য বাসিন্দারা।

রাইহানা বেগম রেখা (৪৫) নামের সন্দ্বীপের দক্ষিণে সারিকাইত ইউনিয়নের বেড়ি বাঁধের এক বাসিন্দা জানান, নদী ভাঙ্গনের পর যাদের সামর্থ্য ছিলো তারা অনত্র‌্য চলে গেছে। বেশির ভাগই ঝড় জলোচ্ছাস মাথায় নিয়ে এখানে থেকে গেছে। বর্ষার জোয়ারে রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যায়।সমুদ্রের নোনা পানি ডুকে ঘরের ভেতর। এভাবেই জীবন যাচ্ছে।

“মাঝে মধ্যে নেতারা আসেন, রাস্তা-ঘাট না থাকায় সব সময় আসেননা তারা। এসে আমাদেরকে জিজ্ঞাস করেন, আমরাও বলি চাহিদার কথা। তবে, পূরণ হয় থুবই সামান্য। কে কোন উদ্দেশে আসেন তাও বুঝা যায়না, আর কে আসল নেতা কে নকল নেতা, তাও বুঝা মুশকিল, উল্লেখ করেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য লড়াই চলছে দেশের উপকূলীয় দশটি জেলায়। ২০১০সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সাংগঠনিকভাবে কাজ চলছে বাংলাদেশে।এরজন্য ব্যয়ও করা হয় জিডিপির এক শতাংশ। প্রচুর অর্থ ব্যায়ে নানা প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব থাকায় সেই সম্পর্কে তেমন ধারনা নেই উপকূলের জনগনের মধ্যে। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বিরোধের কারণে, এসব প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেনা ভুক্তভোগিরা। যার দৃষ্টান্ত সন্দ্বীপ পৌরসভার সমুদ্র তীরের ওয়ার্ডগুলো।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও আওয়ামীলীগ নেতা মোকতাদের মাওলা সেলিম জানান, “পৌরসভা এলাকায় সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রকল্পে এসেছিলো, কিন্তু সংসদ সদস্যের সাথে পৌরসভার মেয়র কাউন্সিলদের দূরত্ব থাকায় এসব প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। উন্নয়নের মূল ভূমিকা রাখেন সংসদ সদস্য। কিন্তু স্থানীয় প্রতিনিধিরা সাংসদের সাথে সমন্বয় না রাখায় পুরো পৌরসভা অন্য এলাকার তুলনায় কম উন্নয়ন হয়েছে।”

“এখন সন্দ্বীপে ভাঙ্গন অনেক কমে গেছে, অবিলম্বে পৌরসভার সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় কয়েকটি ব্রীজ- কালভার্ট ও রাস্তা হওয়া দরকার।আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মিতা কথা দিয়েছেন পুনরায় নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব নির্মাণের উদ্যোগ নেবেন, উল্লেখ করেন মোহাম্মদ সেলিম।

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমুদ্রের ভাঙ্গণ, ঝড়- জলোচ্ছাস এবং লবণাক্ততায় মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে প্রার্থীদের সুস্পষ্ট অঙ্গিকার প্রত্যাশা করছেন উপকূলের বাসিন্দারা।

 

জুমবাংলানিউজ/একেএ