জাতীয়

চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তরা চাকরিচ্যুত

ভয়াবহ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রত্যেক দিনই হাসপাতালগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ছে। রাজধানীর এমন কোনো পরিবার নেই, যেখানে মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত অন্তত একজনের সন্ধান পাওয়া যাবে না। নানান শ্রেণি-পেশার কোটি কোটি মানুষের এই নগরীতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন বস্তিবাসীরা। তাদের মধ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছে চিকুনগুনিয়া।

অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীর গা-ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কড়াইল বস্তি। প্রায় ১৭০ একর আয়তনের এই বিশাল বস্তিতে অন্তত সাড়ে ৭ লাখ মানুষের বসবাস। বস্তির ছোট্ট খুপড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরের বাসিন্দারা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। কোনো কোনো ঘরের একাধিক সদস্য ধুঁকছেন ভয়াবহ এই রোগে। চিকুনগুনিয়ার জ্বর শেষে শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথায় দীর্ঘদিন পরও অনেকে শয্যাশায়ী। চলাফেরায় সমস্যার কারণে কাজেও যেতে পারছেন না কেউ কেউ। রোগা শরীরের ওপর কর্ম হারিয়ে আরেক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কড়াইল বস্তির নিম্নআয়ের অনেক মানুষ। বাসাবাড়িতে কাজ করা অনেকেই দীর্ঘদিন যেতে না পেরে হারাচ্ছেন কাজ।

কড়াই বস্তি ঘুরে দেখা যায়, একই পরিবারের অনেকেই চিকুনগুনিয়ায় ভুগছেন। ৩ থেকে ৭ দিন জ্বর থেকে সেরে উঠেও শারীরিক প্রচণ্ড ব্যথার যন্ত্রণায় ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না। আবার অনেকেই অসুস্থ শরীর নিয়েই চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য যাচ্ছেন অফিসে। এতো কষ্টের মাঝেও পরিবারের কাজ সামলাচ্ছেন তারা।

মা নূর নাহারের সঙ্গে কড়াইল বস্তিতে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন নুরুল আমিন (২৮)। বস্তিতেই কেটেছে তার শৈশবের সুন্দর দিনগুলো। বস্তিতেই স্ত্রী তানিয়ার সঙ্গে পেতেছেন সংসার।
স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক। বৃদ্ধ মা এখনো মানুষের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন।

নুরুল আমিন জানান, এক মাস আগে হঠাৎ করেই জ্বর আসে তার মা নূর নাহারের। একদিন দু’দিন পার হলে জ্বর না থামায় বস্তির সাধারণ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তারা। তিনি প্যারাসিটামল দিয়ে পাঠিয়ে দেন।
তিনি জানান, ঈদের আগে হঠাৎ করেই তার মা নূর নাহারের খুব জ্বর আসে। রাত ৯টায় মহাখালীর একটি হাসপাতালে নেন তারা। সেখানে চিকিৎসক দেখানোর পর জানতে পারেন তার মায়ের চিকুনগুনিয়া রোগ। দু’তিনদিন পর জ্বর কমলেও এক মাস বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না তিনি। এরই মধ্যে একই রোগে আক্রান্ত হন নুরুল আমিন নিজে এবং তার স্ত্রী।

কাজ হারালেন বৃদ্ধা নূর নাহার
নুরুল আমিনের মা অসুস্থতার কারণে আগে যে বাড়িতে কাজ করতেন, সেখানে গিয়ে দেখলেন অন্য একজন কাজ শুরু করেছেন। বাড়ির মালিক তার অনুপস্থিতিতে আরেকজনকে নিয়েছেন। তিনি কর্মহীন হয়ে পড়লেন। এখন তার ছেলে ও বউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে তারাও কারখানায় কাজে যেতে পারছেন না। ছেলে সুস্থ হলেও শরীরে ব্যথা থাকার কারণে হাঁটা-চলা করতে পারেন না। একটু হাঁটলেই হাঁপাতে থাকেন। ছেলে নুরুল আমিন ও বউ তানিয়ার এই অবস্থায় কারখানায় গিয়ে কাজ করাটাও সম্ভব নয়। তারপরও নুরুল আমিন অফিসে গিয়েছিলেন কাজ করার জন্য। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। নুরুল আমিন জানান, এক সপ্তাহ আগ থেকেই চিকুনগুনিয়া জ্বরে ভুগছেন। জ্বর সেরে গেলেও শরীরের অন্যান্য উপশমগুলো ভাল হচ্ছে না। যেমন শরীর ব্যথা, হাঁটা-চলা করতে না পারা, মাথা ঘুরানো, শরীর ঝিমঝিম করা এগুলো ছাড়ছেই না।
তারা সুস্থ হলেও দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে ওই কারখানায় নতুন লোক নেওয়া হবে বলে তারা আভাস পেয়েছেন। চিকুনগুনিয়ার পর এখন তারা চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছেন।

চাকরিচ্যুতির ভয়ে ডাবল এন্টিবায়োটিক!
অসুস্থতার কারণে শ্রমজীবিদের অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার দিন যাপন করছেন। আর যারা দিনমজুর, তারা জ্বর সেরে সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসলেও শরীরের নানান অংশে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছেন না। কারো কারো শরীরে চুলকানি, পেট ব্যথা, ফুলে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। তবে শরীরের গিরায় গিরায় অসহ্য ব্যথা থাকার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই স্থানীয় ফার্মেসি থেকে এন্টিবায়োটিকের মতো ঔষধ সেবন করে যাচ্ছেন নিয়মিত। এ রকম কয়েকজন জানান, ভাল না হলে কাজে যাব কিভাবে? দ্রুত সুস্থ হতে পারলে চাকরিটা অন্তত বাঁচবে। তাই তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই হাই-এন্টিবায়োটিক সেবন করে যাচ্ছেন।

সালেহার পরিবারে সবাই আক্রান্ত
কড়াইল বস্তির শেরপুর পট্টির টিনশেড বাসার দোতলার এক রুমে থাকেন সালেহা (৪০), নুপুর (১৭) ও মাহফুজা (১২)। নুপুর ও সালেহা গামেন্টকর্মী। মাহফুজা বাসায়ই থাকেন। তিনজনই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেরে উঠলেও নুপুর এখনো কাজে যেতে পারছেন না। তারা সারা শরীরেই তীব্র ব্যাথা। চাকরি ঠেকাতে এই অবস্থাতেই কাজ যোগ দিয়েছেন সালেহা। এমনিভাবে অনেক পরিবারেরই কেউ না কেউ চিকুনগুনিয়ায় ভুগছেন। এদের বেশিভাগেরই বয়স ১৬ থেকে ৫৫ বছর। তবে মধ্যবয়সী মহিলা ও ছেলেদের সংখ্যাই বেশি। দৈনিক আয়ে যাদের সংসার চলে, এমন অনেকেই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৫ দিনেও কাজে ফিরতে পারছেন না।
বস্তিতে থাকা সুলাইমান, সবুজ, কামাল, আলমগীর, শফিউল্লাহ, শাহ আলম, বাহার, সুমন-১, সুমন-২, সালমান, সজল, নুর ইসলামসহ ১৭ জন দিনমজুরের সন্ধান পাওয়া গেল, যাদের অনেকেই জ্বর ছাড়ার পরও কাজে যেতে পারছেন না। এদেরই একজন সুলাইমান (৩৪)। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ শেরপুর থানায়। কুড়িল বস্তির কুমিল্লা পট্টিতে ১৪ বছর ধরে বসবাস করছেন।
সুলাইমান বলেন, ‘ভাই, আমরা দৈনিক আয়ে চলি। আগেও অনেকবার জ্বর হইসিল। কিন্তু এইবারের জ্বরে জানটা শ্যাস হইয়া গ্যাছে। জ্বর সারলেও শরীরের ব্যথা নিয়ে দাঁড়াইতেই পারি না। খাবারের রুচি নাই। কাজে কবে যাইমে পারমু তার ঠিক নাই।’ তিনি বলেন, ‘এই বস্তির ১৭ জন একসঙ্গে কাজ করতাম। ২০ রমজানের পর আমাদের গ্রুপের একসঙ্গে ৮ জনের জ্বর হয়। পরে সবার একই অবস্থা। অনেকেই কাজে ফিরতে পারে নাই। এই অবস্থায় পরিবার নিয়া বস্তিতে থাকাটাও কঠিন হইয়া পড়ছে।’ এদিকে, নাতিকে দেখতে এসে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন মালেকা বেগম (৬০)। তিনি জানান, পাঁচ দিন আগে নাতিকে দেখতে গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছেন। আসার পর থেকেই জ্বরে ভুগছেন। কিন্তু শরীরে এতো ব্যথা যে বিছানা থেকে উঠতেই পারছেন না। বাড়িতে যাবার সাহসও হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, ‘শরীরের গিরায় গিরায় ব্যথা আর ব্যথা। জীবনে অনেক জ্বর হইছে। কিন্তু এমন জ্বর আর ব্যথা কখনো হইনি।’

বস্তির ফার্মেসিতে আক্রান্তদের ভিড়
কড়াইল বস্তির ফার্মেসিগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের ভীড়। অনেকেই এসেছেন জ্বর নিয়ে। তাদের শরীর দেখে ও কথা শুনে সেখানকার চিকিৎসকরা ওষুধ দিচ্ছেন। তেমনি এক ফার্মেসির চিকিৎসক নুরুল আলম জানান, প্রতিদিন ৬০ জনের মতো লোক তার কাছ থেকে জ্বরের ওষুধ নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনেকের বয়স ৩০ এর মধ্যে। তাদের জ্বর প্রায় ১০২ ডিগ্রি থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্তও দেখা যায়। জ্বর সেরে গেলেও শরীরে ব্যথা নিয়েই অনেকে আসে। যাদেরকে সিরিয়াস মনে হয় তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। বস্তির বয়স্ক কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাস খানেক হলো এই বস্তির অনেকে এই জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছেই। যাদের এই রোগ হচ্ছে তাদের অনেকেই দীর্ঘ অসুস্থতার জন্য চাকরি হারাচ্ছেন।