মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

গার্মেন্টে শ্রমিক অসন্তোষ কেন?-ড. হারুন রশীদ

টানা শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা কোনো পক্ষের জন্যই মোটেও সুখকর নয়। এক অমিত সম্ভাবনা হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক খাত।

আমাদের অর্থনীতির গতিপ্রবাহ অনেকটাই ঠিক থাকে পোশাক খাত থেকে আসা রেমিট্যান্সে। পোশাককর্মীরা এ ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখে চলেছে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর চলছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে একালের জীবনযোদ্ধা পোশাককর্মীরা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, পোশাক খাতের উন্নতি হলেও এই খাতের শ্রমিকদের জীবনমানের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। এ জন্যই নানা সময়ে অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে।ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন করছে ঢাকার আশুলিয়ার তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। গত রবিবার থেকে চলা এই আন্দোলন নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন সরকারের মন্ত্রী, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মালিকরা বলছেন, পোশাককর্মীরা কাজে যোগ দেবে মর্মে সমঝোতা হয়েছিল। তিন বছর আশুলিয়া অঞ্চলে শ্রমিকদের বাসাভাড়া বাড়ানো হবে না এমন প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়নি। ২০১৩ সালের সর্বশেষ মজুরি বোর্ডের বেতন অনুসারে শ্রমিকরা পায় পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা। শ্রমিকরা ন্যূনতম পাঁচ হাজারের বদলে তাদের বেতন ১৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছে। এ ছাড়া নিয়ম অনুসারে গ্র্যাচুইটি পায় না শ্রমিকরা। প্রয়োজন পড়লে ছুটিও পায় না। ছুটি দিলেও বেতন দেওয়া হয় না। কথায় কথায় ছাঁটাইসহ নানা অনিয়ম তো রয়েছেই। রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশনসের মতো কারখানায় মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পরও এখানকার শ্রমিকদের সে তুলনায় ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। মালিকপক্ষ বলছে, বর্তমান জীবনযাত্রা অনুযায়ী শ্রমিকরা যে বেতন পাচ্ছে, সেটি ন্যায্য।

শ্রমিকরা কাজ না করায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ জন্য বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে কারখানাগুলোর পোশাক রপ্তানি। বন্ধ কারখানাগুলোতে দিনে কমপক্ষে এক কোটি মার্কিন ডলারের  পোশাক উৎপন্ন হয়। বন্ধ থাকায় উৎপাদনও বন্ধ। অন্যদিকে কারখানা বন্ধ থাকলে পোশাককর্মীরাও বেতন পাবে কি না সেটিও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের একের পর সমৃদ্ধি ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়েনি শ্রমিকের জীবনমান। উল্টো একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের জীবন যাচ্ছে অকাতরে, যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিকের করুণ মৃত্যু। এ ছাড়া ২০০৫ সালের পর শুধু অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনায়ই প্রাণ হারিয়েছে ছয় শতাধিক শ্রমিক। এসব ঘটনায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে সারা বিশ্বে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর পরিবেশ নিয়ে অভিযোগও নতুন নয়। বহুদিন থেকেই এ ব্যাপারে ট্রেড ইউনিয়নগুলো সোচ্চার। কিন্তু যেভাবে পোশাকশিল্পের উন্নয়ন হয়েছে, সে তুলনায় শ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। পরিস্থিতির যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তা-ও বিদেশি বায়ারদের নানা শর্ত পূরণ করতে গিয়ে। অর্থাৎ বিদেশি ক্রেতারা শ্রমিকের জীবনমান নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন না তুলত, তাহলে মালিকপক্ষ এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ভূমিকা নিত কি না সন্দেহ।

সত্যিকার অর্থে শ্রমিকের ইতিহাস হচ্ছে বঞ্চনার ইতিহাস। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও কাজের নিশ্চয়তা প্রদানের বিধান রেখে জাতীয় শ্রমনীতি ২০১৩ প্রণীত হয়েছে। শ্রমনীতিতে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ন্যূনতম ১০০ শ্রমিক থাকলেই সেখানে ইউনিয়ন করা যাবে।   এ ছাড়া বলা হয়েছে, নয়া নীতি অনুযায়ী, পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের বেতনবৈষম্য দূর করা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি বা পুনর্নির্ধারণ এবং স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন করার কথাও বলা আছে।   পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতের সব শ্রমিকের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও অবসর ভাতা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে দেশে শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ লাখের ওপরে। এর মধ্যে গার্মেন্ট খাতেই শ্রমিক রয়েছে ৪০ লাখেরও বেশি। দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা বঞ্চনার শিকার। দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করে অনেক শ্রমিকই ন্যায্য মজুরি পায় না। তার ওপর বেতন বকেয়া, কথায় কথায় ছাঁটাই, লক-আউট ইত্যাদি কারণেও শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত থাকে না। আবার অনেক কারখানার কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পোশাকশিল্পের মতো শ্রমঘন একটি শিল্পে মালিক-শ্রমিকের মধ্যে আস্থার সংকট প্রকট।

পোশাকশিল্পের মালিকরা অনেক সময় বলে থাকেন যে তাঁদের একতরফা দোষারোপ করা হয়। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে তাঁদের পক্ষ থেকে সম্ভব সব কিছুই করা হচ্ছে। এমনকি তাঁরা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রেখে চলেছেন—সে কথা স্মরণ করিয়ে দিতেও তাঁরা ভোলেন না। আমরা গার্মেন্ট মালিকদের অবদানের কথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে যে বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় পোশাক শ্রমিকদের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনমানের কথা শুনে পোপ যে সেটিকে ক্রীতদাস প্রথার সঙ্গে তুলনা করেছেন, সেটি কি অস্বীকার করার কোনো উপায় আছে? গার্মেন্ট মালিকরা বলছেন, যদি ক্রেতারা সামান্য বেশি দামে পোশাক কেনে তাহলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে তা যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা বলছেন, ত্রেতারা শুধু অভিযোগ তুলেই তাদের দায়িত্ব সারছে; এ ক্ষেত্রে তারা কোনো দায় নিচ্ছে না।

এ কথা ঠিক, জনসংখ্যাধিক্যের এই দেশে সস্তা শ্রমের কারণেই বিদেশি বায়াররা এ দেশের পোশাকশিল্পের দিকে ঝুঁকেছে। সে কারণে চীনের পর বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। যার যে দায়িত্ব, সেটি পালন করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের ব্যাপারে সবাইকেই ভূমিকা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যখন-তখন কারখানায় ভাঙচুর-ধর্মঘট করার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত-সহিংসতাও পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ কণ্টকাকীর্ণ করছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। এতে সমস্যা আরো প্রকট হয়। স্থায়ী একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সবাই সবার ওপর আস্থা রাখতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের অভূতপূর্ব উন্নয়নে প্রতিযোগীরা ঈর্ষান্বিত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প খাত রক্ষা করার দায়িত্ব বিজিএমইএসহ সব পক্ষেরই। ঘোলা পানিতে তৃতীয় পক্ষ যাতে কোনো সুযোগ নিতে না পারে, সেটি দেখতে হবে। সমস্যা সমাধানে আলোচনাই আসলে একমাত্র পথ। এ জন্য আলোচনার দরজা খোলা রাখতে হবে সব সময়। আলোচনা সাপেক্ষে বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দিতে হবে দ্রুত। ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই করণীয় ঠিক করতে হবে। পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে সবাইকে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

Add Comment

Click here to post a comment