মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

জীবনের তাগিদে ওই পথে আমাকে হাঁটতে হয়েছে

হ্যাঁ আমি পুরষ না, আমি নারীও নয় । চারপাশের মানুষ নাম দিয়েছে হিজড়া । এটা হয়ত কোন উপাধি বা বিশেষন নাকি ঘৃণার গালি সেটা আমি জানিনা । স্বাভাবিক মানুষ বলতে সবাই যেটা বুঝে সেটা আমি নয়।সৃষ্টিকর্তা খানিকটা আলাদা করে আমাকে বানিয়েছেন। সেটাতে আমার হাত ছিলনা ।

কেন আমাকে বয়ঃসন্ধিকালের পর থেকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে । অপবাদ, কুটুক্তি, তুচ্ছতা আর ঘৃণা সহ্য করতে হচ্ছে ।যে বয়সে আমার স্কুল-কলেজের বই খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, ভাই-বোন আর পাড়ার তুহিন তামিমদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সে কেন আমাকে ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতে হলো। আমার পরিবার আমার পরিচয় গোপন রাখতেন কারন আমার পরিচয় দিতে লজ্জা পেতেন। সেই লজ্জার পেছনে আমার কি দোষ ?

বাবা আজ পর্যন্ত সন্তান হিসেবে আমাকে পরিচয় দিতে সংকোচতা করেন। শধুই বাবাই নন, ভাই, বোন, পাড়া, প্রতিবেশি কিংবা আত্মিয় স্বজন কারর কাছেই বিন্দুমাত্র সহমর্মিতা পায়নি। আমার পরিবার আর চারপাশ থেকে যে বিদ্রুপ আর ঘৃণা পেয়েছি তাতে আমাকে বাধ্য করা হয়েছে বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে।

হিজড়া দলে যোগ দিয়ে আমাকে শিখতে হয়েছে অনেক কিছু, অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছে ।শিখতে হয়েছে রাস্তার মোড়, স্ট্যান্ড, হাট বাজার কিংবা বাসা বাড়িতে মানুষের কাছে হাত পাততে ।  ভিক্ষা করা ব্যপারটা খুবই লজ্জাজনক আর কঠিন ছিল আমার কাছে । অবশ্য যার কাছে ভিক্ষা চাইছি তার জন্য ব্যপারটা কঠিন নয় । কেউ টাকা নেই বলে পাশ কাটিয়ে চলে যায় আবার কেউ ভয়ে পকেট থেকে পাঁচ-দশটাকা বের করে দিচ্ছে আর মনে মনে গালি দিয়ে চলে যায় । আমার পরিবারের কেউতো অন্যের কাছে হাত পাতেনা, ভিক্ষা করেনা । আর আমাকে ভিক্ষার জন্য গালি শুনতে হয় । তাতে আর করার কি আছে । পেট তো আর গালি বোঝেনা ।

আমাদের কোন কাজ, চাকুরি কেউ দেয়না । কিন্তু পেটের ক্ষিধে তো সেটা শুনবেনা । যে দিন ভিক্ষা করে খাবার যোগাড় হতো না,সে দিন বাধ্য হয়ে কাউকে আনন্দ দিতে হতো  । যৌনতাকে আমি সাধ করে গ্রহন করিনি, জীবনের তাগিদে ওই পথে আমাকে হাঁটতে হয়েছে । এ সময় নিজের প্রতি আমার ভীষণ ঘেন্না লাগে আর সবার প্রতি আমার ঘৃণা হয়।

আমার ছোট ভাই আর মায়ের জন্য প্রত্যেক রাতেই কাঁদি । রাতে আমার ছোট ভাই আমাকে ঘুমাতে দেয়না । ভাইয়ের কথা মনে হলে চোখ থেকে ঘুম চলে যায়।রাস্তায় যখন দেখি ছোট বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে কিংবা খেলাধুলা করছে তখন আর নিজেকে সামলাতে পারিনা, চিৎকার করে কাঁদি ছোট ভাইয়ের জন্য ।এভাবেই সুজন (ছদ্ম নাম) তার সখি হওয়ার গল্প শোনালেন ।

শেরপুর জেলা হিজড়া নেত্রী রিতা রাণী বলেন,  আমাদের প্রতি মানুষের অভিযোগের শেষ নেই ।  টাকা চাওয়া, হাট বাজার থেকে তরিতরকাড়ি চাওয়া, অশ্লীল চালচলন এমন বহু অভিযোগ ।  কিন্ত টাকার জন্য দুদিন না খেয়ে থাকলে তখন ভাল মন্দ যাচাইয়ের জ্ঞান থাকেনা । তখন হাতপাতা ছাড়া আর উপায় থাকেনা ।  আমার মেয়েরা চুরি, জোড় করে কিছু আদায় করে নেওয়া, ঝগড়া বিবাদ, মাদকের সাথে জড়িত নয় ।  সরকারের কাছে আমাদের দাবি, মাসিক নূন্যতম একটা ভাতার ব্যবস্থা করে দিলে আমরা কোনরকম খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারবো ।

হিজড়া সখি খানম আক্ষেপ করে বলেন, নাচ গান আর চেয়ে খেয়ে কোন রকম বেঁচে আছি । সরকারের কাছে দাবী , সমাজে আমাদের চলার মত একটা ব্যবস্থা করে দেন ।

সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান আনোয়ারা-ই-তাসলিমা প্রথা বলেন, হিজড়াদের নিয়ে সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহন করেছে । আমাদের পরিবার , সমাজ, রাষ্টে তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে । তবে বিভিন্ন সময় তারা যৌন হয়রানী,  মাদক, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে ।

লেখক : নাঈম ইসলাম