আইন-আদালত জমিজমা সংক্রান্ত জাতীয়

জমির নামজারি কী? কেন প্রয়োজন? আসুন জেনে নেই বিস্তারিত…

মো: মাহামুদুল হাসান: ভূমি অফিসে আজও যে বিষয়গুলি মানুষের ভোগান্তির বড় কারণ তার মধ্যে অন্যতম হলো নামজারি। প্রতি বছর দেশে প্রায় ২২,০০,০০০ (বাইশ লক্ষ) নামজারি মামলা দায়ের হয়। এই নামজারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য জনগণকে যে কি দুর্ভোগ পোহাতে হয়  তা ভুক্তভোগীরাই ভালো করে জানেন। আসুন আজ জেনে নেই জমির নামজারি কি এবং একজন জমির মালিকের জন্য নামজারি করা প্রয়োজন কেন? কোথায়, কিভাবে এবং কত ফি দিয়ে নামজারি করা হয় সেটাও জেনে নেই।

নামজারি কি এবং কেন করতে হয়?

আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হতে পারি এবং হতে পারি ক্রয়সূত্রে। অন্যভাবেও জমির মালিক হতে পারি। একজন ব্যক্তি যেভাবেই বা যে সূত্রেই জমির মালিক হোক না কেনো তাকে প্রকৃত মালিক হতে হলে তার নামে জমি রেকর্ডভুক্ত করতে হয় এবং তার নামে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয়। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি জমির মালিকানা অর্জন করলে এবং সেই মালিকানা ধরে রাখতে চাইলে তার নামে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয়। আর ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার জন্য জমির স্বত্বলিপি সংশোধন করে পুরাতন মালিকের নামের জায়গায় নতুন মালিকের নাম প্রতিস্থাপন  বা রেকর্ডভুক্তকরণ করতে হয়। জমির নতুন মালিকের নাম রেকর্ডভুক্তকরণের আইনানুগ প্রক্রিয়াকে নামজারি (Mutation) বলে। যদি সহজ কথায় বলি তাহলে বলা যায়-কোনো কারণে জমি হস্তান্তর হলে খতিয়ানে পুরোনো মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম প্রতিস্থাপন করানোকে বলে মিউটেশন বা নামজারি।

উত্তরাধিকারসূত্রে, বিক্রয়, দান, খাসজমি বন্দোবস্তসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তান্তরের কারণে জমির মালিকানা প্রতিনিয়ত বদল হচ্ছে।  কিন্তু জমির নামজারি সঠিক সময়ে না করানোর কারণে মালিকানা দাবি করা নিয়ে  অনেক জটিলতা তৈরি হয়। যেসব কারণে সরকার জমির  নামজারি বাধ্যতামূলক করেছে-

১।  জমির মালিকের মৃত্যু কারণে ওয়ারিশগণের নাম রেকর্ডভুক্ত করে রেকর্ড সংশোধন এবং ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করতে;

২।  রেজিস্ট্রি দলিলমূলে জমি হস্তান্তরের কারণে নতুন মালিকের নাম রেকর্ডভুক্ত করতে;

৩।  জমি সিকস্তি হলে অথবা প্রজাস্বত্ব আইনের ৯০,৯১,৯২,৯৩ ধারার অধীনে জমির মালিকানা স্বত্ব বিলোপ হলে তা খাস খতিয়ানভুক্ত করে রেকর্ড সংশোধন করতে;

৪।  সার্টিফিকেট মোকদ্দমা অথবা দেওয়ানি মোকদ্দমার মাধ্যমে জমি নিলাম খরিদ ও স্বত্ব ঘোষনা করা হলে রেকর্ড সংশোধন করতে;

৫। খাস জমি সরকার কর্তৃক স্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে রেকর্ড সংশোধন করতে এবং

৬। সরকার কর্তৃক ক্রয়কৃত বা অধীগ্রহণকৃত জমির রেকর্ড সংশোধন করতে।

কোথায় নামজারি করা হয়?  

নিজ নিজ উপজেলার কিংবা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারির জন্য আবেদন করতে হয়। প্রত্যেকটা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে মিউটেশন সহকারী পদের একজন দায়িত্বে থাকেন। নাজির পদের একজন নামজারির জন্য ফি জমা নেন। ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে তহশিলদারেরা (সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা) নামজারির তদন্তের দায়িত্বে থাকেন। কোনো আবেদন করা হলে এ নামজারি করা জমির ওপর তদন্ত করার নিয়ম আছে। অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে তহশিলদারের অফিসে নামজারি আবেদন করে থাকেন। এটা ঠিক নয়।

যেভাবে নামজারির আবেদন করতে হয়?

সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে নির্ধারিত আবেদনপত্র সংগ্রহ করে আবেদন করতে হবে। এতে নির্ধারিত জায়গায় জমির বিস্তারিত পরিচয় দিতে হবে। আবেদনে নাম, ঠিকানা, রেজিস্ট্রি ক্রয় দলিলের নম্বর ও সাল স্পষ্ট থাকতে হবে। একই সঙ্গে মূল দলিলের অনুলিপি, ভায়া দলিল, পরচা বা খতিয়ানের অনুলিপি, ভূমি-উন্নয়ন কর পরিশোধের দলিল, ওয়ারিশান সনদপত্র (তিন মাসের মধ্যে ইস্যু করা), বণ্টননামা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) দিতে হবে। কোনো রায় বা ডিক্রির কারণে নামজারি করতে হলে ডিক্রি বা রায়ের অনুলিপি জমা দিতে হবে। আবেদনকারী নিজেও আবেদন করতে পারেন অথবা আবেদনকারী কোনো প্রতিনিধি নিয়োগ করেও আবেদন করতে পারেন। আবেদনের সঙ্গে আবেদনকারী অথবা আবেদনকারীর প্রতিনিধির পাসপোর্ট আকারের ছবি সংযুক্ত করে দিতে হবে আবেদনের নির্ধারিত জায়গায়। খেয়াল রাখতে হবে নামজারি করাতে গিয়ে কোনো দালালের খপ্পরে যেন না পড়েন। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী মহানগরের ক্ষেত্রে ৪৫ কর্মদিবসে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে নামজারি-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নিয়ম করা হয়েছে।

নামজারির জন্য নির্ধারিত ফি কত?

একজন সাধারণ মানুষ একটি জমির নামজারি করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়ে সেটা হলো জমির নামজারি করতে তার কত ফি লাগবে সেটা না জানা। আর এই না জানার সুযোগ নেয় ভূমি অফিসের স্টাফ এবং দালালরা। তারা তাদের মন মতো ফি আদায় করে। তাই ফি’র বিষয়টা ভালোভাবে জানা দরকার। জানা থাকলে অতিরিক্ত ফি এবং ঘুষ না দিয়েই জমির নামজারি করা যায়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিপত্রমূলে নামজারির আবেদনের জন্য কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিস জারি ফি ৫০ টাকা, রেকর্ড সংশোধন ফি ১০০০ টাকা এবং প্রতি কপি মিউটেশন খতিয়ান সরবরাহ ফি ১০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি নামজারি সম্পন্ন করার জন্য মোট ১১৭০ টাকা দরকার। কোন ভূমি অফিস যদি এর বেশি  টাকা দাবী করে তাহলে মনে করবেন সেটা অতিরিক্ত ফি এবং ঘুষ।

 

জুমবাংলানিউজ/এইচএম