চট্টগ্রাম জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ স্লাইডার

ক্ষতিপূরণের আগেই বসতভিটা উচ্ছেদ, স্ট্রোকে নারীর মৃত্যু

কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের রামু উপজেলার খতেখাঁরকুল  ইউনিয়নের সাতঘরিয়াপাড়া গ্রামের খালেদা বেগম। চার ছেলে এবং দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একটি ভিটায়। কিন্তু স্থানীয় ইটভাটার মালিক মোজাফ্ফর আহমদ একই গ্রামের আবদুল আজিজের পরিত্যক্ত স্ত্রী খালেদা বেগমের বসতভিটাটি কিনতে চান। কিন্তু কিনতে ব্যর্থ হয়ে জমির মালিকানা দাবি করে গোপনে আদালতে মামলা করেন মোজাফ্ফর। রায়ও নেন একতরফা। আর এ বিষয়টি জানতে পেরে আদালতের রায় বাতিলের মামলা করেন পৈত্রিক সূত্রে জমিটির মালিক খালেদা বেগম।

খালেদা বেগমের এই বাড়িটি উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে জমিটি দোহাজারি-ঘুমধুমের প্রস্তাবিত রেল লাইনে পড়ে। মামলা থাকায় ক্ষতিপূরণ পায়নি কোনও পক্ষই। কিন্তু এরই মাঝে কিছুদিন আগে শুরু হয় রেল লাইন নির্মাণ কাজ। সপ্তাহখানেক আগে কাটা হয় বসতভিটার গাছগাছালি। সেসময় স্ট্রোক করেন খালেদা। ৪-৫ দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেন খালেদা । কিন্তু সোমবার আবারও সেই ভিটাতে থাকা বাড়িটি উচ্ছেদ করতে যায় সংশ্লিষ্ঠরা। কিন্তু এই ভিটা ছাড়া সহায়-সম্বলহীন খালেদা এই দৃশ্য সহ্য করতে পারেননি। আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে মারা যান খালেদা। আর তার মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে চলছে শোকের মাতম।

এ বিষয়ে খালেদার বড় ভাই নুরুল আলম  বলেন,  পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ৯ শতক জমিতে ২০ বছর ধরে বসত বাড়ি করে স্বপরিবারে বাস করতো স্বামী পরিত্যাক্তা খালেদা বেগম। তার ভিটার লাগোয়া স্থানীয় মোজাফ্ফর আহমদের জমি। তিনি বোনের ভিটাটি বারবার কিনতে চেয়েছেন। কিন্তু বিক্রি না করায় মৌখিক দানপত্রের ভূয়া তথ্য দিয়ে একটি মামলা করে ২০১৩ সালে আদালত থেকে রায় নিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা চালায় ইটভাটা মালিক মোজাফ্ফর আহমদ। পরে মামলার বিষয়টি জানাজানি হলে দিশেহারা খালেদা ওই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে ওই এলাকার অন্যদের মতো খালেদার ভিটা-বাড়িটিও রেলপথের ম্যাপে অধিগ্রহণে পড়ে। মামলা থাকায় কেউ ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে পারেনি। কিন্তু উন্নয়ন কাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় ঠিকাদার ও কাজে নিয়োজিত লোকজন খালেদাকে জমির দখল ছেড়ে দিতে বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন। সম্প্রতি কাজের সুবিধার্থে খালেদার ভিটারগাছ কেটে সাবাড় করা হয়। এ দৃশ্য দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন খালেদা। তাকে রামু উপজেলা হাসপাতালে নেয়ার পর সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেয়া হয়। একুট সুস্থ হলে শনিবার আনা হয় বাড়িতে। কিন্তু সোমবার উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা বোল্ডোজার বাড়ির একাংশ ভেঙ্গে ফেললে আবার স্ট্রোক করেন তিনি। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল নেয়া হলে সেখানে মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে মারা যান।

ফতেখাঁরকুল ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম জানিয়েছেন, ঘটনাটি খুবই দূঃখজনক। রেলের কাজ শুরু হলেও তার বাড়ি-ভিটের বিপরীতে ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবেন এ চিন্তায় অস্থির ছিলেন তিনি। হয়তো এ কারণে ব্রেইন স্ট্রোক করে প্রাণ হারিয়েছেন খালেদা।

খালেদার বড় ছেলে হারুন তার মায়ের মৃত্যুর জন্য মোজাফ্ফর আহমদকে দায়ী করে বলেন, তিনি মামলা দিয়ে হয়রানি না করলে এতো দিনে আমরা রেলের ক্ষতিপূরণ পেয়ে অন্যত্র জমি কিনে বসবাস করতে পারতাম।

মোজাফ্ফর আহমদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তিনি জানান, জমিটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান জানান, খালেদার জমিটি নিয়ে মামলা থাকায় ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু উন্নয়ন কাজও থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তাই জমিটির অনুকূলে ক্ষতিপূরণের টাকা আদালতে জমা রেখেই কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। তাই জমির সৃষ্ট বিরোধটি আদালতের সহযোগিতায় দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মানবিক দিক চিন্তা করে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা মতো খালেদার দাফনের জন্য তার পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।

জুমবাংলানিউজ/একেএ