মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

গাইড বইয়ের প্রশ্ন দিয়ে সৃজনশীলতা?-মাছুম বিল্লাহ

বাজারি গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দিয়ে এবারের (২০১৬) জেএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্ন করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় যেখানে বাজারি প্রশ্ন কিংবা গাইড বই থেকে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ, সেখানে বোর্ডের প্রশ্ন গাইড বইয়ের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে! আর সৃজনশীল প্রশ্ন যেখানে সব সময়ই উদ্ভাবনমূলক ও নতুন হওয়ার কথা, সেখানে এবার আগের পরীক্ষায় আসা প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিও ঘটেছে।

মূলত এ ধরনের ঘটনা প্রতিবছরই ঘটছে এবং শুধু বাংলায় নয়, অনেক বিষয়েই ঘটে, তবে দু-এক বছর দু-একটি বিশেষ কারণে বিষয়টি ধরা পড়ে। ২০১৪ সালের শেষের দিকে এনসিটিবিতে জেএসসি ও এসএসসির ইংরেজি প্রশ্নপত্র নিয়ে কয়েকটি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা ছিলেন সেখানে। আমিও এনজিও প্রতিনিধি হিসেবে ছিলাম। তাঁদের বলেছিলাম, বোর্ডের প্রশ্ন কী পরিমাণে এবং কিভাবে রিপিট করা হয়। ২০১৩ সালে চালু হওয়া নতুন বইয়ের আগে দশম শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে ১১৯টি লেসন ছিল। ১১৯টি লেসনের মধ্যে আটটি শিক্ষা বোর্ডে ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মাত্র ১২টি প্যাসেজ এসেছে। বাকি ১০৭টি লেসন কোনো দিন শিক্ষার্থীদের চোখ বোলানোরই দরকার হয়নি। কারণ কোনো বছরই সেগুলো থেকে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। এর মধ্যে দু-একটি প্যাসেজ বিভিন্ন বোর্ডে রিপিটেশন মিলে ১৬-১৮ বারও এসেছে। দু-একটি প্যাসেজই বিভিন্ন বোর্ডে বারবার এসেছে, তবে যতগুলো যতবারই আসুক, তা মাত্র ১২টি প্যাসেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আরেকটি জাতীয় সেমিনারে সঠিক প্রমাণসহ মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলাম। একই বিষয়ে এনসিটিবির ওয়ার্কশপে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তাঁরা উত্তর দিলেন—প্রশ্ন আমরা করি না, খাতাও আমরা দেখি না। আমি তখন বিনীতভাবে বলেছিলাম, আপনাদের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। পরীক্ষায় কিভাবে প্রশ্ন করা হয়, কোন সোর্স থেকে প্রশ্ন নেওয়া হয়, কতবার রিপিট করা হয় ইত্যাদি বিষয় তো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদেরই দেখতে হবে।এ বছর ১ নভেম্বর থেকে শুরু হয় জেএসসি পরীক্ষা। প্রথম দিনই ছিল বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা। এতে ৬০ নম্বরের সৃজনশীল প্রশ্নের প্রায় শতভাগ এবং ৪০ নম্বরের বহু নির্বাচনী প্রশ্নের মধ্যে ৫০ শতাংশই একটি নামকরা পাবলিকেশনের গাইড বই থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। আন্ত শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাবকমিটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান গাইড বই থেকে প্রশ্ন তুলে দেওয়া এবং প্রশ্নের পুনরাবৃত্তির ঘটনাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, ‘যেখানে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় গাইড বই থেকে প্রশ্ন তুলে দেওয়া নিষিদ্ধ, সেখানে বোর্ডের পরীক্ষায় এমন ঘটনা দুঃখজনক। এ ঘটনা সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ’ বারবার বিভিন্ন মাধ্যমে এবং বিভিন্নভাবে আলোচিত হচ্ছে যে বর্তমান পদ্ধতির সৃজনশীল প্রশ্ন শিক্ষকদের মধ্যেই বিরাট একটি অংশ তৈরি করতে পর্যন্ত পারেন না। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছি; কিন্তু তারা বিষয়টিতে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। বিষয়টি বোধ হয় আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না যে শিক্ষকরা নিজেরাই সৃজনশীল প্রশ্ন বোঝেন না; আর বোঝেন না বলেই তাঁরা সরাসরি গাইড বই থেকে তুলে দিয়েছেন।

সৃজনশীল পদ্ধতির উদ্দেশ্যই ছিল শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীলতা বাড়ানো এবং মুখস্থবিদ্যা ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো। এ কারণে পাঠ্য বইয়ে প্রশ্ন দেওয়া থাকে না। যে নমুনা প্রশ্ন থাকে, তা-ও তুলে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন উদ্ভাবন করতে হয়। এ কারণে এক পরীক্ষার প্রশ্ন আগের কোনো পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে মিলবে না। কোনো গাইড বই থেকেও প্রশ্ন কমন পড়বে না। কিন্তু কোনো কোনো স্টাডি বলছে, ৫১ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না, আবার কেউ বলছেন, ৪৫ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না। অর্থাৎ বাকিরা পারেন। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, ‘কিসের ৫১ আর ৪৫ শতাংশ, ৯৮-৯৯ শতাংশ শিক্ষকই বিষয়টি বোঝেন না। ’ তাঁর কথাই বোধ হয় ঠিক, তা না হলে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নে হুবহু গাইড বইয়ের প্রশ্ন থাকবে কেন? বর্তমান সৃজনশীল প্রশ্ন তো আসলে কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন। তাই উদ্দীপক ছাড়া সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করার কথা চিন্তা করতে হবে।

দেশের শিক্ষাবিষয়ক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কোনো স্টাডি বা গবেষণার ফল উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে বিষয়টির সঙ্গে যাঁরা জড়িত, যাঁরা এ নিয়ে কাজ করেন, চিন্তাভাবনা করেন, মতামত প্রকাশ করেন, তাঁদের সাধারণত আহ্বান জানানো হয় না। আমন্ত্রণ জানানো হয় অনেক উঁচু লেভেলের কিংবা নামকরা ব্যক্তিদের, যাঁরা সমস্যার মূলের বিষয়ের সঙ্গে হয়তো সম্পৃক্ত নন। আসল সমাধান যাঁরা দিতে পারেন, তাঁদের ডাকা হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই তাঁর ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় দেখিয়েছেন কিভাবে একজন সাধারণ ও অবহেলিত মুচি রাজার পাকে ধুলাবালি থেকে রক্ষার জন্য অল্পতেই সমাধান দিতে পারেন, যা দেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি বহু সভা-সেমিনার ও অর্থ ব্যয় করেও সমাধানের ধারেকাছে যেতে পারেননি। এখানেও আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। কিন্তু আমরা শিখব কি?

লেখক : শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেন, বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা

কর্মসূচিতে কর্মরত এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক

Add Comment

Click here to post a comment